চলে গেলেন বর্ষীয়ান পরিচালক রাজা সেন। অসুস্থতার কারণে এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। রবিবার সকাল ৯টা ৫৫ মিনিট নাগাদ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন পরিচালক। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে এমনটাই। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।
সম্প্রতি বাড়িতে পড়ে গিয়ে কোমরে চোট পেয়েছিলেন রাজা সেন। এরপর তাঁর শারীরিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি হতে থাকে। তাঁকে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানেই ফুসফুসে সমস্যা দেখা দেয়। হৃদ্রোগে আক্রান্তও হন তিনি। গত সোমবার তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিডনির সমস্যাও দেখা দেয়। শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, বেশ কয়েকবার হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন পরিচালক। বিজেপি বিধায়ক তথা অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারী জানান, ফের কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয় রাজা সেনের। ধীরে ধীরে একাধিক অঙ্গ বিকল হতে শুরু করে। চিকিৎসকেরা আপ্রাণ চেষ্টা করলেও শেষরক্ষা হয়নি।
রাজা সেনের স্ত্রী তথা অভিনেত্রী পাপিয়া সেন জানান, মুম্বই থেকে তাঁর ভাসুর এসেছেন। রয়েছেন দাদা সব্যসাচী চক্রবর্তীও। ছোট মেয়েও রয়েছেন পরিবারের পাশে। বড় মেয়ে জার্মানিতে থাকেন। বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে তিনি ফিরে গিয়েছিলেন। পাপিয়া বলেন, পরিবারের সদস্যরাই আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।
বাংলা বিনোদন জগতে রাজা সেনের অবদান দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। তাঁর পরিচালনায় তৈরি হয়েছে একাধিক জনপ্রিয় ছবি, ধারাবাহিক এবং তথ্যচিত্র। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে তিনটি জাতীয় পুরস্কার। ১৯৯৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দামু’ সেরা শিশুচলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পায়। ছবিটির পরিচালক ছিলেন রাজা সেন।
তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য ছবির তালিকায় রয়েছে ‘আত্মীয় স্বজন’, ‘চক্রব্যূহ’, ‘দেবীপক্ষ’, ‘তিনমূর্তি’, ‘দেশ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ এবং ‘ভালবাসার গল্প’। ‘দেশ’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন জয়া বচ্চন ও অভিষেক বচ্চন। অভিনেতা জিতের কেরিয়ারে অন্য ধারার ছবি হিসেবে পরিচিত ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর পরিচালকও ছিলেন রাজা সেন। ২০১৯ সালে মুক্তি পায় তাঁর পরিচালিত ‘ভালবাসার গল্প’।
তবে বাংলা টেলিভিশনের দর্শকের কাছে রাজা সেন বিশেষভাবে স্মরণীয় তাঁর ধারাবাহিক পরিচালনার জন্য। ১৯৮৭ সালে তাঁর পরিচালিত ‘সুবর্ণলতা’ বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এখনও দর্শকের কাছে সমান প্রিয় এই ধারাবাহিক। পরে ‘কলকাতা কলকাতা’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘আরোগ্য নিকেতন’-এর মতো একাধিক জনপ্রিয় ধারাবাহিক উপহার দিয়েছেন তিনি।
সুদীর্ঘ কেরিয়ারে বেশ কিছু তথ্যচিত্রও তৈরি করেছেন রাজা সেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ৭০ বছর পূর্ণ করেছিলেন তিনি।
কোমরের চোট অবশ্য তাঁর জীবনে নতুন ছিল না। ২০১৬ সালে ‘মায়ামৃদঙ্গ’ ছবির শুটিংয়ের সময় পড়ে গিয়ে কোমরে গুরুতর চোট পেয়েছিলেন পরিচালক। সেই সময় চোটটিকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি তিনি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে বাড়িও ফিরেছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি ফের বাড়িতে পড়ে গিয়ে চোট পান তিনি। সেই থেকেই ক্রমশ অবনতি হতে থাকে শারীরিক অবস্থার।
রবিবার প্রথমে নন্দনে নিয়ে যাওয়া হবে রাজা সেনের মরদেহ। সেখান থেকে গড়ফায় তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে দেহ। এরপর কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।
৪৫ বছরের সঙ্গীকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ স্ত্রী পাপিয়া সেন। প্রিয় পরিচালককে হারিয়ে শোকের ছায়া বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতে।
Leave a Comment