উমা এল ঘরে: ত্রিপুরার রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ আধিকারিক, বাংলায় ‘কেতে ধুতি’-র প্রতিষ্ঠাতা আর চাঁদুলির ২৮৫ বছরের দুর্গাপুজো

By Suman Debnath

October 17, 2026 1:50 PM

উমা এল ঘরে: ত্রিপুরার রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ আধিকারিক, বাংলায় ‘কেতে ধুতি’-র প্রতিষ্ঠাতা আর চাঁদুলির ২৮৫ বছরের দুর্গাপুজো


পূর্ব বর্ধমানের চাঁদুলি গ্রামের মিত্রবাড়ির ২৮৫ বছরের দুর্গাপুজো (Durga Puja)  আজও বাংলার বস্ত্রশিল্পের ইতিহাস এবং এক ঐতিহাসিক অভিবাসনের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। ত্রিপুরার রাজ্য থেকে অস্থিরতার জন্য বাংলায় চলতে আসতে বাধ্য হয় এই পরিবার। এরপর তাঁর হাতেই গড়ে উঠেছিল বিস্তীর্ণ জমিদারি এবং খ্যাতনামা ‘কেতে ধুতি’-র ব্যবসা।

এই ঐতিহ্যের সূচনা হাটুবল্লভ মিত্রের হাত ধরে। তিনি ছিলেন ত্রিপুরার দেশীয় রাজ্যের প্রধান নায়েব। আনুমানিক ১৭৪০ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ত্রিপুরা ছেড়ে তিনি বর্ধমানে চলে আসেন। সেখানে জমিদারি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শুরু করেন ‘কেতে ধুতি’ তৈরির ব্যবসা। পরবর্তী সময়ে এই বিশেষ ধরনের ধুতি বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। হাটুবল্লভের বাণিজ্যিক সাফল্যের সূত্রেই তাঁর বংশধরেরা ইতিহাসে ‘কাপুড়ে মিত্তির’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।

নবাব আলিবর্দি খানের শাসনকাল এবং বাংলায় মারাঠা বা বর্গী আক্রমণের উত্তাল সময়ে হাটুবল্লভের ব্যবসা বিস্তার লাভ করেছিল। চাঁদুলিতে বসতি স্থাপনের সময় তিনি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন বিপুল সম্পদ, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং ত্রিপুরার রাজপরিবারের নানা আচার-রীতি। পরিবারের জমিদারির কাছারিতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত দুর্গাপুজোয় সেই সাংস্কৃতিক প্রভাবের ছাপ পড়েছিল।

প্রায় তিন শতাব্দী ধরে মিত্রবাড়ির ঠাকুরদালান বহু ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী থেকেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল, নানা অস্থিরতা এবং জমিদারি প্রথার অবলুপ্তি—সব কিছুর মধ্যেও এই পুজো টিকে রয়েছে।

পরিবারের সদস্য স্বপনকুমার মিত্র ‘দ্য স্টেটসম্যান’-কে জানিয়েছেন, চাঁদুলির মিত্রবাড়ির পুজোকে অন্য বনেদি বাড়ির পুজো থেকে আলাদা করেছে বাংলার তাঁতশিল্পের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক।

হাটুবল্লভের ‘কেতে ধুতি’ ব্যবসা থেকে অর্জিত সমৃদ্ধিই এই জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপুজো চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। স্থানীয় তাঁতিদের সংগঠিত করে তিনি আট হাত লম্বা বিশেষ ধরনের সুতির ধুতি তৈরি করাতেন। তাঁতযন্ত্রের খটখট শব্দ ক্রমে এলাকার অর্থনৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল।

পুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব ছিল না, স্থানীয় অর্থনীতিরও অন্যতম ভিত্তি ছিল। স্বপনকুমার মিত্রের কথায়, ‘হাটুবল্লভের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় তাঁতি, কারিগর ও কৃষকেরা শরৎকালে পুজোর সময় কাছারিতে সমবেত হতেন। তাঁরা দেবীকে তাঁদের সেরা বস্ত্র নিবেদন করতেন এবং জমিদারের আশীর্বাদ গ্রহণ করতেন।‘

আরও পড়ুন:  ছ’দশকের বসতি, আচমকাই জল বন্ধ! উচ্ছেদের আতঙ্কে জ্যোতিনগর, মানবিক হস্তক্ষেপ বিচারপতির

আরও পড়ুন: উমা এল ঘরে: ৩০৯ বছরের বনেদিয়ানা, পুজোর রাশ ‘নারীশক্তি’র হাতে

বর্গী আক্রমণের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে মিত্রবাড়ির পুজো

মিত্রবাড়ির দুর্গাপুজোর (Durga Puja) সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলায় মারাঠা আক্রমণের উত্তাল সময়ের একটি ঐতিহাসিক কাহিনি। স্থানীয় ইতিহাস ও পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসারে, মহাষ্টমীর রাতে মারাঠা শিবিরে আচমকা আক্রমণ চালিয়েছিলেন নবাব আলিবর্দি খান ও তাঁর বাহিনী। সেই আক্রমণের জেরে মারাঠা সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

