মানুষ গোটা বিশ্বের সামনে নিজের যে পরিচয় তুলে ধরে, তার আড়ালে কী লুকিয়ে থাকে জানেন? সেই পরিচয়ের আড়ালে থাকে মানুষের আবেগ, দ্বন্দ্ব, স্মৃতি ও অবচেতন মন। এই অদৃশ্য জগতই শিল্পী সাধনা গুপ্ত তাঁর আঁকা ছবিতে ফুটিয়ে তোলেন। একসময় তিনি মনোবিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি একজন স্বশিক্ষিত বিমূর্ত শিল্পী (Self-taught Abstract Artist)। তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে বারবার উঠে আসে মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব, আধ্যাত্মিকতা, স্বাধীনতা এবং জীবনের নানান অনিশ্চয়তার গল্প। তাঁর আঁকা ছবি দেখে মানুষ নিজের অনুভূতগুলি নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারে। সম্প্রতি নেহা পুরভকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাধনা তাঁর ছবির মাধ্যমে মানুষের মনের অনুভূতিগুলিকে ফুটিয়ে তোলার কথা বলেছেন।
প্রশ্ন: নন-রিপ্রেজেন্টেশনাল অ্যাবস্ট্রাকশনের পথে আপনার যাত্রা কীভাবে শুরু হয়েছিল?
উত্তর: মনোবিজ্ঞান থেকে নন-রিপ্রেজেন্টেশনাল অ্যাবস্ট্রাক্ট (Non-representational Abstraction) শিল্পের দুনিয়ায় আমার যাত্রা হঠাৎ করে হয়নি। বরং মানুষের মনকে বোঝার যে কৌতূহল আমাকে মনোবিজ্ঞানের দিকে নিয়ে গিয়েছিল, সেই অনুসন্ধানই শিল্পের জগতে নিয়ে এসেছে। মনোবিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করার সময় আমি মানুষের বলা কথার পাশাপাশি না বলা কথাগুলিও বোঝার চেষ্টা করতাম। আমি খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে পেরেছিলাম মানুষ বাইরে থেকে নিজেকে যেভাবে দেখায়, তার সঙ্গে ভিতরের জগতের অনেক পার্থক্য রয়েছে।
আমাদের মনের ভিতরে অনেক অশান্তি, অনুভূতি, চিন্তা ও জটিলতা থাকে। সেই অনুভূতি যখন শব্দ বা গল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করা কঠিন হয়ে ওঠে, তখন শিল্প হয়ে ওঠে সেই অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম। আমি নিজে থেকে শিল্প শিখেছি। তাই প্রচলিত নিয়ম মেনে চলার বাধ্যবাধকতা আমরা ছিল না। আমি মনে করি, মানুষের অন্তর্জগতকে সবসময় বাস্তব কোনও আকার বা অবয়ব দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আবেগ, শক্তি এবং না বলা সত্য।
প্রশ্ন: আপনি কেন আপনার শিল্পকে মনোজগতের অনুসন্ধান বলে মনে করেন?
উত্তর: আমার কাছে এই শিল্প অনেকটা মাটির নীচে কিছু খুঁজে বের করার মতো। মানুষ বাইরের পৃথিবীতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য নানা ধরনের পরিচয় বা মুখোশ ব্যবহার করে। কিন্তু সেই মুখোশের আড়ালে থাকে অনেক গভীর ও জটিল গল্প। আমি যখন ছবি আঁকি, তখন সেই লুকিয়ে থাকা চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছাগুলিকে সামনে আনার চেষ্টা করি। কখনও সেই গল্পগুলো খুব পরিষ্কার বা গোছানো থাকে, আবার কখনও সেখানে থাকে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা। আর তখনই বিষয়টি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন: আপনার কাজকে দর্শকরা কীভাবে দেখুক আপনি কী চান?
উত্তর: দর্শকরা আমার শিল্প দেখুক নিজেদের প্রতিফলন দিয়ে। আমি আমার ছবির মাধ্যমে কোনও নির্দিষ্ট উত্তর দিতে চাই না। বরং আমি চাই, ছবিটি যেন দর্শকদের জন্য একটি আয়নার মতো কাজ করে। আমার কাজ যেহেতু বিমূর্ত, তাই সেটিকে বোঝার কোনও সঠিক পদ্ধতি নেই। দর্শক যখন ছবির রেখা, দাগ, রং এবং বিভিন্ন আকৃতির দিকে তাকান, তখন তাঁরা নিজেদের মন, অনুভূতির সম্মুখীন হন। ছবির মধ্যে দিয়ে তাঁরা নিজের মতো করে কোনও অর্থ খুঁজে নেন। আর সেই অর্থ খুঁজতে গিয়েই তাঁরা নিজেদের অবচেতন মনের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে পারেন।
প্রশ্ন: এই সিরিজের ছবিগুলিতে কী কী বিষয় তুলে ধরা হয়েছে?
উত্তর: এখানে আমি কিছু গল্প বা ভাবনাকে বিমূর্ত শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। ছবিগুলিকে বাইরে থেকে দেখলে যেটা মনে হবে, আসলে তা কিন্তু নয়। এখানে মানুষের মনের ভিতরে যা ঘটে সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে এক একজন মানুষের কাছে ছবির অর্থ বিভিন্ন হবে। আজ প্রযুক্তি অনেক উন্নত। আমরা যা চোখে দেখি, তার থেকেও সুন্দর ছবি ক্যামেরায় তুলতে পারি। তাহলে শিল্পী হিসেবে শুধু সেই দৃশ্যকে হুবহু আঁকার প্রয়োজন কী? আমার কাছে শিল্পের গুরুত্ব অনেক বেশি। আমরা পৃথিবীকে কীভাবে দেখি তার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক তৈরী করি এবং সেই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে কী অনুভূতি তৈরী করে, আমি সেটাই আমার ছবিতে ফুটিয়ে তুলতে চাই।
উদাহরণ হিসেবে বলি, যেমন একটি ছবিতে মুখোপ পরা একজন পুরুষ ও কয়েকটি পথকুকুর রয়েছে। কুকুরগুলি বাইরের পৃথিবীর প্রতীক। অর্থাৎ মানুষটি সম্পর্কে সমাজ কী ভাবে, কী বলে তা কুকুরগুলির মাধ্যমে এখানে প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু ওই পুরুষের নিজের ভাবনা রয়েছে, যা সে অন্যদের দেখাতে চায় না। ছবিতে মুখোশ পরা একজন নারীও রয়েছেন।
আরেকটি ছবিতে একটি বন বা জঙ্গলের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মানুষ যখন খুব বেশি মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকে, তখন অনেক সময় সে নিজের ভিতরে ফিরে যেতে চায় এবং প্রকৃতি ও সবুজের মধ্যে শান্তি খোঁজার চেষ্টা করে। এই ছবিতে তিনটি চরিত্র রয়েছে। একজন কিছু খুঁজতে গিয়ে নিজেই হারিয়ে গিয়েছে। আরেকজন পৃথিবীর সৌন্দর্য্য উপলব্ধিই করতে চায় না। অন্যদিকে, তৃতীয় ব্যক্তি বনের মধ্যে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে সত্যিই হারিয়ে গিয়েছে। প্রতিটি ছবির নিজস্ব গল্প, অনুভূতি ও একটি আলাদা অর্থ রয়েছে।
যখন আমাদের মনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়, তখন ছবির ছোট ছোট অংশগুলি সেই মানসিক দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে। মনের মধ্যে যখন কোনও বিষয় নিয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকে না, তখন যে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়, সেটাই ছবিতে ফুটে ওঠে। ধীরে ধীরে সেখান থেকে একটি অর্থ তৈরি হয়। তবে আমি মনে করি, দর্শক নিজের মতো করে ছবির অর্থ খুঁজে নেবেন। একটি ছবিতে যদি সবকিছু খুব স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে দর্শকের ভাবার বা ছবি দেখে অর্থ খোঁজার সুযোগ থাকে না। আমার কাছে সেটা প্রকৃত শিল্প নয়। শিল্প খুব ব্যক্তিগত বিষয়। একজন মানুষ একটি ছবি থেকে যা অনুভব করবেন, অন্য একজন হয়তো তা অনুভব করবেন না।
আমার কিছু ছবিতে আধ্যাত্মিক নারী, শক্তি এবং বিভিন্ন দেবীর রূপ দেখা যায়। অন্য কিছু ছবিতে রয়েছে গোলকধাঁধা। এর থেকে বোঝা যায়, মানুষ কীভাবে জীবনের স্রোতে হারিয়ে যায়। কখনও সে নিজে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে, তো কখনও আবার আরও গভীরে ঢুকে যায়।
প্রশ্ন: দিল্লি, তুলুজ এবং কেমব্রিজে আপনার শিল্প প্রদর্শিত হয়েছে। দর্শকদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
উত্তর: শিল্প একটি সর্বজনীন ভাষা। বিশেষ করে বিমূর্ত শিল্প। দিল্লি, ফ্রান্স ও আমেরিকা যেখানেই কেউ আমার ছবি দেখুক না কেন, মানুষের মনের কিছু অনুভূতি সবার মধ্যেই একই রকম থাকে। সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ আমার নিজের চিন্তা ও অনুভূতি থেকে তৈরি ছবির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হচ্ছেন। এটা আমার কাছে খুব আনন্দের এবং অনুপ্রেরণার। এটা প্রমাণ করে মানুষের ভিতরের জগতের অনুভূতিগুলি আসলে সবার মধ্যেই কোনও না কোনওভাবে একই রকম।
প্রশ্ন: অনেকই প্রথমবার আপনার শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হন, তাঁদেরকে আপনার শিল্প দেখে কী নিয়ে যাওয়ার কথা বলবেন?
উত্তর: আমি চাই, তাঁরা নিজেদের অনুভূতিগুলিকে গ্রহণ করার এবং প্রশ্ন করার যেন সুযোগ দেন। আমরা এমন একটি পৃথিবীতে বাস করি, যেখানে সবকিছুকে পরিষ্কার ও নির্দিষ্টভাবে ব্যাখা করার চাপ রয়েছে। আমার শিল্পের মাধ্যমে আমি দর্শকদের সেই অগোছালো ও জটিল অনুভূতিগুলিকে গ্রহণ করতে চাই। আমি চাই, তাঁরা নিজেদের বাইরের পরিচয়ের আড়ালে থাকা মানুষটিকে দেখার চেষ্টা করুক। নিজেদের ভিতরের সুন্দর, জটিল ও নানা অনুভূতিতে ভরা জগতের মধ্যে মানুষ যাতে শান্তি খুঁজে পায়।
Leave a Comment