এক দিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী ছায়া, অন্য দিকে অদৃশ্য সাইবার হানা (Cyberattack)। সঙ্গে গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো খামখেয়ালি প্রকৃতির রুদ্ররূপ। এই ত্র্যহস্পর্শে দাঁড়িয়ে হঠাৎই যেন প্যানিক বাটনে চাপ দিয়েছে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলি। ব্রিটেন, আমেরিকা, জাপান থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (European Union)– নাগরিকদের জন্য সরকারের তরফে জারি হচ্ছে এক বিশেষ সতর্কবার্তা। সাধারণ মানুষকে বলা হচ্ছে, অন্তত ৭২ ঘণ্টা অর্থাৎ টানা তিন দিন কোনও সাহায্য ছাড়া টিকে থাকার মতো জরুরি রসদ (Emergency Supplies) যেন প্রতিটি পরিবার নিজেদের ঘরে মজুত রাখে।
কিন্তু হঠাৎ কেন এই ‘৭২ ঘণ্টার’ ডেডলাইন? তবে কি পর্দার আড়ালে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের (World War III) দামামা বেজে গিয়েছে? নাকি এটি আধুনিক যুগের নতুন কোনও ‘ডুমসডে ওয়ার্নিং’ (Doomsday Warning) বা মহাপ্রলয়ের লাল সতর্কতা? বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া এই জল্পনার আসল ছবিটা ঠিক কী এবং ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের কাছেই বা এই ‘৭২ ঘণ্টার থিওরি’ কতটা প্রাসঙ্গিক, রইল তারই চুলচেরা বিশ্লেষণ।
হঠাৎ কেন এই তৎপরতা?
গত ২২ অক্টোবর ব্রিটেনের ক্যাবিনেট অফিস (UK Cabinet Office) নতুন করে তাদের ‘বি রেডি’ (Be Ready Campaign) অভিযান শুরু করেছে। ব্রিটিশ নাগরিকদের স্পষ্ট জানানো হয়েছে, যে কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে অন্তত তিন দিন নিজেদের মতো করে টিকে থাকার রসদ যেন বাড়িতে মজুত রাখা হয়। ব্রিটেনের ২০২৫ সালের ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি’-তে (National Security Strategy) রুশ আগ্রাসন, শত্রু দেশের সাইবার হানা এবং অন্তর্ঘাত বা নাশকতাকে (Sabotage) দেশের প্রধান নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্রিটেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং (Wes Streeting) ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছেন যে, শত্রুমনোভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলি প্রথাগত সেনা অভিযানের বদলে সরাসরি দেশের পরিকাঠামো ও ডিজিটাল ব্যবস্থায় আঘাত হানতে পারে। ঘটনাচক্রে, এই নির্দেশিকা প্রকাশের দিনই পিএইচপি (PHP) প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজে একটি নিরাপত্তার গাফিলতি ধরা পড়ায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্রিটেনের ৩২টি সরকারি ওয়েবসাইট সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
অন্য দিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছবিটা আরও চমকপ্রদ। ‘ফরচুন’ (Fortune) এবং ‘ফক্স নিউজ ডিজিটাল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন (Pentagon) তৈরি করছে ‘ফোর্ট্রেস’ (FORTRESS বা Federal Operations for Resilience, Troop Resources, Energy, Supply, and Survivability) নামের এক বিশেষ মেগা-প্ল্যান। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হল, যুদ্ধ বা বড়সড় সাইবার হানায় দেশের সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রিড (Power Grid) ও সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়লেও আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের প্রতিটি বড় সেনাঘাঁটি যাতে বাইরের সাহায্য ছাড়াই টানা ৯০ দিন (90 Days) সচল থাকতে পারে। তার জন্য পোর্টেবল নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর, মেগা ব্যাটারি স্টোরেজ ও মাইক্রোগ্রিড তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মার্কিন সরকারের নিজস্ব ‘রেডি ডট গভ’ (Ready.gov) পোর্টালে সাধারণ নাগরিকদেরও অন্তত ৭২ ঘণ্টার খাবার ও জল মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এমনকি প্রাক্তন এফবিআই ডেপুটি ডিরেক্টর ড্যান বঙ্গিনো (Dan Bongino) সম্প্রতি মার্কিন নাগরিকদের প্যানিক না করে নিজের বাড়িকেই ‘ফোর্ট্রেস’ বা দুর্গ হিসেবে প্রস্তুত রাখার আর্জি জানিয়েছেন।
