তালিবানের নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে আফগানিস্তানে আফিম চাষ চার গুণ বৃদ্ধি, চাষিদের আক্ষেপ, ‘চাষ বন্ধ রাখলে সন্তানদের খাবার জুটবে না’

By Suman Debnath

October 29, 2026 5:45 PM

তালিবানের নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে আফগানিস্তানে আফিম চাষ চার গুণ বৃদ্ধি, চাষিদের আক্ষেপ, ‘চাষ বন্ধ রাখলে সন্তানদের খাবার জুটবে না’


আফগানিস্তানে আফিম পোস্ত চাষের (Afganisthan Opium Poppy) উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল তালিবান সরকার (Taliban)। চার বছর পরেও পরিস্থিতির বিশেষ কোনও বদল হয়নি। রাষ্ট্রসঙ্ঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরে আফগানিস্তানে আফিম পোস্ত চাষের (Afganisthan Opium Poppy) পরিমাণ গত বছরের তুলনায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈধভাবে চাষ করে সংসার চালানো কঠিন বলে বহু চাষি ফের পোস্ত চাষের দিকে ঝুঁকছেন। তাঁদের বক্তব্য, এই চাষ বন্ধ রাখলে সন্তানদের খাবার জুটবে না।

উত্তর আফগানিস্তানের বলখ প্রদেশের বাবা ইউসুফ গ্রামের বাসিন্দা মহম্মদ দাউদ। এক সময় পোস্ত চাষ থেকে পাওয়া আয়েই সারা বছর তাঁর পরিবারের খরচ চলত। বর্তমানে দাউদ তুলো ও গমের খেতে কাজ করেন। তাতেও সংসার চালানোর মতো আয় হচ্ছে না। তিনি এখনও তালিবানের নিষেধাজ্ঞা মেনে পোস্ত চাষ থেকে দূরে রয়েছেন। তাঁর দাবি, আগে পোস্ত চাষ করে যা আয় করতেন, এখন বৈধ ফসল চাষ করে তার মাত্র চল্লিশ ভাগের এক ভাগ আয় হয়।

তবে সবাই যে দাউদের মতো নিষেধ মেনে চলেন, তা নয়। রাষ্ট্রসঙ্ঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দপ্তর (UNODC) জানিয়েছে, গত বছর যে বলখ প্রদেশকে পোস্ত চাষমুক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল, চলতি বছরে সেখানেও ফের পোস্ত চাষ শুরু হয়েছে। তালিবান সরকারের ভয়ে অনেক চাষিই প্রকাশ্যে তা স্বীকার করতে চান না।

আরও পড়ুন: আমেরিকায় বসে নিজেকে ব্রাজিলের ‘আসল প্রেসিডেন্ট’ ঘোষণা ফ্লাভিওর

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ইউএনওডিসির রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরে আফগানিস্তানে আফিম পোস্ত চাষের (Afganisthan Opium Poppy) জমির পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৪৩ হাজার হেক্টর, যা প্রায় ১ লক্ষ ৬ হাজার ২০০ একরের সমান। গত বছর যা ছিল মাত্র ১০ হাজার হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে চাষের জমি চার গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

আরও পড়ুন:  বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটে ফের পাশে ভারত, ৪৭ লাখ লিটার ডিজেল সরবরাহ

শুধু চাষের জমিই নয়, আফিম উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছর যেখানে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ৩০০ টন, সেখানে চলতি বছরে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টন। প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।আফগানিস্তানের জন্য ইউএনওডিসির প্রতিনিধি পোলেক ওক সেরেই সংবাদসংস্থাকে জানিয়েছেন, বহু কৃষকের কাছে পোস্ত চাষ করা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। তাঁর বক্তব্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও বিকল্প জীবিকার অভাব এই প্রবণতার অন্যতম কারণ।

আফগানিস্তানের কৃষকদের পোস্ত চাষ করার অন্যতম কারণ বৈধ ফসলের তুলনায় এই চাষে বিপুল লাভ। ইউএনওডিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এক হেক্টর জমিতে গম চাষ করে আয় হয়েছিল ৭৭০ ডলারের কিছু বেশি। অথচ একই পরিমাণ জমিতে পোস্ত চাষ থেকে আয় হতে পারত প্রায় ১০ হাজার ডলার।

উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তানের ২২ বছরের এক কৃষক মহম্মদ সংবাদসংস্থাকে জানিয়েছেন, ‘আফিম ছাড়া আমাদের ন্যূনতম খাবার কেনার ক্ষমতা থাকে না।‘ তাঁর অভিযোগ, তালিবান সরকার পোস্ত চাষে বাধা দিচ্ছে এবং চাষিদের হুমকি দিচ্ছে। তবু ভয় নিয়েই অনেকে এই চাষ করছেন।
ওই কৃষকের কথায়, তিনি একটি গাড়ি কিনতে চান, বাড়ি তৈরি করতে চান এবং বিয়ে করতে চান। কিন্তু আফিম চাষ না করলে সেই স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।

আরও পড়ুন:  গাজায় ঐতিহাসিক চুক্তি ঘোষণা করলেন ট্রাম্প

আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩ আর বিরোধীরা ৬৭, তবু ইজরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থা কেন?

আফগানিস্তানে আফিম পোস্ত চাষ (Afganisthan Opium Poppy) নিষিদ্ধ হলেও বাজারে আফিমের দাম এখনও তুলনামূলক ভাবে বেশি। ইউএনওডিসির প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতি কিলোগ্রাম আফিমের দাম ছিল প্রায় ৫৭০ ডলার। ২০২৬ সালে তা কিছুটা কমে হয়েছে ৫০০ ডলার। তবে নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পরেও দাম কমেনি বরং অনেক বেড়েছে।

রিপোর্টে আরও জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালে আফগানিস্তানে আফিম বিক্রি থেকে আনুমানিক ৫২৫ মিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। ২০১৮ সালের পর থেকে ২০২২ সাল বাদ দিলে, এটাই সর্বোচ্চ আয়। ২০২২ সালে তালিবানের নিষেধাজ্ঞার জেরে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় আফিমের দাম অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গিয়েছিল।

আফগানিস্তানের পোস্ত খেতে এক সময় বিশ্বের মোট আফিমের প্রায় ৮০ শতাংশ উৎপাদিত হত। আফিম থেকে চিকিৎসার জন্য মরফিন তৈরির পাশাপাশি বেআইনি মাদক হেরোইনও তৈরি করা হয়।তালিবান সরকার পোস্ত চাষ কঠোর হাতে বন্ধ করতে চাইলেও কৃষকদের আর্থিক দুরবস্থা এই নিষেধাজ্ঞারর বাস্তবায়নে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গম ও তুলোর মতো ফসল থেকে পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় অনেক কৃষক ফের লাভজনক পোস্ত চাষের দিকে ঝুঁকছেন বলে জানিয়েছে ইউএনওডিসি।

রাষ্ট্রসঙ্ঘের মত, শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই এই সমস্যার সমাধান হবে না। দরিদ্র কৃষকদের জন্য বিকল্প আয়ের সুযোগ এবং জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আফগানিস্তানে পোস্ত চাষ বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

দেখুন:

 

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment