ভোটের ময়দানে প্রতীক নিয়ে যখন টানাপোড়েন চরমে, তখনই তৃণমূলের নাম ও প্রতীক-সংক্রান্ত বিরোধে দ্রুত নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্ট করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার মামলার শুনানিতে নির্বাচন কমিশনকে জানাতে বলা হয়েছে, চূড়ান্তভাবে এই বিরোধ মেটাতে তাদের কতটা সময় প্রয়োজন।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা উচিত নয়। ন্যায্য শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিতে হবে। কিন্তু সেই সময় যেন ‘অতিরিক্ত দীর্ঘ’ না হয়। আগামী সপ্তাহে ফের মামলাটি উঠবে।
মামলার সূত্রপাত নির্বাচন কমিশনের ১৭ সেপ্টেম্বরের অন্তর্বর্তী নির্দেশকে ঘিরে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী, দুই পক্ষই নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি করায় কমিশন পুরনো দলের নাম ও ‘জোড়া ফুল’ প্রতীক ব্যবহারের উপর অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিবাল প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচনের মাঝখানে কমিশন এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি না, বিশেষ করে যখন সেই সময়ে আদালতে গিয়ে কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ কার্যত সংকুচিত হয়ে যায়।
বর্ষীয়ান আইনজীবী সিবালের বক্তব্য, বিরোধটি জুলাইয়েই কমিশনের সামনে পৌঁছেছিল। এতদিন বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখে উপনির্বাচনের ঠিক আগে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তাঁর মক্কেলের জন্য আইনি প্রতিকারের পথ কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে বেঞ্চের তরফে পাল্টা প্রশ্ন ওঠে, যখন দুই গোষ্ঠীর প্রার্থীরাই একই দলের পরিচয়ে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন, তখন কমিশন কীভাবে কোনও অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা না নিয়ে থাকতে পারে? বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী স্পষ্ট করেন, নির্বাচনের নির্ধারিত সূচি ইতিমধ্যেই ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। ফলে আসন্ন উপনির্বাচনের স্বার্থে কমিশনের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা এই মুহূর্তে নাড়াচাড়া করার সুযোগ সীমিত।
এই পর্যায়েই শিবসেনা-সংক্রান্ত দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের প্রসঙ্গ উঠে আসে। ঋতব্রত গোষ্ঠীর পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে মুকুল রোহতগি বলেন, এ ধরনের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা কমিশন আগেও করেছে। জবাবে বিচারপতি বাগচীর তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, ‘শিবসেনায় বিলম্বের কী পরিণতি হয়, আমরা দেখেছি।’
তবে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর আইনজীবীদের বক্তব্য, এত জটিল সাংগঠনিক ও তথ্যভিত্তিক বিরোধ মাত্র এক মাসে নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। তাঁদের দাবি, হলফনামা, নথি ও প্রমাণ যাচাইয়ের জন্য আরও সময় প্রয়োজন।
এদিকে কমিশন ইতিমধ্যেই উপনির্বাচনের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠীকে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠীকে ‘ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘খাম’ প্রতীক দিয়েছে।
তবে কমিশন স্পষ্ট করেছে, এগুলি শুধুই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। মূল দলের নাম ও প্রতীকের দাবিতে কে বৈধ, সে প্রশ্নে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সেই মূল বিরোধ নির্বাচন প্রতীক (সংরক্ষণ ও বরাদ্দ) আদেশ, ১৯৬৮-এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে পৃথকভাবে নির্ধারিত হওয়ার কথা।
আরও পড়ুন: ‘১৮৩টি প্রতীক থাকতে এনভেলপই কেন?’ শুনানিতে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন বিচারপতির
আসন্ন নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর-সহ পশ্চিমবঙ্গের উপনির্বাচনের আগে তাই প্রশ্ন একটাই, দলের নাম ও প্রতীকের এই আইনি লড়াই আর কতদিন ঝুলবে? সুপ্রিম কোর্ট আপাতত সেই সময়সীমাটাই জানতে চেয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে। আগামী সপ্তাহে এই মামলার ফের শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে।








Leave a Comment