বরফের অতলে মহাজাগতিক দূতের সন্ধান: পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেলেন আইসকিউবের স্বপ্নদ্রষ্টা ফ্রান্সিস হ্যালজেন

By Suman Debnath

October 6, 2026 4:35 PM

বরফের অতলে মহাজাগতিক দূতের সন্ধান: পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেলেন আইসকিউবের স্বপ্নদ্রষ্টা ফ্রান্সিস হ্যালজেন


অ্যান্টার্কটিকার জমাট বরফের প্রায় আড়াই কিলোমিটার গভীরে পাতা রয়েছে এক আশ্চর্য ফাঁদ। সেখানে দিনরাত নজরদারি চালায় হাজার হাজার অপটিক্যাল সেন্সর। লক্ষ্য একটাই, আলোর গতিতে ছুটে চলা ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে রহস্যময় ‘ভুতুড়ে কণা’ বা নিউট্রিনোকে (neutrino) বন্দি করা। সেই অসম্ভব গবেষণাকে বাস্তব রূপ দিয়ে ২০২৬ সালের পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার (Nobel Prize in Physics) ছিনিয়ে নিলেন মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ফ্রান্সিস হ্যালজেন (Francis Halzen)। রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের তরফে জানানো হয়েছে, দক্ষিণ মেরুতে ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’ (IceCube Neutrino Observatory) প্রতিষ্ঠা এবং মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো (high-energy neutrinos of astrophysical origin) আবিষ্কারের স্বীকৃতি হিসেবেই উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Wisconsin–Madison) এই গবেষককে ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হল।

মহাকাশের গভীরে ঠিক কী ঘটছে, আলো বা এক্স-রশ্মি যেখানে পৌঁছতে পারে না, সেখান থেকে কী বার্তা আসছে, তা এত দিন জানার কোনও উপায় ছিল না। আদতে বেলজিয়ান বিজ্ঞানী হ্যালজেনের হাত ধরে সেই অচেনা মহাবিশ্বকে দেখার এক সম্পূর্ণ নতুন চোখ পেল আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান।

মহাবিশ্বের ‘ভুতুড়ে কণা’ নিউট্রিনো আসলে কী?

 বিজ্ঞানীরা বহু দিন ধরেই নিউট্রিনোকে চেনেন ভুতুড়ে কণা (ghost particle) হিসেবে। এর কারণ অতি সহজ। এই কণার কোনও তড়িৎ আধান (electric charge) নেই এবং এর ভরও প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। ফলে কোনও কিছুর সঙ্গেই এই কণা প্রায় বিক্রিয়া বা ঘাত-প্রতিঘাত ঘটায় না।

আমরা যখন কোনও লেখা পড়ছি বা শ্বাস নিচ্ছি, ঠিক সেই মুহূর্তেই কোটি কোটি নিউট্রিনো আমাদের শরীর, ঘরবাড়ি এমনকি গোটা পৃথিবী ভেদ করে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অনায়াসে বেরিয়ে চলে যাচ্ছে। সাধারণ আলো (photons) মহাজাগতিক ধূলিকণা বা গ্যাসীয় মেঘে ধাক্কা খেয়ে আটকে যায়। চার্জযুক্ত মহাজাগতিক রশ্মিও (cosmic rays) মহাশূন্যের তীব্র চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে দিক পরিবর্তন করে। কিন্তু নিউট্রিনো কোনও কিছুতেই বাধা পায় না। মহাবিশ্বের সবচেয়ে হিংস্র ও উত্তাল প্রান্ত থেকে কোটি কোটি আলোকবর্ষ পথ পাড়ি দিয়ে সে সরাসরি সটান চলে আসে পৃথিবীতে। ফলে এর পথ ধরে পিছন দিকে এগোলেই সরাসরি পৌঁছে যাওয়া সম্ভব তার উৎসস্থলে।

আরও পড়ুন:  ৯/১১-র ২৫ বছর পর প্রকাশ্যে লাদেন-পুত্র হামজার ভিডিও

বরফের অতলে কীভাবে কাজ করে ‘আইসকিউব’?

কিন্তু যে কণা কোনও কিছুর সঙ্গেই ধাক্কা খায় না, তাকে শনাক্ত করা যাবে কী ভাবে? এই অসম্ভবকে সম্ভব করতেই বিজ্ঞানীদের দল বেছে নিয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম প্রান্ত অ্যান্টার্কটিকাকে। দক্ষিণ মেরুর বরফ চরম স্বচ্ছ, আর সেখানে মাটির তলায় কোনও ধুলো বা দূষণ নেই।

অধ্যাপক ফ্রান্সিস হ্যালজেনের নেতৃত্বে অ্যান্টার্কটিকার অ্যামুন্ডসেন-স্কট স্টেশনের বরফের চাদরে প্রায় আড়াই কিলোমিটার গভীর ৮৬টি সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়। বরফের এক ঘনকিলোমিটার (one cubic kilometer) আয়তন জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ৫,১৬০টিরও বেশি ডিজিটাল অপটিক্যাল মডিউল (DOMs)। যখন কোটি কোটিতে একটিমাত্র অতি উচ্চ-শক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনো বরফের পরমাণুর সঙ্গে হঠাৎ ধাক্কা খায়, তখন তৈরি হয় মিউঅন কণা। বরফের মধ্যে আলোর চেয়েও বেশি গতিতে ছুটে চলার সময়ে সেই কণা থেকে বিচ্ছুরিত হয় এক মৃদু নীলচে আভা, বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলে চেরেনকভ বিকিরণ (Cherenkov radiation)। আইসকিউবের সেন্সরগুলি ন্যানোসেকেন্ডের ভগ্নাংশের হিসাবে সেই আলোর পথ মেপে অঙ্ক কষে বলে দেয়, সুদূর মহাকাশের ঠিক কোন কোণ থেকে ধেয়ে এসেছিল ওই নির্দিষ্ট কণাটি।

কেন এই আবিষ্কার যুগান্তকারী?

আরও পড়ুন:  পশ্চিম এশিয়ায় শান্তির বার্তা মোদীর, পেজেশকিয়ানের সঙ্গে প্রথম সরাসরি বৈঠক 

২০১৩ সালে এই আইসকিউব টেলিস্কোপেই প্রথম বারের মতো ধরা পড়েছিল সৌরজগতের বাইরের সুদূর গ্যালাক্সি থেকে আসা অতি উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো। তার পর থেকে একের পর এক মহাজাগতিক বিস্ময়ের দিশা মিলেছে। কৃষ্ণগহ্বর (supermassive black hole), সক্রিয় গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াস (active galactic nuclei) কিংবা সুদূর ব্লেজারের (blazar) ভেতরের ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের নিখুঁত খবর পৃথিবীতে বয়ে এনেছে এই কণাগুলি।

বিজ্ঞানীদের মতে, গ্যালিলিও যখন প্রথম দূরবীন দিয়ে আকাশে তাকিয়েছিলেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানের যে রূপান্তর ঘটেছিল, আইসকিউব সেই মাপেরই এক বিপ্লব এনে দিয়েছে। এটি কেবল কণা-পদার্থবিদ্যার (particle physics) সাফল্য নয়, এর হাত ধরে জন্ম নিয়েছে মাল্টি-মেসেঞ্জার অ্যাস্ট্রোনমির (multi-messenger astronomy) এক নতুন যুগ। অর্থাৎ মহাকাশকে কেবল আলোর চোখে দেখা নয়, কণার গতিপ্রকৃতি মেপে বিশ্লেষণ করার পথ খুলে গেল।

এক অসম্ভব স্বপ্নের উড়ান

 আশির দশকের শেষ ভাগে যখন ফ্রান্সিস হ্যালজেন প্রথম প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে অ্যান্টার্কটিকার বরফের তলায় টেলিস্কোপ বানাতে হবে, অনেকেই তখন একে পাগলামি বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাত্ত্বিক পদার্থবিদ হ্যালজেন নিজের গণনায় অবিচল ছিলেন। বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ দলগত প্রচেষ্টা ও বিভিন্ন দেশের সহযোগিতায় তিলে তিলে গড়ে ওঠে এই বিশালাকার ভূগর্ভস্থ মানমন্দির।

নোবেল কমিটির মতে, এক সময় যাকে অবাস্তব কল্পনা বলে মনে করা হত, হ্যালজেনের মেধা ও দূরদর্শিতা সেই ভাবনাকেই আধুনিক পদার্থবিদ্যার অন্যতম সফল হাতিয়ারে পরিণত করেছে। বরফের বুক চিরে মহাবিশ্বের জন্মবৃত্তান্ত খোঁজার সেই দীর্ঘ লড়াইকেই কুর্নিশ জানাল ২০২৬ সালের নোবেল মঞ্চ।

Suman Debnath

Journalist

Related Stories

সপ্তম বেতন কমিশনের আওতায় আরও কর্মীরা! রাজ্যের সাহায্যপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা পর্ষদের কর্মীদের বেতন পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত

সপ্তম বেতন কমিশনের আওতায় আরও কর্মীরা! রাজ্যের সাহায্যপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা পর্ষদের কর্মীদের বেতন পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত

ফিনল্যান্ডে ১৩০০ কোটি ইউরোর প্রজেক্ট ঘিরে প্রবল বিতর্ক, জঙ্গল কেটে গুগলের ডেটা সেন্টার গড়ার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিক্ষোভ

ফিনল্যান্ডে ১৩০০ কোটি ইউরোর প্রজেক্ট ঘিরে প্রবল বিতর্ক, জঙ্গল কেটে গুগলের ডেটা সেন্টার গড়ার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিক্ষোভ

গাড়ির তেল বানাতে চলে যাচ্ছে বাচ্চা-মুরগির খাবার! কালীপুজো কাটতেই ডিম ও চিকেনের দাম ৩০% বাড়ার আশঙ্কা

গাড়ির তেল বানাতে চলে যাচ্ছে বাচ্চা-মুরগির খাবার! কালীপুজো কাটতেই ডিম ও চিকেনের দাম ৩০% বাড়ার আশঙ্কা

কালীপুজোয় সকাল থেকে মেট্রো, কখন শেষ ট্রেন? রাতেও মিলবে বাড়তি পরিষেবা

কালীপুজোয় সকাল থেকে মেট্রো, কখন শেষ ট্রেন? রাতেও মিলবে বাড়তি পরিষেবা

কালীপুজোর আগেই সুখবর! কলকাতা পুলিশে ৩০৯ জনের নিয়োগ, নিয়োগপত্র দেবেন মুখ্যমন্ত্রী

কালীপুজোর আগেই সুখবর! কলকাতা পুলিশে ৩০৯ জনের নিয়োগ, নিয়োগপত্র দেবেন মুখ্যমন্ত্রী

২০ শতাংশের বদলে পেট্রলে মিলল ৩১ শতাংশ ইথানল: দেদার মুনাফা লোটার প্রমাণ হাতে আসতেই কেন্দ্রের জবাব তলব

২০ শতাংশের বদলে পেট্রলে মিলল ৩১ শতাংশ ইথানল: দেদার মুনাফা লোটার প্রমাণ হাতে আসতেই কেন্দ্রের জবাব তলব

No comments to show.

Leave a Comment