ভারতের জীবাশ্মবিদ্যা বা প্যালিয়েন্টোলজির ইতিহাসে এক অদ্ভুত এবং রোমাঞ্চকর যোগসূত্র রয়েছে। একদিকে রয়েছেন এক বিশ্ববরেণ্য কবি, আর অন্যদিকে এক তরুণ ভূতত্ত্ববিদ। আর তাঁদের এই মেলবন্ধন ঘটিয়েছিল মধ্য ভারতে আবিষ্কৃত একটি বিশালাকার ডাইনোসর! ষাট বছরেরও বেশি সময় আগে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (Rabindranath Tagore) জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে একটি সদ্য আবিষ্কৃত ডাইনোসরের নামকরণ করা হয়েছিল তাঁরই নামে। আর যে তরুণ ভূতত্ত্ববিদের হাত ধরে মাটি খুঁড়ে এই অতিকায় প্রাণীর ফসিল উঠে এসেছিল, পরবর্তীকালে তাঁর নামেও একটি ডাইনোসরের নামকরণ করা হয়।
আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট ও খননকাজ
এই রোমাঞ্চকর ইতিহাসের শুরুটা হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। সে বছর বর্তমান মহারাষ্ট্রের গড়চিরোলি জেলার (তেলঙ্গানা সীমান্তের কাছে) পোচামপল্লির কাছে প্রথমবার ডাইনোসরের হাড়ের সন্ধান পান ভূতত্ত্ববিদরা। এরপর ১৯৬০-৬১ সাল জুড়ে সেখানে বৈজ্ঞানিক খননকাজ চালায় কলকাতার ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট’ (ISI) বা আইএসআই-এর জিওলজিক্যাল স্টাডিজ ইউনিট এবং ‘ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন’-এর গবেষকরা। ব্রিটিশ প্রত্নজীববিদ পামেলা রবিনসনের নেতৃত্বাধীন এই দলে ছিলেন এক তরুণ ভারতীয় প্রত্নজীববিদ, যাঁর নাম সোহন লাল জৈন (Sohan Lal Jain)। এই খননকার্য থেকেই উদ্ধার হয় প্রায় ৩০০টি হাড়, যা অন্তত ছ’টি আলাদা আলাদা অতিকায় তৃণভোজী ডাইনোসরের (Sauropods) অবশিষ্টাংশ।
বারাপাসরাস টেগোরি
১৯৬১ সাল ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ। সেই বছর আইএসআই-এর সায়েন্টিফিক কাউন্সিল কবিগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এই নতুন প্রজাতির ডাইনোসরের নাম রাখে ‘বারাপাসরাস টেগোরি’ (Barapasaurus tagorei)। ‘বারাপাসরাস’ শব্দের অর্থ হল বড় পা-যুক্ত সরীসৃপ। প্রাণীটির উরুর হাড়ই ছিল প্রায় ১.৭ মিটার দীর্ঘ। বিজ্ঞানীদের অনুমান, ১২ থেকে ১৪ মিটার লম্বা এই ডাইনোসরগুলো আজ থেকে প্রায় ১৯ কোটি বছর আগে অর্থাৎ জুরাসিক যুগের গোড়ার দিকে পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়াত। ১৯৭৫ সালে এস এল জৈন, টি এস কুট্টি, টি কে রায়চৌধুরী এবং শঙ্কর চট্টোপাধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজাতিটির সবিস্তার বর্ণনা দেন। বর্তমানে বারাপাসরাস টেগোরি-র সেই কঙ্কালটি কলকাতার আইএসআই-এর ভূতাত্ত্বিক মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে।
বিজ্ঞানী এস এল জৈন এবং ‘জৈনোসরাস’
সোহন লাল জৈনের জন্য অবশ্য বারাপাসরাসের আবিষ্কারটা ছিল নেহাতই শুরু। তিনি ৩৩ বছর ধরে আইএসআই-তে তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান। মধ্য ভারতের ল্যামেটা ফরমেশন থেকে উদ্ধার হওয়া ডাইনোসরের মস্তিষ্কের গঠন নিয়ে তাঁর কাজ জীবাশ্মবিদ্যায় বড় অবদান হিসেবে ধরা হয়। তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৫ সালে অ্যাড্রিয়ান হান্ট, মার্টিন লকলি-সহ আন্তর্জাতিক প্রত্নজীববিদদের একটি দল একটি ডাইনোসর জেনাস বা গোত্রের নামকরণ করেন ‘জৈনোসরাস’ (Jainosaurus)। অর্থাৎ, যে বিজ্ঞানী ভারতের মাটির তলা থেকে ডাইনোসর খুঁজে বের করেছিলেন, ইতিহাসের পাতায় তাঁর নামও একটি ডাইনোসরের সঙ্গে পাকাপাকিভাবে জুড়ে যায়।
‘আইসিসরাস’ ও আইএসআই-এর অবদান
সোহন লাল জৈনের মুকুটে রয়েছে আরও একটি পালক। ১৯৯৭ সালে তিনি এবং শাশ্বতী বন্দ্যোপাধ্যায় সেন্ট্রাল ইন্ডিয়ার ‘লেট ক্রিটেসিয়াস’ যুগের আরেকটি ডাইনোসরের ফসিল বর্ণনা করেন, যার নাম রাখা হয়েছিল ‘টাইটানোসরাস কলবার্টি’। পরে ২০০৩ সালে জেফরি উইলসন এবং পল আপচার্চ এর নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম রাখেন ‘আইসিসরাস’ (Isisaurus)। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট বা আইএসআই-এর (ISI) সম্মানেই এই নামকরণ করা হয়েছিল, কারণ এখানেই মূল্যবান ফসিলগুলো সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে।
Leave a Comment