বাঁধ-বিরোধী আন্দোলনে রণক্ষেত্র অরুণাচল: ধ্যরাতে পুড়ল NHPC অফিস ও থানা, ভাঙচুর রাজ্য বিজেপি সভাপতির বাড়িতেও

By Suman Debnath

October 24, 2026 8:00 PM

বাঁধ-বিরোধী আন্দোলনে রণক্ষেত্র অরুণাচল: ধ্যরাতে পুড়ল NHPC অফিস ও থানা, ভাঙচুর রাজ্য বিজেপি সভাপতির বাড়িতেও


বিতর্কিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে ফের অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল উত্তর-পূর্বের রাজ্য অরুণাচল প্রদেশ (Arunachal Pradesh)। প্রস্তাবিত ১১,২০০ মেগাওয়াটের ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট’-এর (Siang Upper Multipurpose Project বা SUMP) প্রতিবাদে ডাকা ১২ ঘণ্টার বন্‌ধ শেষ হতেই শুক্রবার গভীর রাতে রণক্ষেত্রের চেহারা নিল পূর্ব সিয়াং জেলার পাসিঘাট (Pasighat Violence)। উন্মত্ত জনতার রোষে ভস্মীভূত হয়ে গেল রাষ্ট্রায়ত্ত জলবিদ্যুৎ সংস্থা ‘এনএইচপিসি’ (NHPC Office)-র অফিস এবং একটি স্থানীয় থানা (Police Station Torched)। শুধু তা-ই নয়, আন্দোলনকারীদের হাত থেকে রেহাই পায়নি অরুণাচল প্রদেশ বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা প্রাক্তন বিধায়ক কালিং ময়ং (Kaling Moyong) এবং পাসিঘাট পশ্চিম কেন্দ্রের বিধায়ক নিনং এরিং (Ninong Ering)-এর বাসভবনও। পাথরবৃষ্টি ও সংঘর্ষে পাসিঘাটের ডেপুটি পুলিশ সুপার (DSP) টনি তাতাক-সহ একাধিক পুলিশকর্মী জখম হয়েছেন।

পাসিঘাটে তাণ্ডব

পুলিশ সূত্রে খবর, সিয়াং নদীর (Siang River) উপর প্রস্তাবিত মেগা বাঁধের বিরোধিতায় শুক্রবার সিয়াং, আপার সিয়াং এবং পূর্ব সিয়াং– এই তিন জেলায় ১২ ঘণ্টার বন্‌ধের ডাক দিয়েছিল চারটি স্থানীয় সংগঠন। সকাল থেকে দফায় দফায় উত্তেজনার পর বন্‌ধ শেষ হলেও, রাত বাড়তেই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। পাসিঘাটের ডিএসপি টনি তাতাক (Tony Tatak) জানিয়েছেন, শুক্রবার রাত ১১টা নাগাদ মেবো (Mebo) এলাকা থেকে আসা একদল উত্তেজিত জনতা পাসিঘাট শহরে ঢুকে তাণ্ডব শুরু করে।

পাসিঘাটের ‘হাই রিজিয়ন’ (High Region Area) এলাকায় অবস্থিত ন্যাশনাল হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশনের (NHPC) দপ্তরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুন লাগানো হয় সংলগ্ন একটি থানা এবং পুলিশের একাধিক গাড়িতেও। এর পরেই বিক্ষোভকারীরা চড়াও হয় রাজ্য বিজেপি সভাপতি কালিং ময়ং এবং বিধায়ক নিনং এরিংয়ের বাড়িতে। দুই নেতার বাড়িতেই ব্যাপক ভাঙচুর (Vandalism) চালানো হয়। এমনকি স্থানীয় ‘আদি’ জনজাতি সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ সংগঠন ‘আদি বানে কেবাং’ (Adi Bane Kebang)-এর সদর দপ্তরও তছনছ করে দেয় উন্মত্ত জনতা। পরিস্থিতি সামাল দিতে গেলে পুলিশকে লক্ষ্য করে শুরু হয় ব্যাপক পাথরবৃষ্টি (Stone Pelting), যাতে ডিএসপি টনি তাতাক নিজে এবং বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মী চোট পান।

আরও পড়ুন:  রাহুল-ডেরেকদের বাস মাঝপথে আটকাল দিল্লি পুলিশ, রাস্তায় শুয়ে বিক্ষোভ প্রিয়াঙ্কার

পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ

রাতের এই অগ্নিসংযোগের আগেই শুক্রবার দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল সিয়াং উপত্যকা। প্রশাসনের দাবি, শুক্রবার বন্‌ধ চলাকালীন সিয়াং জেলায় হাতে দা-কাটারি (Machetes), লাঠি এবং গুলতি (Slingshots) নিয়ে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন বিক্ষোভকারী পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে। পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হলে, জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল (Tear Gas Shells) ফাটায় পুলিশ। অন্য দিকে, পূর্ব সিয়াং জেলার মেবোর রানাঘাট সেতুর (Ranaghat Bridge) কাছেও পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় খণ্ডযুদ্ধ বাধে।

উল্লেখ্য, শুক্রবারের এই বন্‌ধের ডাক দিয়েছিল ‘আদি বানে কেবাং ইউনাইটেড’ (Adi Bane Kebang United), ‘সাম্প অ্যাফেক্টেড এরিয়া ইউথ অ্যাসোসিয়েশন’ (SUMP Affected Area Youth Association), ‘সিয়াং ইন্ডিজেনাস ফার্মার্স ফোরাম ইউথ উইং’ (Siang Indigenous Farmers’ Forum Youth Wing) এবং ‘আদি গালো ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ (Adi Galo Welfare Society)।

আন্দোলনকারীদের মূল দাবি

সিয়াং নদীর উপর এই বিশালাকার বাঁধ তৈরির প্রস্তাবে প্রথম থেকেই প্রবল আপত্তি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় মানুষ, বিশেষত আদি জনজাতির (Adi Community) প্রতিনিধিরা। তাঁদের আশঙ্কা, ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের এই প্রকল্প তৈরি হলে সিয়াং অববাহিকার বিস্তীর্ণ গ্রাম, চাষের জমি এবং বনাঞ্চল জলের তলায় চলে যাবে। ভিটেমাটি হারাবেন হাজার হাজার ভূমিপুত্র।

আরও পড়ুন:  নিট-কাণ্ডে উত্তাল দিল্লি, লোকসভায় বিতর্কে রাজি কেন্দ্র

বর্তমানে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলির মূল দাবি চারটি। বাঁধ-বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া ১০ জন সমাজকর্মীর (Arrested Activists) অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি। সরকারের নির্দেশের বিরোধিতা করায় যে ‘গাঁও বুড়া’ বা ঐতিহ্যবাহী গ্রামপ্রধানদের (Gaon Buras) সাসপেন্ড করা হয়েছে, তাঁদের সসম্মানে পদে পুনর্বহাল করা। প্রকল্পের প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বা ‘প্রি-ফিজিবিলিটি রিপোর্ট’ (Pre-Feasibility Report) তৈরির সমস্ত কাজ ও সমীক্ষা অবিলম্বে বন্ধ করা। সিয়াং উপত্যকায় মোতায়েন করা আধা-সামরিক এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী (Central Forces) অবিলম্বে প্রত্যাহার করা।

চিনের মেগা-বাঁধ বনাম স্থানীয় স্বার্থ

পাসিঘাটের এই হিংসার ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে অরুণাচল প্রদেশ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি (APCC)। একই সঙ্গে বন্‌ধ চলাকালীন বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছে তারা।

অন্য দিকে, পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠতেই অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডুর (Pema Khandu) সরকার একটি বিশেষ অ্যাডভাইজরি (Government Advisory) জারি করেছে। রাজ্য সরকারের তরফে সাধারণ মানুষকে গুজব ও ভুয়ো খবর (Fake News) থেকে সতর্ক থাকার আবেদন জানিয়ে বলা হয়েছে, সিয়াং প্রকল্পের কাজ এখনও শুধুমাত্র প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (PFR) এবং প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত মূল্যায়নের স্তরে রয়েছে। স্থানীয় মানুষের অধিকার, জমির নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অগ্রাধিকার দিয়েই যে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যুক্তি, এই প্রকল্পটি শুধুমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়, বরং ভারতের জাতীয় জল-নিরাপত্তার (National Water Security) জন্য অত্যন্ত কৌশলগত। তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র বা ইয়ারলুং সাংপো (Yarlung Tsangpo) নদীর উপর চিন যে সুবিশাল বাঁধ (China Mega Dam) তৈরি করছে, তার জেরে ভবিষ্যতে জলের প্রবাহ কমে যাওয়া বা কৃত্রিম বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। চিনের সেই কৌশল রুখতে এবং সিয়াং-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় (Siang-Brahmaputra Basin) জলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এই বাঁধ অপরিহার্য। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার সেই তত্ত্ব যে নিজেদের ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্ককে ছাপিয়ে স্থানীয় মানুষের মনে ভরসা জোগাতে পারেনি, পাসিঘাটের জ্বলন্ত ছবিই তা আরও একবার স্পষ্ট করে দিল।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment