বিস্মৃতির আড়াল থেকে বড় পর্দায় ফিরছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম মহিলা পরিচালক, ফাতিমা বেগমের ভূমিকায় ঋতুপর্ণা

By Suman Debnath

November 7, 2026 7:45 PM

বিস্মৃতির আড়াল থেকে বড় পর্দায় ফিরছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম মহিলা পরিচালক, ফাতিমা বেগমের ভূমিকায় ঋতুপর্ণা


ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম মহিলা পরিচালক হিসেবে পরিচিত ফাতিমা বেগম। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিস্মৃতির আড়ালে চলে গিয়েছে তাঁর নাম এবং অসামান্য অবদান। এক শতাব্দী আগে যে নারী পরিচালনার মতো কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে তৈরি করেছিলেন নতুন ইতিহাস, এবার তাঁর জীবন ও চলচ্চিত্র-যাত্রাই উঠে আসবে বড় পর্দায়। আসছে নতুন বাংলা ছবি ‘ফাতমা’। নামভূমিকায় অভিনয় করছেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত।

অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশনের প্রযোজনায় ছবিটি পরিচালনা করছেন অতনু রায়। পেশায় প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক অতনুর চলচ্চিত্র পরিচালনায় হাতেখড়ি হতে চলেছে এই ছবির মাধ্যমে। ১৯২৬ সালে মুক্তি পেয়েছিল ফাতিমা বেগম পরিচালিত ‘বুলবুল-এ-পারিস্তান’। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সেই ছবির নির্মাণের শতবর্ষকে কেন্দ্র করেই তৈরি হচ্ছে ‘ফাতমা’। তবে ছবিটি নিছক কোনও জীবনীচিত্র নয়। বরং ফাতিমা বেগমের জীবন, সংগ্রাম ও কাজের মধ্য দিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়কে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই পরিচালকের উদ্দেশ্য।

১৯২২ সালে তিন মেয়ে সুলতানা, জুবেইদা ও শাহজাদীকে সঙ্গে নিয়ে বোম্বাইয়ে পা রেখেছিলেন ফাতিমা বেগম। অভিনেত্রী হিসেবে চলচ্চিত্রজগতে কাজ শুরু করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফাতমা ফিল্মস’ নামে নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা ও স্টুডিয়ো। সেই সংস্থার ব্যানারেই পরিচালনা করেন ‘বুলবুল-এ-পারিস্তান’। ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন হাতে তৈরি আলোকচিত্রের বিশেষ কৌশল, ক্ষুদ্রাকৃতির সেট এবং হাতে ঘোরানো ক্যামেরার মতো অভিনব প্রযুক্তি।

ফাতিমা বেগমের জীবন অবশ্য শুধু সাফল্যের গল্প নয়। সময়ের সঙ্গে ভেঙে পড়ে তাঁর স্বাধীন স্টুডিয়ো। আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে যায় ছবির নাইট্রেট ফিল্মের রিলও। তাঁর মেয়ে জুবেইদাও পরবর্তী সময়ে তৎকালীন চলচ্চিত্রজগতের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী হয়ে ওঠেন। সাফল্য, সংগ্রাম, পারিবারিক জীবন এবং বিস্মৃতির নানা অধ্যায় নিয়েই এগোবে ‘ফাতমা’র কাহিনি।

আরও পড়ুন:  দেশের উন্নতি করতে হলে চিকিৎসা - শিক্ষা সবার জন্য থাকতে হবে: প্রসেনজিৎ

ছবিতে ফাতিমা বেগমের দুই মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করছেন আনন্দরূপা চক্রবর্তী ও রাতাশ্রী দত্ত।

ছবির বিষয় নির্বাচন এবং পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ প্রসঙ্গে অতনু রায় জানিয়েছেন, চলচ্চিত্রের ছাত্র হিসেবে নতুন কোনও কাজ শুরু করার আগে সেই ক্ষেত্রের পথপ্রদর্শকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো জরুরি বলে তিনি মনে করেন। তাঁর কথায়, ১৯২৬ সালে ফাতিমা বেগম প্রথম নারী হিসেবে চলচ্চিত্র পরিচালনার সাহস দেখিয়েছিলেন। অথচ আজও তিনি প্রাপ্য স্বীকৃতি পাননি। বিভিন্ন জায়গায় কথা বলতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, অনেকেই ফাতিমা বেগমের নাম পর্যন্ত জানেন না। এই বিস্মৃতিই তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। পরিচালকের আরও বক্তব্য, তাঁর নিজের লেখা গল্প ও চিত্রনাট্যগুলিও মূলত নারীকেন্দ্রিক। তাই এই পথিকৃৎ নারীকে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়েই পরিচালনার যাত্রা শুরু করতে চেয়েছেন তিনি।

প্রথম ছবি নিয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী অতনু। প্রস্তুতি প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ছবির মূল ভিত্তি অর্থাৎ চিত্রনাট্য তৈরির পিছনে প্রায় সাড়ে সাত মাস সময় দিয়েছেন তিনি। প্রাক্‌-নির্মাণের কাজেও প্রয়োজনীয় সময় দিতে চান। তাঁর কথায়, অতিরিক্ত স্নায়ুচাপ নিয়ে ছবি তৈরি করতে গেলে কাজের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই শুটিং ফ্লোরে নামতে চান তিনি।

আরও পড়ুন:  শ্রীলেখা মিত্রের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের

ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তকে নামভূমিকায় নির্বাচন প্রসঙ্গে পরিচালকের বক্তব্য, ইতিহাসে যিনি উপেক্ষিত, তাঁকেই সবচেয়ে বড় করে উদ্‌যাপন করা উচিত। ফাতিমা বেগমের মতো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের ভার বহন করার জন্য উপযুক্ত অভিনেত্রী প্রয়োজন। অতনুর প্রশ্ন, এই মুহূর্তে বাংলায় ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ছাড়া আর কে এই চরিত্রের দায়িত্ব নিতে পারতেন? অভিনেত্রী হিসেবে ঋতুপর্ণার দক্ষতার উপর তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তাঁর অভিনয়ের বিস্তৃত পরিসরকে ছবিতে কাজে লাগাতে চান পরিচালক।

আনন্দরূপা চক্রবর্তী সম্পর্কে অতনু জানিয়েছেন, সমসাময়িক বাংলা নাটকের অন্যতম দক্ষ অভিনেত্রী তিনি। মঞ্চে তাঁর অভিনয় দেখেই মুগ্ধ হয়েছিলেন পরিচালক। পরবর্তী সময়ে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিতে একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। পরিচালকের ভাবনা ও কাজের ধরন আনন্দরূপা সহজেই আত্মস্থ করতে পারেন বলেই এই চরিত্রের জন্য তাঁকে বেছে নেওয়া।

অন্যদিকে, রাতাশ্রী দত্তের সঙ্গে কয়েক বছর আগে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে অতনুর। সেই কাজ শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ না হলেও অভিনেত্রী হিসেবে রাতাশ্রীর দক্ষতা তাঁর নজর কেড়েছিল। নতুন ছবির চরিত্রটির সঙ্গে রাতাশ্রীর অভিনয়ের কিছু বৈশিষ্ট্যের মিল খুঁজে পেয়েছেন পরিচালক। তাই চরিত্রটি ভাবার সময় প্রথমেই তাঁর কথা মনে এসেছে।

অঞ্জন বসু প্রযোজিত এবং অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশন নিবেদিত ‘ফাতমা’র শুটিং শুরু হওয়ার কথা আগামী বছরের প্রথম দিকে। পরিচালনায় প্রথম পদক্ষেপেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক বিস্মৃত নারীকে পর্দায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিচ্ছেন অতনু রায়।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment