আবাসনে বিদেশি মদের দোকান চালানোর অনুমতি নিয়ে কলকাতা পুরসভা ও এক ব্যবসায়ীর আইনি লড়াইয়ে বড়সড় ধাক্কা খেল পুরসভা। নয়াবাদের একটি আবাসনে বিদেশি মদের দোকান চালানোর জন্য জারি করা ‘সার্টিফিকেট অফ এনলিস্টমেন্ট’ বা ব্যবসায়িক নথি বাতিলের সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিল কলকাতা হাইকোর্ট। বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আইনের বাইরে গিয়ে কোনও নির্দেশিকা বা বিধিনিষেধ চাপিয়ে ব্যবসার অধিকার খর্ব করা যায় না। আদালতের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর লাইসেন্স পুনর্বহাল হয়েছে।
মামলাকারী মীরা গোস্বামী পক্ষের আইনজীবী অপলক বসু আদালতে জানান, দক্ষিণ কলকাতার ৩২০৪, নয়াবাদের ‘আক্কা অ্যাপার্টমেন্ট’-এর একতলায় ‘তিলোকা এফএল অন শপ’ নামে বিদেশি মদের দোকান চালান। তাঁর দাবি, দোকানের প্রবেশপথ আবাসনের বাসিন্দাদের প্রবেশপথ থেকে পৃথক। আরামবাগ থেকে নয়াবাদে ব্যবসা স্থানান্তরের জন্য তিনি রাজ্যের আবগারি দপ্তরের অনুমোদনও পেয়েছিলেন। প্রয়োজনীয় অনুমতি ও নথিপত্র সংগ্রহের পর ২০২৫ সালের ১ আগস্ট দোকান চালু করেন তিনি।
অভিযোগ, দোকান চালু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আবাসনের বাসিন্দাদের একাংশের গণ-অভিযোগের ভিত্তিতে নড়েচড়ে বসে কলকাতা পুরসভা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানোর পর ২০২৬ সালের ২ জুন এক সংক্ষিপ্ত নির্দেশে ব্যবসার সার্টিফিকেট বাতিল করা হয়। এর ফলে আবগারি দপ্তরের বৈধ লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও বন্ধ হয়ে যায় ব্যবসা।
মামলার শুনানিতে পুরসভার কাছে জানতে চেয়েছিল আদালত, কলকাতা পুরসভার আওতায় কতগুলি আবাসিক ভবনে বিদেশি মদের দোকান চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পুরসভা যে তালিকা জমা দেয়, তা অবশ্য কেবল ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের। সেই তালিকাতেই অন্তত পাঁচটি আবাসিক কমপ্লেক্সে মদের ব্যবসার অনুমতির উল্লেখ পাওয়া যায়।
এই পরিস্থিতিতে মামলাকারীর ক্ষেত্রে আলাদা মানদণ্ড গ্রহণ করা হল কেন, সেই প্রশ্ন ওঠে। পুরসভার তরফে যুক্তি দেওয়া হয়, অন্য কোথাও একই ধরনের ব্যবসা চলছে বলেই মামলাকারী সমান সুবিধা দাবি করতে পারেন না।
কিন্তু বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরী মামলার নথি খতিয়ে দেখে জানান, সংশ্লিষ্ট দোকানের জন্য রাজ্যের আবগারি দপ্তর নির্দিষ্ট বিধি মেনে স্থান পরিবর্তনের অনুমোদন দিয়েছিল। প্রস্তাবিত জায়গার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কেও রিপোর্ট নেওয়া হয়েছিল। তারপরেই অনুমোদন ও লাইসেন্স দেওয়া হয়। পুরসভাও আগে দু’বার ব্যবসা চালানোর জন্য সার্টিফিকেট দিয়েছিল।
মামলার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে আদালত। পরবর্তী শুনানিতে আক্কা অ্যাপার্টমেন্টের সম্পাদক মৃণাল কান্তি দে বাসিন্দাদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পেশ করেন। সেখানে তিনি জানান, বিদেশি মদের দোকান থেকে আবাসনের বাসিন্দাদের কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলার সমস্যা না ঘটিয়ে ব্যবসা চালানোর ক্ষেত্রে তাঁর আপত্তি নেই।
তা সত্ত্বেও পুরসভার সংশ্লিষ্ট আধিকারিক ব্যবসাটি আবাসিক ভবনে অবস্থিত বলে লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আবগারি দপ্তরের অনুমোদন এবং কলকাতা পুর আইন, ১৯৮০-এর সংশ্লিষ্ট ধারাগুলির প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
কলকাতা পুর আইন অনুযায়ী আবাসিক ভবনে ব্যবসা চালানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। ২০১৪ সালের সংশোধনের মাধ্যমে প্রধান রাস্তার ধারে আবাসিক ভবনে কিছু বাণিজ্যিক কার্যকলাপের সুযোগও রাখা হয়েছে। কিন্তু কোন রাস্তা ‘মেজর রোড’ বা প্রধান রাস্তা হিসেবে গণ্য হবে, তা নির্ধারণের জন্য প্রাসঙ্গিক শ্রেণিবিন্যাস ও রাস্তার বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করা জরুরি।
বিচারপতি জানান, আক্কা অ্যাপার্টমেন্টের সামনের রাস্তার শ্রেণি, প্রস্থ কিংবা যান চলাচলের পরিমাণ সম্পর্কে পুরসভার নির্দেশে কোনও স্পষ্ট আলোচনা নেই। কোন রাস্তার ক্ষেত্রে কী বিধিনিষেধ প্রযোজ্য, তারও নির্দিষ্ট নিয়ম বা ব্যাখ্যা আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়নি।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, কলকাতা পুর আইনের ৪৩৫এ ধারায় প্রধান রাস্তার ধারে আবাসিক ভবনে কিছু বাণিজ্যিক কার্যকলাপের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেই ধারাকে ব্যবহার করে বিদেশি মদের দোকানের অনুমতি বাতিলের যুক্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সংশ্লিষ্ট ব্যবসার জন্য আবগারি দফতরের অনুমোদনও রয়েছে।
বিচারপতির পর্যবেক্ষন, ‘খামখেয়ালি’ সিদ্ধান্তে সিলমোহর নয়। বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরী তাঁর রায়ে জানান, পুরসভা একই ধরনের একাধিক আবাসিক ভবনে মদের ব্যবসার অনুমতি দিয়েছে। অথচ এই মামলায় ভিন্ন মানদণ্ড গ্রহণের যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি দেখাতে পারেনি। আইনসম্মত অনুমোদনের বিরুদ্ধে বিধিবহির্ভূত নির্দেশিকা চাপিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
আদালতের মতে, সার্টিফিকেট বাতিলের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী শুনানির পর সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখার নির্দেশ, দুটিই স্বেচ্ছাচারী ও বিকৃত বিচারবিবেচনার পরিচয় বহন করে। তাই উভয় নির্দেশ খারিজ করে মামলাকারীর সার্টিফিকেট অফ এনলিস্টমেন্ট পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
আরও পড়ুন: ফেসবুক পোস্টেই ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত? হাওড়ার মামলা খারিজ চেয়ে আদালতে কুণাল
হাইকোর্টের রায়ে মীরা গোস্বামীর ব্যবসা ফের চালু করার পথ খুলল। সেই সঙ্গে আবাসিক ভবনে ব্যবসার অনুমতি দেওয়া এবং তা বাতিল করার ক্ষেত্রে কলকাতা পুরসভার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এল আদালতের মাধ্যমে।
Leave a Comment