আবহাওয়াপশ্চিমবঙ্গভারতচাকরিরাশিফলআইপিএলআধ্যাত্মিকটাকা পয়সাস্বাস্থ্যলাইফস্টাইলমিউচুয়াল ফান্ডব্যবসাঅন্যান্যশেয়ার বাজারটিভি সিরিয়াল

এসটিডি-আইএসডি-পিসিও সেন্টার: এক সময়ের যোগাযোগের সেতুবন্ধন!

By Mrinmoy Roy

Published on: January 31, 2026

Follow Us

---Advertisement---

তেলিয়ামুড়া, মৃন্ময় রায়, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬, শনিবার : একটা সময় ছিল, যখন মোবাইল ফোন ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না, আর চ্যাটিং বা ভিডিও কল ছিল কল্পনার বাইরে। তখন প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ছিল এসটিডি (STD), আইএসডি (ISD), আর পিসিও (PCO) বুথ। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই গড়ে উঠেছিল এই ধরনের কল সেন্টার, যেগুলো শুধু যোগাযোগের মাধ্যমই নয়, অনেক পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎসও ছিল।
তেলিয়ামুড়ার বাসিন্দা সমীর সাহা ছিলেন এমনই একজন, যিনি তাঁর ছোট্ট এসটিডি দোকানটিকে ভালোবাসা আর পরিশ্রম দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন। আজও তাঁর দোকানের কোণায় রাখা পুরনো মনিটর, মোটা তারের ল্যান্ডলাইন ফোন, আর সেই বিখ্যাত বোর্ড—“STD ISD PCO Available Here”—সবই যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে এক হারিয়ে যাওয়া যুগের।
সমীর বাবু বলেন, একটা সময় ছিল, যখন মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত ফোন করার জন্য। কেউ কেউ তো আগেই আত্মীয়দের বলে রাখত এই সময় ফোন করবো, তোরা থাকিস। সেই সময়ে ফোন করা মানেই ছিল একটা বড় ঘটনা। কেউ চাকরির ইন্টারভিউ দিচ্ছে, কেউ বা প্রিয়জনের খোঁজ নিচ্ছে, আবার কেউ কেউ কাঁদতে কাঁদতে খবর দিচ্ছে দূর দেশে থাকা আত্মীয়কে।
তেলিয়ামুড়া শহরে ছিল বেশ কিছু জনপ্রিয় পিসিও সেন্টার, যেগুলো স্থানীয়দের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল দেব লিংক সেন্টার,পায়েল ফটোস্ট্রেট সেন্টার,কম্পিউটার নিক্স- কে কে প্রেস কল সেন্টার- জগতবন্ধু বুক স্টোরস এটি ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, যেখানে বইয়ের পাশাপাশি কল করার সুবিধাও ছিল। এসব সেন্টার শুধু কল করার জায়গা ছিল না, বরং মানুষের আবেগ, অপেক্ষা আর ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। দোকানের সামনে লেখা থাকত—“STD ISD PCO Available Here”, আর সেই লেখাই যেন ছিল আশার আলো। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে যোগাযোগের ধরন। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, হোয়াটসঅ্যাপ, ভিডিও কল সবকিছুই এখন হাতের মুঠোয়। ফলে এসটিডি-আইএসডি-পিসিও সেন্টারগুলোর প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে। একে একে বন্ধ হয়ে গেছে দোকানগুলো। অনেকেই পেশা বদলেছেন, কেউ কেউ অন্য ব্যবসায় নেমেছেন, কেউ আবার হারিয়ে গেছেন জীবনের চাপে। তবে সমীরদার মতো কিছু মানুষ আজও তাঁদের পুরনো দোকানটিকে আগলে রেখেছেন, যেন স্মৃতির এক টুকরো জায়গা। তিনি বলেন, এই মেশিনটা দিয়ে আমি শুধু ব্যবসা করিনি, আমার জীবিকা ও এই মনিটরটির মধ্য দিয়ে ছিল যা রোজগার হতো আমার সংসারের কাজে আসতো আমার পরিবারও চলত এ ব্যবসা দিয়ে আজ তা হারিয়ে গেল আধুনিকতার প্রযুক্তির কাছে। পাশাপাশি মানুষের আবেগের অংশ হয়ে আছে এই মেশিনটা। আজকের প্রজন্ম জানেই না, একটা ফোন কলের জন্য কতটা অপেক্ষা করতে হতো। আজকের তরুণ-তরুণীরা হয়তো জানেই না এসটিডি, আইএসডি বা পিসিও কী। তাদের কাছে এগুলো শুধুই অজানা এক শব্দ। কিন্তু যারা সেই সময়ের সাক্ষী, তাদের মনে আজও গেঁথে আছে সেই দিনগুলোর কথা যখন একটি ফোন কল মানে ছিল অপেক্ষা, আবেগ, আর প্রিয়জনের কণ্ঠস্বর শোনার একমাত্র উপায় । এসটিডি-আইএসডি-পিসিও সেন্টারগুলো ছিল একেকটি ছোট ছোট গল্পের জন্মস্থান। কেউ প্রথম প্রেমিকাকে ফোন করছে, কেউ বিদেশে থাকা ছেলেকে জানাচ্ছে মায়ের অসুস্থতার খবর, কেউ আবার চাকরির খোঁজে ফোন দিচ্ছে শহরের বড় অফিসে। এই সেন্টারগুলো ছিল মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক অধ্যায়। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি এগিয়েছে, কিন্তু কিছু স্মৃতি চিরকাল অমলিন থেকে যায়। এসটিডি-আইএসডি-পিসিও সেন্টারগুলো আজ আর নেই, কিন্তু সেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষ, গল্প আর আবেগ আজও জীবন্ত। সমীর বাবুর মতো মানুষরা সেই স্মৃতিকে ধরে রেখেছেন, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানে একটা সময় ছিল, যখন একটা ফোন কল মানে ছিল ভালোবাসা, অপেক্ষা আর জীবনের গল্প।

Mrinmoy Roy

Journalist

Leave a Comment