রান্নাঘরের বাজেটে ফের চাপ বাড়ার ইঙ্গিত মিলছে। ভোজ্য তেলের দাম আগামী কয়েক মাস আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিল্পমহলের বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার প্রভাব, টাকার মূল্যহ্রাস এবং দুর্বল বর্ষার সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে সর্ষে, সয়াবিন ও পাম তেলের খুচরো দাম উচ্চ স্তরেই থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কনজিউমার অ্যাফেয়ার্স দপ্তরের প্রাইস মনিটরিং সেলের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দেশে সর্ষের তেলের গড় খুচরো দাম ছিল প্রতি কেজি ১৯৩.৫৪ টাকা। সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১৬৩.১০ টাকা এবং পাম তেলের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ১৪৭.৩৭ টাকা প্রতি কেজিতে। এক বছর আগের তুলনায় সর্ষের তেলের দাম বেড়েছে ১০.৭৪ শতাংশ, সয়াবিন তেল ১১.৫৩ শতাংশ এবং পাম তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ১২.৮৭ শতাংশ।
Solvent Extractors’ Association (SEA)-এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর বি. ভি. মেহতার মতে, আন্তর্জাতিক পরিবহণ ও বিমার ব্যয় বৃদ্ধি, ভারতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং তেল উৎপাদনকারী দেশগুলিতে বায়োফুয়েলের জন্য ভোজ্য তেলের ব্যবহার বাড়ায় আমদানি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাঁর দাবি, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের পর থেকেই এই ব্যয় দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
SEA-র তথ্য বলছে, ৩ জুলাই পর্যন্ত মুম্বই বন্দরে অপরিশোধিত পাম তেলের আমদানি মূল্য বছরে প্রায় ১১ শতাংশ বেড়ে টনপ্রতি ১,১৭০ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ৬ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১,২৬৭ ডলার প্রতি টন এবং সূর্যমুখী তেলের দাম ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১,৪৫৫ ডলার প্রতি টনে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোজ্য তেল আমদানিকারক দেশ। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৫৭ থেকে ৫৮ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইউক্রেন, রাশিয়া এবং আর্জেন্টিনা থেকে মূলত পাম, সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেল আসে। বছরে দেশে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ মিলিয়ন টন ভোজ্য তেলের ব্যবহার হয়।
Indian Vegetable Oil Producers’ Association (IVOPA)-এর সভাপতি সুধাকর দেশাইয়ের মতে, আগামী কয়েক মাস বিশ্ববাজারে ভোজ্য তেলের দামের গতিপথ নির্ভর করবে একাধিক বিষয়ের উপর। ইন্দোনেশিয়ার B50 বায়োডিজ়েল প্রকল্প, আমেরিকার বায়োফুয়েল নীতি, অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য, বিভিন্ন দেশের মুদ্রার ওঠানামা, আবহাওয়ার পরিস্থিতি এবং রপ্তানিকারক দেশগুলির নীতিগত সিদ্ধান্ত—সবকিছুরই সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ১ জুলাই থেকে ইন্দোনেশিয়ায় B50 বায়োডিজ়েল কর্মসূচি কার্যকর হয়েছে। এই প্রকল্পের ফলে প্রায় ১ কোটি ৪৬ লক্ষ টন পাম তেল বায়োডিজ়েল তৈরিতে ব্যবহার করা হবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিযোগ্য পাম তেলের জোগান কিছুটা কমে যেতে পারে, যা বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে।
গোকুল অ্যাগ্রো রিসোর্সেসের চিফ বিজনেস অফিসার অরুণ হার্নের বক্তব্য, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের পর সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও দাম এখনও স্বাভাবিক স্তরে ফেরেনি। অন্যদিকে, দেশে যদি বর্ষা দুর্বল হয় এবং তেলবীজ উৎপাদন প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়, তাহলে আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। সেক্ষেত্রে আগামী মাসগুলিতে ভোজ্য তেলের খুচরো বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।
Leave a Comment