আইনের অঙ্গনে যাঁর কণ্ঠে একসময় আদালত শুনেছে যুক্তির দীপ্তি। যাঁর কলমে তৈরি হয়েছে আইন। যাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন ভারতীয় বিচারব্যবস্থার পথচলার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে, সেই প্রাক্তন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী ও প্রবীণ আইনজীবী অশোক কুমার সেন এবার স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বার লাইব্রেরিতে।
কলকাতা হাইকোর্ট বার লাইব্রেরি ক্লাবে তাঁর প্রতিকৃতি উন্মোচন করেন প্রধান বিচারপতি আর ভি ঘুগে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আদালতের আইনজীবী সমাজের বিশিষ্ট সদস্য এবং অশোক সেনের পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রবীণ আইনজীবী সঞ্জীব সেন বলেন, বার লাইব্রেরিতে অশোক সেনের প্রতিকৃতি স্থায়ী স্থান পাওয়ায় পরিবার গর্বিত। কারণ, এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তাঁর আইনজীবী হয়ে ওঠার স্মৃতি গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল।
সঞ্জীব সেনের কথায়, অশোক কুমার সেন ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট, কলকাতা হাই কোর্ট এবং দেশের অন্যান্য আদালতে কাজ করা অন্যতম শ্রেষ্ঠ আইনজীবী। তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল প্রস্তুতি ও নিরন্তর জ্ঞানচর্চা। আইন শুধু নিজের দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আইনের পরিবর্তন ও বিকাশ সম্পর্কেও তিনি নিজেকে সবসময় আপডেট রাখতেন।
১৯১৩ সালে ফরিদপুরে জন্ম অশোক কুমার সেনের। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনার পর লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সে উচ্চশিক্ষা এবং পরে গ্রে’স ইনে ব্যারিস্টারি। কলকাতার সিটি কলেজে আইন পড়ানো দিয়ে কর্মজীবনের শুরু। পরে কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জুনিয়র স্ট্যান্ডিং কাউন্সেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫৭ সালে সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ। কলকাতা নর্থ-ওয়েস্ট কেন্দ্র থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হয়ে একাধিকবার সাংসদ হন। পরবর্তী সময়ে রাজ্যসভার সদস্যও ছিলেন। জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভায় ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৬ এবং রাজীব গান্ধীর মন্ত্রিসভায় ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭, দুই দফায় কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলান তিনি।
দুই পর্ব মিলিয়ে দশ বছরেরও বেশি সময় দেশের আইনমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা অশোক কুমার সেন আজও ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালনকারী কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, আদালতের বিচারবোধ ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যার বিকাশেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন এবং আইন ও মানবাধিকার সংক্রান্ত একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন।
অনুষ্ঠানে উঠে আসে তাঁর জীবনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সঞ্জীব সেন জানান, অশোক সেন যখন মাত্র ৪৫ বছরের, তখন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বি বি সিনহা তাঁকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করে তিনি বেছে নিয়েছিলেন বারকেই। সেই সিদ্ধান্তের মধ্যেও যেন ধরা পড়ে তাঁর আইনজীবী সত্তার প্রতি দায়বদ্ধতা।
তবে অশোক সেনের উত্তরাধিকার শুধু আদালতের রায়, আইন বা সংসদীয় বিতর্কে সীমাবদ্ধ নয় তাঁর ব্যক্তিত্বের আর একটি দিকও অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। মতের অমিল হলেও তা কখনও ব্যক্তিগত সম্পর্কে বিষিয়ে উঠতে দিতেন না তিনি। বিপরীত মত মন দিয়ে শুনতেন, যুক্তির জবাব যুক্তিতেই দিতেন।
সঞ্জীব সেনের বক্তব্যে তাই অশোক সেনের উত্তরাধিকার হয়ে উঠল নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের জন্য এক নীরব শিক্ষা। ভালো আইনজীবী হওয়া মানে শুধু জেতার জন্য লড়াই নয়। গভীরভাবে প্রস্তুত হওয়া, পরিষ্কারভাবে যুক্তি তুলে ধরা এবং মতভেদ থাকলেও প্রতিপক্ষকে সম্মান করা। কলকাতা হাইকোর্টের বার লাইব্রেরিতে তাঁর প্রতিকৃতি তাই নিছক স্মৃতিচিহ্ন নয়। এক প্রজন্মের আইনচর্চার সামনে আর এক প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া এক নৈতিক আয়না। যেখানে সাফল্যের পাশাপাশি দেখা যায় প্রস্তুতি, শালীনতা, অধ্যবসায় এবং পেশার প্রতি গভীর ভালোবাসার মুখ।
আরও পড়ুন: সংঘর্ষে বারবার উত্তপ্ত শিক্ষাঙ্গন, যাদবপুর-সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি ফেরাতে হাইকোর্টে মামলা
গত ২৯ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন লাইব্রেরিতেও অশোক কুমার সেনের প্রতিকৃতি উন্মোচিত হয়েছিল। সেখানে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত সেই প্রতিকৃতি উন্মোচন করেন। সময় পেরিয়েছে, প্রজন্ম বদলেছে। কিন্তু অশোক কুমার সেনের মতো আইনজীবীর কাছে আইনের অর্থ যে শুধু আদালতে জয় নয়, ন্যায়, যুক্তি ও মর্যাদার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা। কলকাতা হাইকোর্টের বার লাইব্রেরিতে তাঁর প্রতিকৃতি যেন সেই কথাই আজও মনে করিয়ে দেবে।








Leave a Comment