---Advertisement---

কেউ ‘বন্দে মাতরম’ না গাইতে চাইলে, তা অপরাধ ধরে নিয়ে শাস্তি দেওয়া যাবে না: স্পষ্ট বার্তা সুপ্রিম কোর্টের

By Suman Debnath

September 22, 2026 5:10 PM

কেউ ‘বন্দে মাতরম’ না গাইতে চাইলে, তা অপরাধ ধরে নিয়ে শাস্তি দেওয়া যাবে না: স্পষ্ট বার্তা সুপ্রিম কোর্টের

---Advertisement---


বন্দে মাতরম (Vande Mataram) না গাওয়ার জন্য কাউকে ফৌজদারি শাস্তির মুখে পড়তে হবে না। মঙ্গলবার একটি মামলার প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ স্বভাবতই হইচই ফেলে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য, বন্দে মাতরম না গাইবার পিছনে কারও ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণও থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে এমন আপত্তিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করলে তা সংবিধানের নিয়মনীতিকে উল্লঙ্ঘন করে। কর্ণাটকের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণের (TM Krishna) দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের শুনানিতে এই পর্যবেক্ষণ করেছে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। মামলাটি প্রিভেনশন অব ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার আইনের (Prevention of Insults to National Honour Act, 1971) ২০২৬ সালের সংশোধনীর বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে।

কী নিয়ে মামলা

সম্প্রতি সংশোধিত আইন অনুযায়ী, জাতীয় সংগীত গাওয়ায় ইচ্ছাকৃত বাধা দিলে বা তাতে ব্যাঘাত ঘটালে সর্বোচ্চ তিন বছরের জেল অথবা জরিমানা, অথবা দুটোই হতে পারে। এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের (Ministry of Home Affairs) নির্দেশিকায় সরকারি অনুষ্ঠানে বন্দে মাতরমের পুরো ছয়টি স্তবক গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। টি এম কৃষ্ণের অভিযোগ, শেষ চারটি স্তবকে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতীর মতো হিন্দু দেবীদের স্তুতি রয়েছে। এই স্তবকগুলি জোর করে গাওয়ানো আদতে একপাক্ষিক ধর্মীয় ও আদর্শগত ধারণা চাপিয়ে দেওয়ার সামিল, যা সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের পরিপন্থী।

আদালতে কী হল

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (Chief Justice Surya Kant), বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী (Justice Joymalya Bagchi) এবং বিচারপতি ভি মোহনার (Justice V Mohana) বেঞ্চ শুনানিতে জানায়, জাতীয় সংগীত ঠিক কী এবং কেমন হবে, তা নির্ধারণ করা আদালতের কাজ নয়। তবে আগের বিজয় ইমানুয়েল মামলায় (Bijoe Emmanuel case) প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, একজন নাগরিকের তাঁর বিচার-বিবেচনা অনুযায়ী আপত্তি জানানোর অধিকার রয়েছে। এবং সেই অধিকার লঙঘিত হচ্ছে কিনা, তা সুপ্রিম কোর্ট খতিয়ে দেখবে। বেঞ্চ জানায়, বিজয় ইমানুয়েল মামলার রায় আজও দেশের প্রচলিত আইন এবং কোর্ট প্রত্যাশা করে যে, বন্দে মাতরম সংক্রান্ত আইনও সেই নীতি মেনেই চলবে। কোনও ব্যক্তি নিজের বিবেচনা বা ধর্মবিশ্বাসের কারণে গান না গাইলে তাঁকে অপরাধী গণ্য করে দণ্ডিত করা যাবে না বলেও স্পষ্ট করে দেয় আদালত।

শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার (Solicitor General Tushar Mehta) সঙ্গে মামলাকারীর আইনজীবী এস মুরলীধরের (Senior Advocate Dr S Muralidhar) তীব্র বাদানুবাদ হয়। মেহতা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াকে অসম্মান করা হচ্ছে বলে ‘নকশালপন্থা’কে জুড়ে একটি মন্তব্য করলে মুরলীধর কড়া আপত্তি জানান এবং তা প্রত্যাহারের দাবি তোলেন। সলিসিটর জেনারেল অবশ্য নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন। শেষমেশ আদালত পিটিশনের প্রেক্ষিতে কোনও নোটিস জারি না করলেও কেন্দ্রকে জবাব দিতে বলে।

ইতিহাসের পাতা থেকে

পিটিশনে বলা হয়েছে, ১৮৭৫ সালে কবিতা হিসেবে প্রথম প্রকাশিত হয় বন্দে মাতরম, পরে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (Bankim Chandra Chattopadhyay) আনন্দমঠ (Anandamath) উপন্যাসে তা অন্তর্ভুক্ত হয়। ধর্মীয় বিতর্ক দূরে রাখতে ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস সিদ্ধান্ত নেয়, জাতীয় অধিবেশনে গানের শুধু প্রথম দুই স্তবকই গাওয়া হবে। রাজেন্দ্র প্রসাদ, সুভাষচন্দ্র বসু, জওহরলাল নেহরু এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামের স্তম্ভরাও সেই সিদ্ধান্ত সমর্থন করেছিলেন বলে পিটিশনে উল্লেখ রয়েছে। আবেদনে আরও বলা হয়েছে, সংবিধান সভা কখনও বন্দে মাতরমকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সংগীত ঘোষণা করেনি, এমনকি সংবিধানের ৫১এ(এ) ধারাতেও এর উল্লেখ নেই। বরং জনগণমন (Jana Gana Mana) আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি।

সাংবিধানিক প্রশ্ন

পিটিশনে সংবিধানের একাধিক ধারা তুলে ধরে বন্দে মাতরম পুরো গাওয়ার ফরমানকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। ধারা ১৪ অনুযায়ী আইনটিকে খেয়ালখুশি মতো তৈরি বলে দাবি করা হয়েছে, কারণ তা পুরনো ঐতিহাসিক রীতি উল্টে দিয়েছে বলে অভিযোগ। ধারা ১৫(১) অনুযায়ী ধর্মের ভিত্তিতে পরোক্ষ বৈষম্যের অভিযোগ তোলা হয়েছে। ধারা ২১ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, গান না গাওয়া বা বাধাদান হিসেবে গণ্য হওয়া আচরণকে ফৌজদারি অপরাধ বানানো ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মর্যাদায় হস্তক্ষেপের সমান। পিটিশনে এই দাবিও করা হয়েছে যে, চলতি বছরের মার্চে মহম্মদ সঈদ নুরি মামলায় (Muhammed Sayeed Noori case) সুপ্রিম কোর্ট যে আবেদন খারিজ করেছিল, তখন শাস্তির কোনও বিধান ছিল না। এখন সংশোধিত আইনে ফৌজদারি শাস্তি যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে বলে যুক্তি দিয়েছেন টি এম কৃষ্ণ।

ফলে বন্দে মাতরম বিতর্ক চলছেই। মামলার পরবর্তী শুনানিতে কেন্দ্রের জবাবের দিকেই এখন নজর থাকবে গোটা দেশের। নজর থাকবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের দিকেও।

---Advertisement---

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment