পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংক্রান্ত মামলায় ফের সুপ্রিম কোর্টে বিতর্কের কেন্দ্রে নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India)। Special Intensive Revision বা SIR প্রক্রিয়া শেষ হয়েছিল প্রচুর বিতর্কের রসদ রেখে। ভোট মিটে গিয়ে সরকার পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে, সামনেই দুই কেন্দ্রে উপনির্বাচন। অথচ যাঁরা ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন, তাঁদের প্রায় সবারই আপিল এখনও সম্পূর্ণ অমীমাংসিত। সর্বোচ্চ আদালতে কমিশন জানিয়েছে, রাজ্যের অ্যাপিলেট ট্রাইবুন্যালগুলিতে এখনও ঝুলে রয়েছে প্রায় ৩৭ লক্ষ ১৮ হাজার আবেদন। যা সমস্যা সমাধানের গোটা প্রক্রিয়ার গতি নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
শুরুটা হয়েছিল কেন
নির্বাচন কমিশনের এই নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়া বা Special Intensive Revision প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৭.৬ কোটি ভোটারের নথি নতুন করে যাচাই করা হয়। বিধানসভা ভোটের আগে এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৬০ লক্ষ দাবি-আপত্তি খতিয়ে দেখতে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড মিলিয়ে প্রায় ৭০০ জন বিচার বিভাগীয় আধিকারিক নিয়োগ করা হয়েছিল। শেষমেশ প্রাথমিক অ্যাডজুডিকেশনের (Adjudication) পরে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েন প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষ।
যাঁরা বাদ পড়েছিলেন বা যাঁদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আপত্তি উঠেছিল, তাঁদের জন্য আপিলের পথ খোলা রাখতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত হয় ১৯টি অ্যাপিলেট ট্রাইবুন্যাল (Appellate Tribunal)। কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ও প্রবীণ বিচারকদের এই ট্রাইব্যুনালের মাথায় বসানো হয়, যাতে ভোট শুরুর আগেই বেশিরভাগ আপিলের নিষ্পত্তি হয়ে যায়।
সংখ্যাটা কতটা উদ্বেগজনক
কিন্তু বাস্তব ছবিটা অনেকটাই আলাদা। কংগ্রেস সাংসদ ইশা খান চৌধুরীর একটি RTI আবেদনের জবাবে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর জানিয়েছিল, মোট ৩৮ লক্ষ ১০ হাজার ৬২০টি আপিলের মধ্যে মাত্র ৮২ হাজার ৭৮২টির নিষ্পত্তি হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৯৮ শতাংশ আপিলই তখনও পড়ে ছিল। সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এখনও প্রায় ৩৭.১৮ লক্ষ আপিল ফয়সালার অপেক্ষায়।
এখানে একটি তথ্য বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। মোট আপিলের প্রায় ৮০ শতাংশই এসেছে তাঁদের বিরুদ্ধে, যাঁরা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এই আপত্তি তুলেছে কমিশন নিজে অথবা অন্য বিবাদীরা। বাদ পড়া মানুষদের মধ্যে যাঁরা ফেরার জন্য সত্যিই আপিল করেছেন, তাঁদের সংখ্যা মাত্র ৭ লক্ষ। আর যাঁদের আপিল ইতিমধ্যে মঞ্জুর হয়েছে, তাঁদের প্রায় ৯১ শতাংশের ক্ষেত্রেই রায় গিয়েছে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে। অর্থাৎ ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত যাঁরা পৌঁছেছেন, তাঁদের অধিকাংশই ন্যায্য দাবিদার বলেই প্রমাণিত হয়েছেন। সমস্যাটা গতিতে, সিদ্ধান্তে নয়।
সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্নবাণ
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও ভি মোহনার বেঞ্চ একাধিকবার এই মামলার শুনানিতে কমিশনের ঢিলেমি নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই প্রক্রিয়া ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটের আগেই শেষ করতে হবে। কলকাতা হাইকোর্ট নিজেই আদালতকে জানিয়েছিল, বর্তমান গতিতে চললে এই বিপুল আপিলের স্তূপ সাফ হতে সময় লাগতে পারে প্রায় ২১ বছর।
আদালত কমিশনের কাছে জানতে চেয়েছে কতগুলি আপিল বাদ পড়ার বিরুদ্ধে, কতগুলি অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে, এবং ট্রাইব্যুনালের কাজের গতি বাড়াতে ঠিক কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে শুনানির আর্জি নিয়ে যাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালকে আউট অফ টার্ন শুনানির সময় দেওয়ার নির্দেশও একাধিকবার দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
নতুন উদ্বেগ
এই বিলম্ব নিয়ে সবচেয়ে জোরালো সতর্কবার্তা এসেছে অর্থনীতিবিদ ও সমাজকর্মী প্রসেনজিৎ বসুর কাছ থেকে। ডিসেম্বরে প্রস্তাবিত পুরভোটের আগে এই বিপুল সংখ্যক আপিল অমীমাংসিত থাকলে বড় আকারে গণ-বঞ্চনার (mass disenfranchisement) আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে তিনি সুপ্রিম কোর্টে সরাসরি সতর্ক করেছেন। কালীঘাট তৃণমূল কংগ্রেসও একাধিকবার আদালতে দাবি করেছে, বিধানসভা ভোটে একাধিক কেন্দ্রে জয়ী প্রার্থীর ব্যবধানের চেয়ে বেশি ভোটার বাদ পড়েছিলেন তালিকা থেকে।
আপাতত সুপ্রিম কোর্ট কমিশনের কাছ থেকে বিস্তারিত জেলাওয়াড়ি তথ্য চেয়েছে। ট্রাইবুন্যালের পরিকাঠামো বাড়ানো এবং প্রক্রিয়া দ্রুততর করার নির্দেশও এসেছে বারবার। কিন্তু বাস্তব ছবি বলছে, লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার এখনও ফাইলের স্তূপের নীচেই চাপা পড়ে রয়েছে।
Leave a Comment