মেলাঘরের ঐতিহাসিক রথযাত্রা আজ, নিরাপত্তায় কড়া নজর প্রশাসনের
নিজস্ব প্রতিনিধি, মেলাঘর | আজ (১৬ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার) ত্রিপুরার অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব মেলাঘরের ঐতিহাসিক রথযাত্রা। ভগবান জগন্নাথ, বলরাম ও দেবী শুভদ্রার মহাযাত্রাকে কেন্দ্র করে আজ সকাল থেকেই মেলাঘর জুড়ে উৎসবের আমেজ। লক্ষাধিক ভক্ত, দর্শনার্থী ও পর্যটকের সমাগমে জনসমুদ্রে পরিণত হবে গোটা মেলাঘর। রথের রশিতে একসঙ্গে হাত রাখবেন হাজার হাজার ভক্ত, ধ্বনিত হবে—“জয় জগন্নাথ”।
গত ১৫ জুলাই ২০২৬ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহা আনুষ্ঠানিকভাবে মেলাঘরের ঐতিহাসিক রথমেলার উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের বিভিন্ন মন্ত্রী, বিধায়ক, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক আধিকারিক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। এদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মেলাঘরের রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি ত্রিপুরার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির প্রতীক।
মেলাঘরের রথযাত্রার ইতিহাস বহু পুরোনো। স্থানীয় প্রবীণদের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে যে, দেশভাগের আগে বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত হিন্দু পরিবারগুলিই এই অঞ্চলে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ঐতিহ্য নিয়ে আসেন। নতুন বসতিতে তাঁরা জগন্নাথ, বলরাম ও শুভদ্রার পূজার পাশাপাশি রথযাত্রারও সূচনা করেন। ধীরে ধীরে সেই ধর্মীয় আয়োজনই পরিণত হয় বিশাল জনউৎসবে। যদিও এই উৎসের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য লিখিত ঐতিহাসিক নথি সীমিত, তবুও স্থানীয় ঐতিহ্যে এই বর্ণনা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেলাঘরের রথযাত্রা ত্রিপুরার অন্যতম বৃহৎ রথমেলায় পরিণত হয়েছে। আজ শুধু সিপাহিজলা জেলা নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এই উৎসবে যোগ দেন। পাশাপাশি প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকেও বহু ভক্ত ও দর্শনার্থী এই মেলা দেখতে আসেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে ভগবান জগন্নাথ, বড় ভাই বলরাম ও বোন শুভদ্রা রথে আরোহণ করে মাসির বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কয়েকদিন সেখানে অবস্থানের পর বাহুড়া বা উল্টো রথের মাধ্যমে তাঁরা পুনরায় মন্দিরে ফিরে আসেন। এই উৎসবকে শুভ, কল্যাণ ও মানবসম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
মেলাঘরের রথের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হলো এর বিশাল কাঠের রথ। স্থানীয়ভাবে এটি ত্রিপুরার অন্যতম বৃহৎ রথ হিসেবে পরিচিত। রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বসে বিশাল মেলা। খেলনা, মাটির সামগ্রী, বাঁশ-বেতের হস্তশিল্প, পোশাক, মিষ্টি, স্থানীয় খাবার, নাগরদোলা ও বিভিন্ন বিনোদনের আয়োজন ঘিরে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠেন সব বয়সের মানুষ। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছেও এই মেলা অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উৎসবকে ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ, ট্রাফিক কর্মী, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের মোতায়েন করা হয়েছে যাতে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা নির্বিঘ্নে রথযাত্রা উপভোগ করতে পারেন।
ধর্মীয় বিশ্বাস, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলা হিসেবে মেলাঘরের রথযাত্রা আজও ত্রিপুরার মানুষের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু। আজ আবারও হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে জয় জগন্নাথের ধ্বনিতে মুখরিত হবে মেলাঘর, আর ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে এগিয়ে চলবে শতবর্ষের এই রথযাত্রা।
Leave a Comment