“হাতকড়া ভার্চুয়াল হলেও ক্ষতিটা বাস্তব”

By Suman Debnath

October 30, 2026 1:55 PM


‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ নিয়ে কড়া বার্তা সুপ্রিম কোর্টের।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ফোনের ওপারে কড়া গলায় হুমকি হুঁশিয়ারি। স্ক্রিনে ফুটে উঠছে পুলিশের লোগো। অথচ আসলে একটি ভুয়ো গ্রেফতারি পরোয়ানা। অভিযোগ নাকি আপনার আধার নম্বর মাদক পাচারকারীদের সঙ্গে জড়িত, তার প্রমাণ মিলেছে। কিংবা অর্থপাচারের তদন্তে আপনার নাম উঠে এসেছে। আতঙ্কিত মানুষটি হুমকি হুঁশিয়ারির সুরে বলা হচ্ছে, তিনি ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এ আছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও কলে নজরবন্দি থেকে নিজের সঞ্চয় খোয়াচ্ছেন বহু মানুষ।

আইনের ভাষায় এই ডিজিটাল অ্যারেস্ট বিষয়টি একেবারেই অস্তিত্ববিহীন। কিন্তু প্রতারণার জগতে এটি এক ভয়ঙ্কর বাস্তব। সেই কারণে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ কাণ্ডে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছে সুপ্রিম কোর্টও। সাম্প্রতিককালে শীর্ষ আদালতের এই হস্তক্ষেপের বিষয়টিকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আইনজীবী মহল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বতঃপ্রণোদিত একটি মামলার শুনানিতে শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে—ব্যাঙ্কগুলি কেবল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়, তারা জনসাধারণের অর্থের ‘ট্রাস্টি’। বেঞ্চ প্রশ্ন তোলে, যিনি সাধারণত মাসে ২০ হাজার টাকা তোলেন, তিনি হঠাৎ ৫০ লক্ষ টাকা স্থানান্তর করলে ব্যাঙ্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা কেন সতর্কবার্তা দিচ্ছে না?  

আরও পড়ুন:  আপনার ফোনেও বন্ধ হতে পারে WhatsApp! এখুনি জানুন কারণ

রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) তৈরির নির্দেশ দিয়ে শীর্ষ আদালত কার্যত দায়বদ্ধতার কাঠামো নতুন করে নির্ধারণের ইঙ্গিত দিয়েছে। সুতরাং ভবিষ্যতে অস্বাভাবিক লেনদেন আটকাতে ব্যর্থ হলে ব্যাঙ্কের উপর দায় বর্তাতে পারে—এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ভারতীয় আইনে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ বলে কিছু নেই। দণ্ডবিধি বা নতুন ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস) অনুযায়ী গ্রেফতার শারীরিক প্রক্রিয়া। কোনও তদন্তকারী সংস্থা ভিডিও কলে কাউকে ‘নজরবন্দি’ রাখতে পারে না। আর কোনও অবস্থাতেই সিবিআই, ইডি বা পুলিশ অর্থ ‘যাচাই’-এর নামে টাকা ট্রান্সফার করতে বলে না।

প্রধানমন্ত্রীও সম্প্রতি ‘মন কি বাত’-এ এই প্রতারণা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন দেশবাসীকে। কিন্তু তারপরও হাজার হাজার মানুষ প্রতারিত হচ্ছেন। কারণ, এই কৌশল ও ভয়কে হাতিয়ার করে। আইন মান্যকারী নাগরিকের মনে কর্তৃপক্ষের প্রতি যে শ্রদ্ধা, সেটিকেই অস্ত্র বানাচ্ছে জালিয়াতেরা।

আরও পড়ুন:  ডিজিটাল সুনামিতে টিভি ও এফএম রেডিও টিকবে ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিকারের পথও রয়েছে। সন্দেহজনক কল এলে সঙ্গে সঙ্গে কেটে দিন। কোনও ওটিপি শেয়ার করবেন না। প্রতারণা বুঝতে পারলে অবিলম্বে ১৯৩০ নম্বরে ফোন করে জাতীয় সাইবার অপরাধ হেল্পলাইনে জানান। প্রথম এক ঘণ্টা—‘গোল্ডেন আওয়ার’—মধ্যে অভিযোগ জানালে অর্থ আটকানোর সম্ভাবনা থাকে। পাশাপাশি cybercrime.gov.in পোর্টালে অভিযোগ দায়ের ও ব্যাঙ্কে ‘ফ্রড ডিসপিউট’ তোলাটাও জরুরি।

প্রয়োজনে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে তদন্তে গাফিলতি বা ব্যাঙ্কের অবহেলার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের পথও খোলা রয়েছে।

‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ আসলে মনস্তাত্ত্বিক অবরোধ। পর্দার ওপারে যে ‘অফিসার’, তিনি আইন প্রয়োগ করছেন না—আইন ভাঙছেন। সুপ্রিম কোর্টের বার্তা স্পষ্ট: ভয়ের শিকল ভাঙতে হবে। পুলিশ দরজায় কড়া নাড়ে, স্ক্রিনে নয়। তেমনটা হলে ফোন কেটে দেওয়াটাই সবচেয়ে বড় আত্মরক্ষা।

The post “হাতকড়া ভার্চুয়াল হলেও ক্ষতিটা বাস্তব” appeared first on Rplus.

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment