আগরতলা, ১৩ অক্টোবর: রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উস্কানিমূলক ভাষণ দেওয়ার অভিযোগে নিজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআর খারিজের আবেদন খারিজ করে দিল ত্রিপুরা হাইকোর্ট। মঙ্গলবার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি টি অমরনাথ গৌড় ও বিচারপতি বিশ্বজিৎ পলিতের ডিভিশন বেঞ্চ এই নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে উস্কানিমূলক বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য থেকে বিরত থেকে শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে আদালত।
গত ১০ আগস্ট আগরতলায় একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মানিক সরকার উস্কানিমূলক বক্তব্য রেখেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। প্রবীর রায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৬ আগস্ট পশ্চিম আগরতলা থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০২৩-এর ১৯২, ৩৫৩(১)(বি) এবং ৬১(১) ধারায় এফআইআর দায়ের করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য উত্থাপিত ১১ দফা দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন আরও কঠোর করার কথা বলেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। অভিযোগকারীর দাবি, তাঁর বক্তব্যে ব্যবহৃত একটি বাংলা অভিব্যক্তির অর্থ ছিল দেশ ও রাজ্যকে আক্রমণাত্মক বা জঙ্গি আন্দোলনের পথে নিয়ে যাওয়া। এর ফলে হিংসা ছড়িয়ে পড়া এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলেও অভিযোগ করা হয়।
অন্যদিকে, মানিক সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করা হয়, তাঁর বক্তব্যের ভুল অনুবাদ করা হয়েছে এবং বক্তব্যকে প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর আইনজীবীর বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির প্রতিবাদে শ্রমিক, কৃষক ও অন্যান্য নাগরিক সংগঠনের ডাকা দেশব্যাপী আন্দোলনের প্রসঙ্গেই তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন।
আবেদনকারীর পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, আন্দোলনের দাবিগুলির সমর্থনে বক্তব্য রাখার পাশাপাশি গ্রেফতারের সময় পুলিশকে সহযোগিতা করার জন্যও তিনি আন্দোলনকারীদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে এবং তাঁর বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট ধারাগুলিতে বর্ণিত অপরাধের উপাদান নেই বলেও আদালতে যুক্তি দেওয়া হয়।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে জানানো হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকার সময় একটি বড় জমায়েতের সামনে বক্তব্যটি রাখা হয়েছিল। রাজ্যের দাবি, এর আগে সদর মহকুমা শাসকের কার্যালয়ের দিকে মিছিল করে যাওয়ার সময় পাঁচ হাজারেরও বেশি আন্দোলনকারী নিরাপত্তার জন্য বসানো দুটি ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ তাঁদের অগ্রগতি আটকে দেয়।
তবে রাজ্য সরকার স্পষ্ট করে জানায়, ব্যারিকেড ভাঙার ঘটনা মানিক সরকারের বক্তব্যের আগেই ঘটেছিল। ওই ঘটনার জন্য তাঁর পরবর্তী ভাষণকে দায়ী করা হচ্ছে না। যদিও বক্তব্যের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট এবং জমায়েতের উপর তার সম্ভাব্য প্রভাব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে আদালতে যুক্তি দেওয়া হয়।
শুনানিতে ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করে, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে এফআইআর খারিজ করার ক্ষমতা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগ করা উচিত। বক্তব্যের সম্পূর্ণ অংশ, তার প্রেক্ষাপট, উপস্থিত মানুষের প্রতিক্রিয়া এবং উপলব্ধ অডিয়ো-ভিডিয়ো রেকর্ডিং খতিয়ে দেখা তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্ব। বিতর্কিত বাংলা অভিব্যক্তিটির সঠিক অনুবাদ ও প্রাসঙ্গিক অর্থ নিয়ে রিট মামলার শুনানির পর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয় বলেও জানায় আদালত।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, বাস্তবে দাঙ্গা বা হিংসার ঘটনা না ঘটলেও ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৯২ ধারা প্রয়োগের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এফআইআরে উল্লিখিত অভিযোগগুলি প্রাথমিকভাবে আমলযোগ্য অপরাধের উপাদান প্রকাশ করছে বলে মনে করে বেঞ্চ। সেই কারণে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে মানিক সরকারের আবেদন খারিজ করে দেয় আদালত।
তবে মানিক সরকারের বয়স এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর পূর্ববর্তী দায়িত্বের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আদালত জানায়, তিনি উপযুক্ত জামিনের আবেদন নিয়ে নিম্ন আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। প্রযোজ্য শর্ত সাপেক্ষে সেই আবেদন বিবেচনা করা হবে বলেও জানিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ।
Leave a Comment