জাপান থেকে ইউরোপ, সবাই সতর্ক
শুধু ইংল্যান্ড-মার্কিন বলয় নয়, এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলিও হাঁটছে একই পথে। ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দেশ জাপানে আগামী ২ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে যাত্রা শুরু করছে তাদের নতুন ‘ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি’ (National Disaster Management Agency)। জাপানের বিপর্যয় মোকাবিলা মন্ত্রী গোশি হোসোনো (Goshi Hosono) জানিয়েছেন, বড় ভূমিকম্প বা মাউন্ট ফুজির সম্ভাব্য অগ্নুৎপাতের মতো বিপর্যয়ের কথা মাথায় রেখে প্রতিটি পরিবারকে অন্তত তিন দিন এবং সম্ভব হলে এক সপ্তাহের খাবার, পানীয় জল ও পোর্টেবল টয়লেট মজুত রাখার আবেদন জানানো হবে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে গৃহীত ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ (Preparedness Union Strategy) অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৪৫ কোটি নাগরিককে যে কোনও জরুরি অবস্থার প্রথম ৭২ ঘণ্টা স্বনির্ভর থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘ল্য মঁদ’ (Le Monde) বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে ফিনল্যান্ড, সুইডেন, পোল্যান্ড, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া তাদের সিভিল ডিফেন্স (Civil Defence) বা নাগরিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়েছে। ফিনল্যান্ড ইতিমধ্যেই দেশের জন্য ৯ মাসের খাদ্যশস্য মজুত করেছে, সুইডেন ফিরিয়ে এনেছে তাদের ‘টোটাল ডিফেন্স’ (Total Defence) নীতি এবং পোল্যান্ড নতুন সিভিল ডিফেন্স আইন পাশ করে বাঙ্কার ও শেল্টার সংস্কারে নেমেছে। ফ্রান্সও প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে ‘নির্ধারক সময়’ (Decisive Period) চিহ্নিত করে নাগরিকদের জরুরি ‘গো-ব্যাগ’ (Go-Bag) বা ‘পালানোর ঝোলা’ তৈরি রাখতে বলেছে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা?
আন্তর্জাতিক মহলের এই তৎপরতা দেখে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তবে কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ (World War III) আসন্ন? প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা অবশ্য স্পষ্ট জানাচ্ছেন, এর সঙ্গে আশু বিশ্বযুদ্ধ শুরুর কোনও সম্পর্ক নেই।
বিভিন্ন দেশের উদ্বেগের কারণও ভিন্ন। ওয়াশিংটনের নজর যেখানে সামরিক ঘাঁটির স্বনির্ভরতায়, জাপানের মাথাব্যথা সেখানে ভূমিকম্প নিয়ে। আবার পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির চিন্তা রাশিয়ার সম্ভাব্য হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার (Hybrid Warfare) বা পরিকাঠামোগত নাশকতা নিয়ে। তা হলে সবাই কেন ৭২ ঘণ্টার কথাই বলছে?
যে কোনও বড় বিপর্যয়– তা সে বিধ্বংসী ঝড় হোক, ব্ল্যাকআউট (Blackout) বা সাইবার হানা, প্রথম ৭২ ঘণ্টায় সরকারি উদ্ধারকারী দল ও প্রশাসনের মূল লক্ষ্য থাকে হাসপাতাল সচল রাখা, আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করা এবং জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা মেরামত করা। এই সময় সাধারণ মানুষ যদি নিজেদের খাবার ও জলের সংস্থান নিজেরা করে নিতে পারেন, তবে প্রশাসনের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে না।
আধুনিক যুগে কোনও দেশে সেনা না পাঠিয়েও শুধুমাত্র পাওয়ার গ্রিড, ব্যাঙ্কিং সার্ভার ও টেলিকম নেটওয়ার্কে সাইবার হানা চালিয়ে জনজীবন স্তব্ধ করে দেওয়া সম্ভব। সে ক্ষেত্রে এটিএম (ATM) বা অনলাইন পেমেন্ট (Digital Payment) বন্ধ হয়ে গেলে প্রথম তিন দিন সামাল দেওয়ার একমাত্র উপায় ঘরের মজুত রসদ।
মাসের পর মাস রসদ মজুত করা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে খরচে ও জায়গার অভাবে অসম্ভব। কিন্তু তিন দিনের রসদ যে কোনও ছোট ফ্ল্যাট বা বাড়িতে অনায়াসেই রাখা যায় এবং এতে বাজারে কৃত্রিম আকাল তৈরি হয় না।
পালানোর ঝোলায় কী কী থাকা জরুরি?
ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাপানের গাইডলাইন অনুযায়ী একটি আদর্শ ‘৭২ ঘণ্টার এমার্জেন্সি কিট’ (72-Hour Emergency Kit)-এ যা যা থাকা উচিত:
পানীয় জল (Drinking Water): মাথাপিছু প্রতিদিন অন্তত ৩ লিটার হিসেবে তিন দিনের পানীয় জল। রান্না ও পরিচ্ছন্নতার জন্য আলাদা জলের ব্যবস্থা।
শুকনো খাবার (Non-Perishable Food): রান্না না করেই খাওয়া যায় বা সামান্য গরমেই তৈরি হয় এমন খাবার (টিনজাত খাবার, শুকনো খাবার, ড্রাই ফ্রুটস, এনার্জি বার, শিশুদের ফর্মুলা দুধ)।
আলো ও যোগাযোগ (Light & Communication): ভালো মানের টর্চ, অতিরিক্ত ব্যাটারি, ফুল চার্জ দেওয়া পাওয়ার ব্যাঙ্ক (Power Bank) এবং ব্যাটারি বা দম দেওয়া রেডিও (Wind-up FM Radio)। কারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট বসে গেলে সরকারি বার্তা শোনার একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়াবে রেডিও।
নগদ টাকা ও নথি (Cash & Documents): ইউপিআই বা কার্ড অচল হয়ে পড়লে কাজের জন্য খুচরো ও নোট মিলিয়ে পর্যাপ্ত নগদ টাকা (Hard Cash)। এ ছাড়া জরুরি পরিচয়পত্র, বিমার কাগজ ও জরুরি ফোন নাম্বারের প্রিন্টেড কপি ওয়াটারপ্রুফ পাউচে রাখা।
ওষুধ ও স্বাস্থ্যবিধি (First-Aid & Hygiene): ফার্স্ট-এইড বক্স, পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত ওষুধ (অন্তত ৭ দিনের), ওআরএস, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ওয়েট ওয়াইপস এবং পোর্টেবল টয়লেট ব্যাগ।
আমপান থেকে ‘অর্ণব’: বাংলার ঘরেও প্রাসঙ্গিক
পশ্চিমী দুনিয়া আজ যে ‘৭২ ঘণ্টার’ পাঠ পড়ছে, বঙ্গোপসাগরের উপকূলে থাকা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে তা কিন্তু মোটেই কোনও অচেনা ‘ডুমসডে’ তত্ত্ব নয়, বরং অত্যন্ত পরিচিত এক বাস্তব।
এই সপ্তাহেই অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আছড়ে পড়া প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর (Cyclone Arnab) কথাই ধরা যাক। অন্ধ্রে ল্যান্ডফল করলেও তার প্রভাবে কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, দুই ২৪ পরগনা, দুই মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম থেকে শুরু করে উত্তরের দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারে আবহাওয়ার সতর্কতা জারি করতে হয়েছে। সাগর, ধবলাট বা চেমাগুড়ির মতো সুন্দরবনের নদীবাঁধ সংলগ্ন এলাকাগুলিতে মোতায়েন করতে হয়েছে সিভিল ডিফেন্স ভলান্টিয়ারদের (Civil Defence Volunteers)।
গত কয়েক বছরে আমপান (Amphan), ইয়াস (Yaas), রেমাল (Remal) বা ডানা-র (Dana) মতো ঘূর্ণিঝড় এবং উত্তরবঙ্গের সাম্প্রতিক মেঘভাঙা বৃষ্টি ও হড়পা বান বাঙালিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, প্রকৃতি রুষ্ট হলে খাস কলকাতাতেও টানা ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ, পানীয় জলের পাম্প এবং মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা কী ভাবে স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে।
জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ (NDMA) এবং রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তর (West Bengal Disaster Management Department) তাই বারবার যে পরামর্শ দেয়, তার মূল সুর এই ৭২ ঘণ্টার ফর্মুলার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
বাঙালির নিজস্ব ‘ড্রাই রেশন’: টিনজাত খাবারের বদলে বাংলার আবহাওয়ায় চিঁড়ে, মুড়ি, ছাতু, গুড়, বিস্কুট, কেক ও খোলায় ভাজা ছোলা-বাদাম, যা বিনা উনুনেই তিন দিন পেট ভরাতে পারে।
ডিজিটাল নির্ভরতার ফাঁদ: আজ পাড়ার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ওষুধের দোকান— সর্বত্র ইউপিআই-এর (UPI) জমানা। কিন্তু ঝড় বা বিপর্যয়ে টাওয়ার ও বিদ্যুৎ চলে গেলে ডিজিটাল ওয়ালেট অকেজো হয়ে পড়ে। তাই ঘরে নগদ টাকা রাখা এখন বাংলার প্রতিটি পরিবারের জন্যই বাধ্যতামূলক।
জল ও পাওয়ার ব্যাকআপ: পুরসভার জলের পাম্প বন্ধ থাকলে পানীয় জলের সঙ্কট সবথেকে তীব্র হয়। তাই পর্যাপ্ত পানীয় জল, জল শোধনের ট্যাবলেট বা ফিটকিরি এবং অন্তত ২০,০০০ এমএএইচ (mAh) ক্ষমতার চার্জড পাওয়ার ব্যাঙ্ক ও সোলার লণ্ঠন ঘরে রাখা নিছক বিলাসিতা নয়, দূরদর্শিতা।
মোদ্দা কথাটা হল, সাবধানের মার নেই। জরুরি প্রস্তুতি নেওয়া মানেই যুদ্ধ বা মহাপ্রলয় ডেকে আনা নয়, বরং যে কোনও অপ্রত্যাশিত ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে পরিবারকে নিরাপদ ও আতঙ্কমুক্ত রাখা।
Leave a Comment