২০ শতাংশের বদলে পেট্রলে মিলল ৩১ শতাংশ ইথানল: দেদার মুনাফা লোটার প্রমাণ হাতে আসতেই কেন্দ্রের জবাব তলব

By Suman Debnath

November 6, 2026 6:50 PM

২০ শতাংশের বদলে পেট্রলে মিলল ৩১ শতাংশ ইথানল: দেদার মুনাফা লোটার প্রমাণ হাতে আসতেই কেন্দ্রের জবাব তলব


গাড়ি বা বাইকের মাইলেজ আচমকা কমে যাচ্ছে কি? কিংবা বারবার গ্যারেজে দৌড়তে হচ্ছে ইঞ্জিন সারাইয়ের জন্য? এর নেপথ্যে চালকের গাফিলতি নয়, বরং থাকতে পারে পেট্রল পাম্প থেকে কেনা তেলের কারচুপি। সম্প্রতি কর্ণাটক সরকারের একটি বিস্ফোরক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ইন্ডিয়ান অয়েল বা হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়ামের মতো নামী রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলি নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে ইথানল মেশাচ্ছে পেট্রলে। কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ম অনুযায়ী পেট্রলে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বা ই২০ (E20) ইথানল মেশানোর ছাড়পত্র রয়েছে। অথচ ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বাজারে বিক্রি হওয়া পেট্রলে ৩১.২ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মেশানো হচ্ছে। এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পরেই তেল সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রী নীতিন গড়কড়ি এবং পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর কাছে জবাবদিহি তলব করেছে কর্ণাটক সরকার। বাংলার ক্রেতাদের জন্যও এই রিপোর্ট একটি বড় সতর্কবার্তা, কারণ এই একই সংস্থাগুলি গোটা দেশেই তেল সরবরাহ করে।

তেল সংস্থাগুলির জালিয়াতি

ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মাইলেজ কমা এবং ঘনঘন গাড়ি বিকল হওয়ার ভুরি ভুরি অভিযোগ পেয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পেট্রলের ৬৩টি নমুনা সংগ্রহ করেছিল কর্ণাটক সরকার। খাদ্য ও অসামরিক সরবরাহ মন্ত্রী রিজওয়ান আরশাদ জানিয়েছেন, বেঙ্গালুরু, মেঙ্গালুরু, কোলার ও রামনগরের মতো এলাকা থেকে নমুনাগুলি সংগ্রহ করা হয়। প্রথমে আইওসিএল (IOCL) এবং বিপিসিএলের (BPCL) নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে তা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলেও তারা পেট্রলে ইথানলের উপস্থিতির পরিমাণ গোপন করে যায়। সন্দেহ হওয়ায় নমুনাগুলি পাঠানো হয় এনএবিএল (NABL) স্বীকৃত বেসরকারি পরীক্ষাগারে।

আরও পড়ুন:  বাঁধ-বিরোধী আন্দোলনে রণক্ষেত্র অরুণাচল: ধ্যরাতে পুড়ল NHPC অফিস ও থানা, ভাঙচুর রাজ্য বিজেপি সভাপতির বাড়িতেও

বেসরকারি ল্যাবের রিপোর্ট হাতে আসতেই চক্ষু চড়কগাছ হয় প্রশাসনের। দেখা যায়, প্রতি পাঁচটি নমুনার মধ্যে চারটিতেই ইথানলের পরিমাণ ২০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে আইওসিএলের একটি নমুনায় সর্বোচ্চ ৩১.২ শতাংশ এবং এইচপিসিএলের (HPCL) নমুনায় ৩০.৫ শতাংশ ইথানল মিলেছে। অন্যান্য নমুনায় এই মাত্রা ছিল ২২ থেকে ২৭ শতাংশের ঘরে। সবচেয়ে কম ইথানল মিলেছে ১৩.৫ শতাংশ। ভারত পেট্রোলিয়াম, শেল এবং নায়ারা এনার্জির পেট্রলেও মাত্রাতিরিক্ত ইথানল মিলেছে বলে ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।

ইঞ্জিন বিকল হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি

অতিরিক্ত ইথানল মিশ্রিত এই জ্বালানি সাধারণ গাড়ি ও বাইকের ইঞ্জিনের জন্য কার্যত নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, দেশের প্রায় ৩৫ কোটি গাড়ির ৯৯ শতাংশই ২০ শতাংশের বেশি ইথানল মিশ্রিত তেল নেওয়ার উপযুক্ত নয়। এমনকি ২০২৩ সালের এপ্রিলের পরে তৈরি হওয়া বিএস-সিক্স (BS6) মডেলের গাড়িগুলিও সর্বাধিক ই২০ ফুয়েল ব্যবহারের জন্য তৈরি।

পুরোনো গাড়ি বা বাইকের ক্ষেত্রে এই ক্ষতিকর প্রভাব আরও বেশি। ইথানল ইঞ্জিনের ভেতরে জমে থাকা ময়লা বা স্লাজ আলগা করে দেয়, যা গিয়ে সোজা ফুয়েল ফিল্টার এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে জ্যাম করে দেয়। নীতি আয়োগের ২০২১ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ই২০ তেলের কারণে পুরোনো চারচাকা গাড়ির মাইলেজ ৬ থেকে ৭ শতাংশ এবং বাইকের মাইলেজ ৩ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তা ছাড়া পেট্রল পাম্পে তেল ভরার যে মেশিন বা ডিসপেন্সিং ইউনিটগুলি রয়েছে, তার বেশিরভাগই ১৫ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত তেলের জন্য উপযুক্ত। ফলে পরিকাঠামোগত ত্রুটি নিয়েও বড়সড় প্রশ্ন উঠে গিয়েছে।

গ্রাহকদের ঘাড়ে ১ লক্ষ কোটি টাকার বোঝা

আরও পড়ুন:  জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় স্থগিত অমরনাথ যাত্রা, ৩৭০ বিলোপের বর্ষপূর্তিতে উপত্যকায় হাই অ্যালার্ট

কর্ণাটক সরকারের হিসেব অনুযায়ী, মাইলেজ কমে যাওয়ার কারণে গ্রাহকদের বছরে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা এবং ঘনঘন ইঞ্জিন মেরামতির কারণে ৩৯ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। সব মিলিয়ে মাত্রাতিরিক্ত ইথানল মেশানোর খেসারত হিসেবে দেশজুড়ে গ্রাহকদের ঘাড়ে বছরে প্রায় ১ লক্ষ ১ হাজার কোটি টাকার আর্থিক বোঝা চাপছে। এর আগে বিমা সংস্থাগুলিও জ্বালানি সংক্রান্ত ইঞ্জিন বিকল হওয়ার দায়ভার গ্রাহকদের ঘাড়েই চাপিয়ে দিয়েছে।

এই পরিসংখ্যানকে হাতিয়ার করেই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন রাজ্যের মন্ত্রী রিজওয়ান আরশাদ। তাঁর প্রশ্ন, ইথানল মেশানোর ফলে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি কমিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচানোর দাবি করে কেন্দ্র, কিন্তু তার বিন্দুমাত্র সুবিধা কেন সাধারণ গ্রাহক পান না? উল্টে তেল বিপণন সংস্থাগুলি হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা লুটছে। ২০১৮ সালে নীতিন গড়কড়ি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ই২০ তেল চালু হলে পেট্রলের দাম লিটার পিছু ৫৫ টাকায় নেমে আসবে, সেই প্রতিশ্রুতি কোথায় হারিয়ে গেল তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। কর্ণাটক সরকারের দাবি, অবিলম্বে পাম্পগুলিতে তেলের মিশ্রণের অনুপাত ডিসপ্লে বোর্ডে লিখতে হবে এবং যে সমস্ত গ্রাহকের গাড়ির ইঞ্জিন এই কারণে বিকল হয়েছে, তাঁদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment