কমনওয়েলথ গেমসের নবম দিনে সোনা জিতে নিলেন ভারতীয় মহিলা জুডোকা অস্মিতা দে। এই প্রথম কমনওয়েলথ গেমসে জুডো থেকে সোনা জিতল ভারত। সে দিক থেকে দেখতে গেলে ভারতীয় জুডোর ইতিহাসে শুক্রবার ছিল এক ঐতিহাসিক দিন। এ দিন মহিলাদের ৪৮ কেজি বিভাগে কানাডার হেইদি কোয়াচকে হারিয়ে সোনা জেতেন। অস্মিতার পরে ভারতের আরও এক জুডোকা হর্ষ সিং ও সোনা জিতে নেন।
২২ বছর বয়সি এই জুডোকা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ফাইনালে ইউকো-র ভিত্তিতে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেন। অসাধারণ ধৈর্য, সংযম এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লড়ে তিনি ভারতীয় জুডোর ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়ের জন্ম দেন। এই সোনা জয়ের মাধ্যমে কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে জুডোতে ভারতের প্রথম স্বর্ণপদকও নিশ্চিত হয়।
এ দিন ফাইনালের শুরুটা বেশ সাবধানে করেন অস্মিতা। দুই জুডোকাই ম্যাটের দুই প্রান্তে শারীরিক লড়াইয়ে একে অপরকে পরখ করতে থাকেন। ম্যাচের মাঝামাঝি সময়ে একটি সফল থ্রো করে কোয়াচ প্রথম পয়েন্ট তুলে এগিয়ে যান। তবে শিডো (সতর্কতামূলক পেনাল্টি) পেলেও দমে যাননি অস্মিতা। দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে একটি নিখুঁত থ্রোয়ে দ্রুতই সমতা ফেরান ভারতীয় জুডোকা।
ম্যাচ যত এগিয়েছে, ততই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন অস্মিতা। একের পর এক আক্রমণ শানিয়ে প্রতিপক্ষের উপর চাপ বাড়াতে থাকেন তিনি। তাঁর কয়েকটি লক করার চেষ্টা পয়েন্ট এনে দিতে না পারলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রাখেন। কোয়াচ পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করলেও ভারতীয় জুডোকা বিচলিত হননি। নির্ধারিত সময়ের শেষে স্কোর সমান থাকায় ম্যাচ গড়ায় গোল্ডেন স্কোরে। সেখানেও অসাধারণ ধৈর্য ও মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দেন অস্মিতা।
শেষ পর্যন্ত ম্যাটের একেবারে প্রান্তে দুর্দান্ত একটি থ্রো করে জয়ের পয়েন্ট আদায় করেন তিনি। সেই সঙ্গে নিশ্চিত করেন ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক। এর আগে শুক্রবার সেমিফাইনালে স্কটল্যান্ডের সারা অ্যাডলিংটনের বিরুদ্ধে রুদ্ধশ্বাস গোল্ডেন স্কোর লড়াইয়ে জিতে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছিলেন অস্মিতা। সেই জয়েই ভারতের জন্য অন্তত একটি পদক নিশ্চিত হয়েছিল। কোয়ার্টার ফাইনালে তিনি স্কটল্যান্ডের ইভা ইউইংকে ইপ্পন-এর মাধ্যমে অনায়াসে হারিয়ে নিজের অভিযান শুরু করেছিলেন।
অস্মিতার দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার সদর শহর বেলোনিয়ায়। সাইকেল মেরামতির দোকান চালানো এক বাবার মেয়ে থেকে কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের প্রথম জুডো চ্যাম্পিয়ন হয়ে ওঠার এই যাত্রা অধ্যবসায়, কঠোর শৃঙ্খলা এবং ধাপে ধাপে নিজেকে গড়ে তোলার এক অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প।
এ বার দুরন্ত ছন্দে রয়েছেন ভারতের জুডোকা ও বক্সাররা। ভারতের আরো দুই জুডোকা হর্ষ সিং, যামিনী মৌর্যও নিজেদের বিভাগে সোনা জয়ের লড়াইয়ে নামার যোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছেন।
হর্ষ পুরুষদের ৬০ কেজি বিভাগের ফাইনালে উঠে সোনা জয়ের আশা জাগিয়েছেন। তাঁদের এই সাফল্যে ভারতের জন্য দিনটি আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এর আগে বক্সিংয়ে অঙ্কুশ পাংঘাল এবং প্রীতি পানওয়ার নিজেদের বিভাগে ফাইনালে উঠে সোনা বা রুপো নিশ্চিত করেছেন। এ ছাড়া মহিলাদের ৫৭ কেজি বিভাগে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জসমিন লাম্বোরিয়াও লেসোথোর রাপেলাং মাসেলেলাকে হারিয়ে খেতাবি লড়াইয়ে পৌঁছেছেন। মহিলাদের ৭০ কেজি বিভাগে অরুন্ধতী চৌধুরী ফাইনালে উঠে আরও একটি পদক নিশ্চিত করেন। সেমিফাইনালে তিনি ওয়েলসের রোজি একলেসকে ৪-০ ব্যবধানে স্প্লিট ডিসিশনে পরাজিত করেন। এই জয়ের ফলে অন্তত রুপোর পদক নিশ্চিত হয়ে গেল অরুন্ধতীর। পুরুষদের ৫৫ কেজি বিভাগে জাদুমণি সিং-ও ফাইনালে উঠলেন ৫-০-য় জিতে। এবার ফাইনালে সোনা জয়ের লক্ষ্যে নামবেন ভারতীয় বক্সার।
ভারতের আরও পাঁচ বক্সার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে রয়েছেন। এঁরা প্রত্যেকেই দেশের জন্য অন্তত একটি করে পদক নিশ্চিত করেছেন। অ্যাথলেটিক্সে পুরুষদের ডেকাথলনে ডিসকাস থ্রো ইভেন্ট শেষে তেজস্বিন শঙ্কর সামগ্রিক তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। এখন পর্যন্ত গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের ঝুলিতে এসেছে মোট ১৭টি পদক এবং মোট ৩০টি পদক নিশ্চিত হয়েছে।
ভারতের দুই বক্সার প্রীতি পানওয়ার (৫৪ কেজি) এবং অঙ্কুশ পাংঘাল (৮০ কেজি) শুক্রবার দুর্দান্ত জয় তুলে নিয়ে ফাইনালে প্রবেশ করেন। সেমিফাইনালে প্রীতি ৫-০ ব্যবধানে জাম্বিয়ার ক্যাথরিন মওয়াপেকে হারান। একই ব্যবধানে ঘানার জোশুয়া ওফোরিকেও উড়িয়ে দেন অঙ্কুশ।
২২ বছর বয়সি ভিওয়ানির বাসিন্দা প্রীতি, যিনি এশিয়ান গেমসে ব্রোঞ্জজয়ী, এ বার সোনার লড়াইয়ের টিকিট নিশ্চিত করলেন। ফাইনালে তাঁর প্রতিপক্ষ কানাডার স্কারলেট দেলগাদো। সেমিফাইনালে দেলগাদো ৪-১ ব্যবধানে ইংল্যান্ডের লরেন ম্যাকিকে পরাজিত করেন।
পুরো লড়াই জুড়েই প্রীতি গতি ও কৌশলে মওয়াপেকে ছাপিয়ে যান। প্রতিপক্ষকে সামনে টেনে এনে পাল্টা আক্রমণে বাজিমাত করেন তিনি। বিশেষ করে তাঁর বাঁ-হাতের সোজাসাপ্টা পাঞ্চ তাঁকে লড়াইয়ে অনেক এগিয়ে দেয়।
সেমিফাইনালে জয়ের পর প্রীতি বলেন, ‘আমি খুব খুশি যে প্রস্তুতি অনুযায়ী লড়তে পেরেছি। আগামীকাল (শনিবার) সোনার পদকের জন্য নিজের সেরাটা উজাড় করে দিতে হবে। আমি কখনও কোনো প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে নিই না। কোচদের সঙ্গে প্রতিটি প্রতিপক্ষকে নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা করি। সবচেয়ে ভালো লাগছে, সেই পরিকল্পনাগুলো রিংয়ে বাস্তবায়ন করতে পেরেছি বলে’।
অঙ্কুশও ওফোরির বিরুদ্ধে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দাপট দেখিয়েছেন। প্রথম দুই রাউন্ডেই নিখুঁত বক্সিংয়ে প্রতিপক্ষকে কার্যত অসহায় করে তোলেন ভারতীয় বক্সার। চাপে পড়ে ওফোরি বারবার ক্লিঞ্চের আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। দ্বিতীয় রাউন্ডের শুরুতে ঘানার বক্সার সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ শানানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অঙ্কুশ অনায়াসে সেই চাপ সামলে নিয়ে পাল্টা ঝাঁঝালো কম্বিনেশন পাঞ্চে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন। শেষ পর্যন্ত একতরফা লড়াইয়ে বিচারকদের সর্বসম্মত ৫-০ রায়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেন ভারতীয় বক্সার।
এ ছাড়াও মহিলাদের ৫১ কেজি বিভাগে সাক্ষী চৌধুরি, মহিলাদের ৬০ কেজি বিভাগে প্রিয়া ঘাংঘাস, মহিলাদের ৭৫ কেজি বিভাগে লভলিনা বারগোহাইন, পুরুষদের ৬০ কেজি বিভাগে শচীন সিওয়াচ ও পুরুষদের ৯০ কেজি বিভাগে নরেন্দর বেরওয়াল—এঁরা প্রত্যেকেই সেমিফাইনালে লড়ছেন। এঁদের প্রত্যেকেরই পদক নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। তবে পদকের রঙ কী হবে, তা তাঁদের পারফরম্যান্সের ওপরই নির্ভর করছে।
Leave a Comment