দেশের স্কুলশিক্ষার মানচিত্রটাই বদলে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের অধীন ইউনিফায়েড ডিস্ট্রিক্ট ইনফর্মেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন প্লাসের (ইউডাইস প্লাস, UDISE+) সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, গড়ে প্রতিদিন দেশে বন্ধ হচ্ছে ১৩টি করে স্কুল। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে গোটা দেশে ঝাঁপ পড়েছে মোট ৪,৭৯১টি স্কুলে। শুধু তাই নয়, এই সংখ্যার অর্ধেকের বেশি স্কুল মধ্যপ্রদেশে। রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষামহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা, আর সেই সূত্র ধরেই প্রশ্ন উঠছে বাংলার স্কুলশিক্ষার হালহকিকত নিয়েও।
রোজ বন্ধ হচ্ছে স্কুল
ইউডাইস প্লাসের হিসেব বলছে, ২০২৫-২৬ সালে মধ্যপ্রদেশে বন্ধ হয়েছে ২ হাজার ৪২৬টি স্কুল। রাজ্যের মোট স্কুলের সংখ্যা ১ লক্ষ ২২ হাজার ১২০ থেকে নেমে এসেছে ১ লক্ষ ১৯ হাজার ৬৯৪-এ। শুধু স্কুল বন্ধ হওয়াই নয়, রাজ্যে ২ হাজার ২৬৯টি সরকারি স্কুল চলছে একজন মাত্র শিক্ষক দিয়ে, যার প্রভাব পড়ছে প্রায় ৬২ হাজার পড়ুয়ার উপর। প্রাথমিক স্তরে মাত্র ২২ শতাংশ শিক্ষক পেশাদারভাবে প্রশিক্ষিত, যা গুণমান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। নবম থেকে দশমে স্কুলছুটের হার প্রায় ১৩ শতাংশ, যা যথেষ্ট উদ্বেগজনক বলেই মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
বেসরকারিমুখী গোটা দেশ
শুধু মধ্যপ্রদেশ নয়, গোটা দেশের ছবিটাই কমবেশি একই দিকে ইঙ্গিত করছে। ইউডাইস প্লাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ থেকে ২০২৫-২৬-এর মধ্যে দেশে সরকারি স্কুলের সংখ্যা ১০ লক্ষ ১৩ হাজার ৩২২ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১০ লক্ষ ৫ হাজার ২৪৫-এ, অর্থাৎ এক বছরেই কমেছে ৮০৭৭টি সরকারি স্কুল। উল্টো দিকে বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা বেড়েছে ১০৫৮১টি। সরকারি স্কুলে পড়ুয়া কমেছে প্রায় ২৬ লক্ষ, রাজ্য সরকার পরিচালিত স্কুলে কমেছে আরও ২৭ লক্ষ। অথচ বেসরকারি স্কুলে পড়ুয়া ভর্তি বেড়েছে প্রায় ৩০ লক্ষ। অর্থাৎ, সরকারি পরিকাঠামো ছেড়ে অভিভাবকরা ক্রমশ ঝুঁকছেন বেসরকারি স্কুলের দিকে। তবে তুলনায় ভাল খবর একটাই, তপসিলি জনজাতি বা এসটি (Scheduled Tribe) পড়ুয়াদের ভর্তির হার সামান্য বাড়লেও তফসিলি জাতি (SC) এবং ওবিসি (OBC) পড়ুয়াদের ভর্তি গত ছয় বছরে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বাংলার ছবিটা ঠিক উল্টো
এই জাতীয় প্রবণতার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান কিন্তু বেশ জটিল। এক দিকে সুখবর, রাজ্যে স্কুলছুটের হার কমেছে প্রায় সব স্তরেই। প্রস্তুতিমূলক স্তরে (তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি) স্কুলছুটের হার ২০২৪-২৫ সালের ২.৪ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১.৪ শতাংশে, মাধ্যমিক স্তরেও একই রকম উন্নতি ধরা পড়েছে পরিসংখ্যানে। রাজ্যে সামগ্রিক পড়ুয়া ভর্তির সংখ্যাও বেড়েছে, ২০২৪-২৫ সালের ১.৭০ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ১.৭৭ কোটি।
কিন্তু ঠিক এই সাফল্যের ছবির নীচেই লুকিয়ে রয়েছে একটা কাঁটার মতো তথ্য। শূন্য পড়ুয়ার স্কুলের নিরিখে গোটা দেশে শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যে এমন স্কুলের সংখ্যা ২০২৩-২৪ সালের ৩২৫৪ থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ সালে হয় ৩৮১২। আর ২০২৫-২৬ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১৩৩-এ। অথচ এই স্কুলগুলিতে শিক্ষক নিযুক্ত রয়েছেন প্রায় ১৯ হাজার ৫০২ জন। একই সঙ্গে একজন মাত্র শিক্ষকে চলা স্কুলের সংখ্যাও রাজ্যে বেড়েছে, ৬৪৮২ থেকে হয়েছে ৬৭৬৯।
এর সবটাই যে ১৫ বছর ধরে চলা তৃণমূল সরকারের ফেলে যাওয়া কৃতকর্ম, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই কাঁটা কী করে নির্মূল করে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার, সেটাই দেখার।
শূন্য পড়ুয়ার স্কুলই আগামীর বিপদ
মধ্যপ্রদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, ঠিক এই ধরনের শূন্য বা অতি স্বল্প পড়ুয়ার স্কুল এবং একজন মাত্র শিক্ষক নিয়ে চলা স্কুলগুলিই ভবিষ্যতে সংযুক্তিকরণ বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার তালিকায় সবার আগে পড়ে। বাংলার ক্ষেত্রেও তাই এই পরিসংখ্যান নিছক কাগুজে তথ্য নয়, বরং আগামী দিনের সম্ভাব্য প্রবণতার ইঙ্গিতবাহী… এমনটাই মনে করছেন শিক্ষবিদদের একাংশ। রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া থমকে থাকার প্রভাবও এই সংকটের পিছনে কাজ করছে বলে অভিমত। ২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের (School Service Commission) নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল হওয়ার পর হাজার হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য থেকে গিয়েছিল দীর্ঘদিন। সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া এখন শুরু হলেও, তার প্রভাব বাস্তবে পুরোপুরি প্রতিফলিত হতে এখনও সময় লাগবে। যেহেতু বিষয়টি আদালতের নজরদারিতে রয়েছে, তাই নিয়োগ সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনই বলা সম্ভব নয়।
পরিকাঠামোয় উন্নতি
ইতিবাচক দিক হল, পরিকাঠামোগত উন্নয়নে রাজ্যের অগ্রগতি ধরা পড়েছে জাতীয় পরিসংখ্যানেও। দেশজুড়ে ২০২৫-২৬ সালে ৫৮.২ শতাংশ স্কুলে র্যাম্প ও হ্যান্ডরেল বসানো হয়েছে, ইন্টারনেট সংযোগ পৌঁছেছে ৬৭.৪ শতাংশ স্কুলে। শৌচাগার, বিদ্যুৎ, পানীয় জলের মতো প্রাথমিক সুবিধাও পৌঁছেছে প্রায় সব স্কুলেই। তবে পরিকাঠামোর এই অগ্রগতি সত্ত্বেও পড়ুয়ার সংখ্যা এবং শিক্ষকের অনুপাতের সংকট যে সহজে মিটছে না, ইউডাইস প্লাসের এই রিপোর্ট তারই স্পষ্ট প্রমাণ। জাতীয় শিক্ষা নীতির (National Education Policy, NEP 2020) লক্ষ্যপূরণে এই ফারাক ঘোচানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
Leave a Comment