নিজস্ব সংবাদদাতা, যশপাল সিং, ত্রিপুরা, ১৩ ডিসেম্বর, শনিবার: খোয়াই জেলায় শিক্ষাব্যবস্থার হাল ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। শিক্ষা দপ্তরের দীর্ঘদিনের উদাসীনতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতায় একদিকে যেমন ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে, অন্যদিকে তেমনি বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি। আশ্চর্যের বিষয়, একটি বিদ্যালয়ে জেলা শিক্ষা দপ্তর এবং অপরটিতে বিদ্যালয় পরিদর্শকের অফিস—মাত্র ১০০ মিটারের ব্যবধানে অবস্থিত হলেও এই চরম অব্যবস্থার দিকে নজর নেই কারও।
খোয়াই সরকারি দ্বাদশ শ্রেণি বিদ্যালয়ের মূল প্রবেশদ্বারটি আজও দাঁড়িয়ে আছে জরাজীর্ণ ও ভগ্ন অবস্থায়। জানা যায়, ১৯৬৭ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংয়ের আমলে নির্মিত এই লোহার গেটটি গত প্রায় ৫৮ বছরেও সংস্কার করা হয়নি, লাগানো হয়নি নতুন কোনো গেট। বর্তমান ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা অসংখ্যবার সরকারি অনুষ্ঠানে এই বিদ্যালয়ে এলেও মূল ফটকের বেহাল দশা কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি। জেলা সদর খোয়াইয়ের এক ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমন অবস্থা প্রশাসনিক উদাসীনতার জ্বলন্ত উদাহরণ বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে, খোয়াই সরকারি দ্বাদশ শ্রেণি বালিকা বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের উদ্বোধন হয়েছে বহু বছর আগে। নতুন গেট পাওয়ার পর পুরনো প্রবেশদ্বারটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু পুরনো লোহার গ্রিলের তৈরি গেটটি বিদ্যালয় সংলগ্ন রাস্তায় সাইড বাউন্ডারির বাইরে বছরের পর বছর ধরে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে এই গেটটি অন্য কোনো সরকারি বিদ্যালয়ে ব্যবহার করা যেত। অথচ খোয়াই জেলার বহু বিদ্যালয় আজও গেটবিহীন অবস্থায় চলছে। তা সত্ত্বেও শিক্ষা দপ্তরের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
শুধু অবকাঠামোগত অব্যবস্থাই নয়, শিক্ষাদান ব্যবস্থাতেও চরম গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন অভিভাবকেরা। পর্যাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাবে খোয়াই সরকারি দ্বাদশ শ্রেণি বালিকা বিদ্যালয়ে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের একসঙ্গে বসিয়ে ক্লাস করানো হয় বলে অভিযোগ। এতে বড় ও ছোট ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ লেগে থাকে। অভিভাবকেরা বিষয়টি জানালে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব এড়িয়ে যায় বলেও অভিযোগ।
আরও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিয়ে। কোনো শিক্ষার্থী শৌচাগারে গেলে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি, যার জেরে সম্প্রতি এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ে। শিক্ষকদের আচরণ এতটাই কঠোর ও দূরত্বপূর্ণ যে, শিক্ষার্থীরা বিপদে পড়লেও তাঁদের জানাতে সাহস পায় না—বরং বাড়িতে গিয়ে অভিভাবকদের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে বাধ্য হয়।
অভিভাবকদের ক্ষোভ এখানেই থামছে না। তাঁদের দাবি, একাধিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ না করেই ‘পিরিওডিক টেস্ট–২’ সম্পন্ন করা হয়েছে। বিদ্যালয় পরিদর্শক বিপেন কুমার দেববর্মার নিয়মিত পরিদর্শনের অভাব ও দপ্তরের উদাসীনতাকেই এই অবস্থার জন্য দায়ী করছেন তাঁরা। শিক্ষকদের সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মানুবর্তিতা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
বিদ্যাজ্যোতি প্রকল্পের আওতায় চালু হওয়া ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলিতে সিবিএসই অনুমোদিত পাঠ্যক্রম পড়ানোর মতো প্রশিক্ষণ নেই অধিকাংশ শিক্ষকের—এমন অভিযোগও সামনে এসেছে। নামমাত্র ইংরেজি মাধ্যম হলেও বাস্তবে ইংরেজিতে ক্লাস নেওয়া তো দূরের কথা, শুদ্ধ বাংলায় পাঠদানও অনেক ক্ষেত্রে হয় না বলে দাবি অভিভাবকদের।
এদিকে একসঙ্গে ১০,৩২৩ জন শিক্ষকের চাকুরীচ্যুতি এবং প্রতিবছর অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা বাড়তে থাকায় রাজ্যের বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক সংকট ক্রমেই ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণে শিক্ষা দপ্তরের ব্যর্থতাকেই দায়ী করছেন চাকুরীচ্যুত শিক্ষকরা। তাঁদের মতে, আইন মেনে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ওই শিক্ষকদের পুনর্বহাল করা গেলে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র অনেকটাই বদলাতে পারত।
সব মিলিয়ে খোয়াই জেলার শিক্ষাব্যবস্থা আজ গভীর সংকটে। অবকাঠামো থেকে শুরু করে শিক্ষার মান, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নজরদারি—সব ক্ষেত্রেই প্রশ্নের মুখে শিক্ষা দপ্তর। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এই অব্যবস্থার অবসান কবে হবে, সেই প্রশ্নই এখন খোয়াইবাসীর মুখে মুখে।
Leave a Comment