মীর হাবিবের কৌশলগত পরামর্শে মারাঠা বাহিনী কাটোয়ায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছিল। এর আগে হুগলি ও তার গুরুত্বপূর্ণ বন্দরও তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। এই সামরিক সাফল্যের পর মারাঠা সেনাপতি শেষারাওয়ের অধীন ভাস্কর পণ্ডিতের উদ্যোগে সেপ্টেম্বর মাসে একটি জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। অভিযানে লুট করে পাওয়া সম্পদ থেকেই সেই পুজোর খরচ জোগানো হয়েছিল বলে প্রচলিত কাহিনি।

কিন্তু ২৭ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতের পর, মহানবমীর ভোরে, সেই উৎসবের আকস্মিক পরিসমাপ্তি ঘটে। পুজোর আনন্দে মারাঠা সেনারা ব্যস্ত থাকার সুযোগ নিয়ে আলিবর্দি খানের বাহিনী কাটোয়ার কাছে ব্রাহ্মণী নদীর তীরে দৈনহাটে তাদের শিবিরে অতর্কিতে হামলা চালায়। আচমকা আক্রমণে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগ পায়নি মারাঠা বাহিনী। শেষ পর্যন্ত তাদের পিছু হটতে হয়।

যুদ্ধজয়ের পর নবাব আলিবর্দি খান পরিত্যক্ত মারাঠা শিবির পরিদর্শনে যান। পালিয়ে যাওয়া সেনাদের ফেলে যাওয়া সামগ্রীর মধ্যে তিনি একটি বিশেষ ধরনের দ্বিভুজা দুর্গা ভবানীর মূর্তি দেখতে পান। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, মারাঠা সেনারা এবং ওই মূর্তির ভাস্কর—দু’জনেই সেটি ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলেন।

এর পর সৌজন্যের নিদর্শন হিসেবে আলিবর্দি খান সেই মূর্তিটি হাটুবল্লভ মিত্রের হাতে তুলে দেন। দৈনহাট অঞ্চলের বিশিষ্ট জমিদার ও বস্ত্র ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন হাটুবল্লভ।

আরও পড়ুন:  Shyamakatha: হাজার হাতের কালী, এখানে দেবীকে শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষে দেওয়া হয় তামিল ভোগ

সেই উদ্ধার করা দেবীমূর্তিই পরবর্তী সময়ে মিত্র পরিবারের ধর্মীয় ঐতিহ্যের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এর মধ্য দিয়ে পরিবারের ইতিহাস জড়িয়ে যায় অষ্টাদশ শতকের বাংলার সামরিক সংঘাত ও রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে।

আরও পড়ুন: উমা এল ঘরে: ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় দেবী দুর্গার বোধন, দেবীকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার আয়োজন

পরিবারের বিভাজনেও থামেনি পুজো

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মিত্র পরিবারে দুর্গাপুজো (Durga Puja)  হয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে জমিদারি সম্পত্তির কাঠামো বদলেছে, পরিবারের মধ্যেও বিভাজন ঘটেছে। ঐতিহাসিক বিবরণ ও স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, পরিবারের দুই শাখার পৃথক হয়ে যাওয়ার পর পুজোও দুটি ধারায় বিভক্ত হয়।

পরিবারের বড় শাখার পুজো স্থানীয় ভাবে ‘বাবুদের পুজো’ নামে পরিচিত। অন্য দিকে, ছোট শাখায় প্রচলিত রয়েছে ‘মিত্তির বাড়ির পুজো’। পারিবারিক বিভাজন সত্ত্বেও দুই শাখাই নিজেদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

ত্রিপুরার রাজদেবতার রীতিতে প্রতিমা, কার্তিকের পায়ে ইমলামী নাগাড়া

মিত্র পরিবারের দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য দেবীমূর্তির গঠন ও তার সঙ্গে যুক্ত বিশেষ প্রতীকগ। উদ্ধার করা মূল মূর্তির কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখেই পরিবারের সদস্যেরা প্রতিমার অন্যান্য অংশে কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য যুক্ত করেছেন।

ত্রিপুরার রাজপরিবারের দেবদেবীর প্রচলিত রীতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রতিমায় গণেশকে লাল, কার্তিক ও লক্ষ্মীকে হলুদ এবং সরস্বতীকে সাদা রঙে সাজানো হয়। সিংহের পরিবর্তে রয়েছে ঘোড়ার পিঠে আরোহী এক সিংহমূর্তি এবং মহিষাসুরের গায়ের রং সবুজ।

এ ছাড়াও নবাব আলিবর্দি খানের প্রতি এক ব্যতিক্রমী শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে কার্তিকের পায়ের কাছে গড়ে তোলা হয়েছে একটি ইসলামী নাগাড়া বা ঢাকজাতীয় বাদ্যযন্ত্রের মূর্তি।

প্রতিমা বিশেষ বৈশিষ্ট্য যুক্ত হলেও দেবী দুর্গার মূল দ্বিভুজা রূপটি আজও অপরিবর্তিত রয়েছে। ত্রিপুরার রাজপরিবারের ঐতিহ্য, বাংলার বস্ত্রশিল্পের সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং অষ্টাদশ শতকের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ—সব মিলিয়ে চাঁদুলির মিত্রবাড়ির ২৮৫ বছরের দুর্গাপুজো আজও বহন করে চলেছে এক স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার।

দেখুন:

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment