তিন মাসের নজিরবিহীন অন্তর্দ্বন্দ্বের অবসান: সীমা খান্নার ওপর নজরদারির ক্ষমতা ফেরাল নির্বাচন কমিশন

By Suman Debnath

November 5, 2026 5:20 PM

তিন মাসের নজিরবিহীন অন্তর্দ্বন্দ্বের অবসান: সীমা খান্নার ওপর নজরদারির ক্ষমতা ফেরাল নির্বাচন কমিশন


দেশের কোটি কোটি ভোটারের তথ্যভাণ্ডার থেকে শুরু করে ইভিএম (EVM) ম্যানেজমেন্ট, সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা তথ্যপ্রযুক্তি (IT) বিভাগ নিয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনের অন্দরে চলা দীর্ঘ তিন মাসের টানাপড়েনের অবশেষে ইতি ঘটল। মঙ্গলবার এক তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন তাদের আইটি প্রধান সীমা খান্নার ওপর সরাসরি তদারকি বা ওভারসাইট (oversight) করার ক্ষমতা পুনর্বহাল করেছে। প্রায় তিন মাস আগে একটি বিতর্কিত নির্দেশিকার মাধ্যমে এই নজরদারি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যা ঘিরে সাংবিধানিক এই সংস্থাটির শীর্ষ কর্তাদের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা দেয়।ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অই তথ্য জানিয়েছে।

এই নজিরবিহীন অন্তর্দ্বন্দ্বের সূত্রপাত মূলত ২০২৫-২৬ সালের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) বা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। এই প্রক্রিয়ায় দেশজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়া নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে যখন নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ডিজিটাল পোর্টাল ‘ইসিআইনেট’ (ECINET)-এ বড়সড় প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা যায়। কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে বাতিল হওয়া অনেক বৈধ ভোটারের নাম পোর্টালে পুনরায় যুক্ত করতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় আধিকারিকদের, যার জেরে ট্রাইব্যুনাল বিচারকদেরও কমিশনের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল।

আরও পড়ুন:  ভারতীয় নৌসেনা ও বিমান বাহিনীতে বড় রদবদল, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এএন প্রমোদ ও এয়ার মার্শাল তেজপাল সিং

প্রযুক্তিগত এই অব্যবস্থাপনা এবং ভোটার তালিকা নিয়ে দেশজুড়ে চলা বিতর্কের আঁচ সরাসরি এসে পড়ে নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরে। কাজের পদ্ধতি ও দায়বদ্ধতা নিয়ে শীর্ষ কর্তাদের মধ্যে স্পষ্ট মতানৈক্য তৈরি হয়। এই ডামাডোলের মাঝেই আচমকা একটি ‘ওয়ার্ক রিঅ্যালোকেশন অর্ডার’ বা কাজের বন্টন সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করে আইটি বিভাগের ওপর থেকে শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি তদারকির রাশ আলগা করা হয়। একটি স্বশাসিত ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের কোর সেক্টরে এমন আকস্মিক রদবদল প্রশাসনিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র জল্পনা উসকে দেয়।

তবে তিন মাসের মাথাতেই নির্বাচন কমিশনকে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে আসতে হলো। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের মতো বিশাল গণতান্ত্রিক কাঠামোয় বর্তমান যুগের নির্বাচন কার্যত পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর। সাইবার নিরাপত্তা, ইভিএম ট্র্যাকিং, ডেটাবেস রক্ষণাবেক্ষণ এবং রিয়েল-টাইম ডেটা ম্যানেজমেন্ট, আইটি বিভাগের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি ছাড়া গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়াই যে কোনও মুহূর্তে বড়সড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। নেতৃত্বহীনতা বা নির্দেশনার অভাব কাজের গতিকে চরমভাবে ব্যাহত করছিল।

আরও পড়ুন:  সাংবিধানিক সংস্থায় অনাস্থা গণতন্ত্রের বিপদ: ভোট চুরির অভিযোগে বিদ্ধ কমিশনের পাশে ৪২ প্রাক্তন বিচারপতি

পাশাপাশি, বিরোধী দলগুলোর প্রবল চাপ এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টের কড়া নজরদারির মধ্যে নিজেদের ভেতরের এই ফাটল জিইয়ে রাখাটা কমিশনের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তির পক্ষে মোটেও ইতিবাচক ছিল না। এই দ্বন্দ্বের খবর বাইরে আসায় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ছিল।

অবশেষে সমস্ত জল্পনা ও মতানৈক্যের অবসান ঘটিয়ে কমিশন আগের ব্যবস্থাতেই ফিরে গেল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তদারকির ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তটি কেবল একটি রুটিন প্রশাসনিক রদবদল নয়, বরং আসন্ন নির্বাচনগুলোর আগে নিজেদের পরিকাঠামোর অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং দেশবাসীর কাছে একটি ঐক্যবদ্ধ, স্বচ্ছ ও ত্রুটিমুক্ত প্রশাসনিক ভাবমূর্তি তুলে ধরার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও কৌশলগত পদক্ষেপ।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment