শনিবারের প্রতিবাদের আঁচ পৌঁছনোর আগেই রাজধানী দিল্লিতে জারি হল কঠোর প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner-CEC) জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে নাগরিক মঞ্চ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (Cockroach Janta Party-CJP) এবং দেশের একাধিক প্রথম সারির ছাত্র সংগঠন। সেই উত্তেজনার পারদ চড়তেই শুক্রবার রাত ১০টা থেকে মধ্য দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা (mobile internet shutdown)। টানা ২৪ ঘণ্টার জন্য এই নির্দেশ বহাল থাকবে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।
দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের ডেপুটি কমিশনার মণীষী চন্দ্র এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, জনপথ ও কর্তব্য পথ ক্রসিংকে কেন্দ্র করে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের (4 km radius) মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা পুরোপুরি স্তব্ধ রাখা হবে। অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, রাষ্ট্রপতি ভবন সংলগ্ন রাজপথ এবং যন্তরমন্তরের মতো হাই-সিকিউরিটি জোন শনিবার রাত ১০টা পর্যন্ত থাকবে কার্যত অফলাইনে।
হঠাৎ কেন ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট?
প্রশাসনের আশঙ্কা, শনিবার সকাল থেকে যন্তরমন্তরে যে জমায়েতের ডাক দেওয়া হয়েছে, তা কোনও সাধারণ সমাবেশ নয়। সেখানে রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পড়ুয়া, অ্যাকটিভিস্ট এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের জড়ো হওয়ার কথা রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রে খবর, সমাজমাধ্যম এবং মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে বিক্ষোভকারীরা যাতে দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সমন্বয় গড়ে তুলতে না পারে কিংবা কোনও ধরনের গুজব ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতেই এই চরম পদক্ষেপ। প্রশাসনিক পরিভাষায় একে বলা হচ্ছে আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ (precautionary measure)। এর ফলে ওই এলাকায় মোবাইলে ডেটা পরিষেবা, অনলাইন লেনদেন বা লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মতো সমস্ত প্রযুক্তিগত যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িক ভাবে বন্ধ থাকবে।
যন্তরমন্তরে মহারণের প্রস্তুতি
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ (Special Intensive Revision-SIR) প্রক্রিয়া নিয়েই যাবতীয় বিতর্কের সূত্রপাত। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার আড়ালে দেশের লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বেআইনি ভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে। এই পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ এবং তাঁর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে সিজেপি।
এই লড়াইয়ে কেবল একটি নাগরিক সংগঠন নয়, শামিল হয়েছে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এসএফআই (SFI), আইসা (AISA), এআইএসএফ (AISF) এবং আম আদমি পার্টির ছাত্র শাখা আসাপ (ASAP)। লাগাতার আন্দোলনের পথে রয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA bloc) জোট-ও। এবার সংসদীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে ছাত্র ও যুব সমাজ রাজপথে বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়েছে। ফলে ১০ অক্টোবরের এই ঘেরাও কর্মসূচি ঘিরে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে তীব্র সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নাগরিক জীবনে প্রভাব
মধ্য দিল্লির যে অংশে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হচ্ছে, তা মূলত সরকারি দপ্তর, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতি এলাকার কেন্দ্রস্থল। তবে ওয়াই-ফাই ও ব্রডব্যান্ড (broadband) সংযোগ চালু থাকবে কি না, তা নিয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশিকা এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু সাধারণ পথচারী, মেট্রোযাত্রী এবং ডেলিভারি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের জন্য এই ২৪ ঘণ্টা বড়সড় ভোগান্তির কারণ হতে চলেছে।
অন্য দিকে, আন্দোলনকারী নেতৃত্বের দাবি, পুলিশের এই ইন্টারনেট বন্ধের ফরমান আসলে গণতন্ত্রের মুখ বন্ধ করার কৌশল। ছাত্র সংগঠনগুলির মতে, পুলিশি নিষেধাজ্ঞা জারি করে বা ইন্টারনেট স্তব্ধ করে জনরোষ চেপে রাখা যাবে না। শনিবার নির্ধারিত সময়েই যন্তরমন্তরে লাখো মানুষের প্রতিবাদ আছড়ে পড়বে বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে তারা। সব মিলিয়ে শনিবার দিল্লির রাজপথ এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক উত্তেজনার সাক্ষী হতে চলেছে।
Leave a Comment