ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই দলীয় সংগঠন এবং জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে মতপার্থক্য নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে রাজ্য বিজেপিতে। কোথাও বিধায়ককে না জানিয়ে কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া, কোথাও সাংগঠনিক পদাধিকারীদের সঙ্গে দূরত্ব। কোথাও বা দলের নিচু তলার নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ। এমনই একাধিক অভিযোগ ঘিরে এবার দলের সর্বস্তরকে সতর্ক করলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন। তাঁর বার্তা, সরকারের সঙ্গে দলের যেমন সমন্বয় থাকতে হবে, তেমনই সংগঠন ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যেও থাকতে হবে নিবিড় যোগাযোগ।
শুক্রবার পূর্ণাঙ্গ রাজ্য কমিটি গঠন হয়েছে বিজেপির। রাজ্য কমিটি গঠনের পর এই প্রথম বাংলায় এলেন দলের সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন। রবিবার নিউটাউনের বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে রাজ্য পদাধিকারী, জেলা সভাপতি ও ইনচার্জ, বিভাগীয় আহ্বায়ক, বিভিন্ন মোর্চার সভাপতি, সমাজমাধ্যমের দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সাংগঠনিক বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সুনীল বনশল।
বিজেপি সূত্রের খবর, বৈঠকে নীতিনের মূল বার্তাই ছিল সমন্বয়। তাঁর মতে, সরকার এবং সংগঠনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে তার প্রভাব পড়বে সরকারের ভাবমূর্তি এবং দলের সাংগঠনিক শক্তির উপর। তাই জনপ্রতিনিধিদের সাংগঠনিক নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় রেখে চলতে হবে। পাশাপাশি সংগঠনকেও সরকারের কাজের প্রচারে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় বিধায়ক ও সাংগঠনিক পদাধিকারীদের মধ্যে মতপার্থক্যের অভিযোগ সামনে এসেছে। সম্প্রতি চুঁচুড়ার বিধায়ক সুবীর নাগ ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে সপ্তগ্রামের একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওই অনুষ্ঠানে যাওয়ার বিষয়টি সপ্তগ্রামের বিধায়ককে না জানানোয় বিতর্ক তৈরি হয়। যা নিয়ে মুখ খোলেন হুগলি জেলার সভাপতি গৌতম চট্টোপাধ্যায়। দলের স্থানীয় নেতৃত্বকে জানিয়ে গেলে ভালো হতো বলে জানান তিনি। সূত্রের খবর, কলকাতা, শহরতলি এবং কয়েকটি জেলাতেও এমন সমান্তরাল গতিবিধি নিয়ে দলের ভিতরেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, যা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
জেলায় জেলায় কোর কমিটি গঠন করেও সেই সমস্যা পুরোপুরি মেটেনি বলে খবর। বিষয়টি নিয়ে সর্বভারতীয় সভাপতির স্পষ্ট কথা, ‘দলের মধ্যে বেনোজল ঢুকতে দেওয়া যাবে না। কোথাও কোনও অভিযোগ উঠলে নেতৃত্বকেই শক্ত হাতে তা সামলাতে হবে।’ ক্ষমতায় আসার পরে নেতা-কর্মীদের একাংশের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন তিনি। নীতিনের পরামর্শ, সকলের সঙ্গে নম্র-ভদ্র ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষক, অধ্যাপক, সরকারি আধিকারিক, কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী, ব্যবসায়ী-সহ এলাকার বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে দলের যোগাযোগ বাড়াতে পরামর্শ দেন নবীন।
শুধু সরকারের কাজের প্রচারের উপর নির্ভর করে সংগঠন বাড়ানো যাবে না বলেও সতর্ক করেছেন নীতিন। দলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে নিয়মিত জনসংযোগের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। দলীয় সূত্রে খবর, প্রথম দফায় ৭ অক্টোবর পর্যন্ত বুথভিত্তিক কর্মসূচি, পাড়ায় পাড়ায় প্রচার ও জনসংযোগ চলবে। দ্বিতীয় দফায় পুজোর পরেও সেই কর্মসূচি চলবে। সর্বভারতীয় সভাপতির নির্দেশ বুথভিত্তিক পথসভা করে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের সমাজকল্যাণমূলক কাজ তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় ক্লাবগুলির সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় করতে হবে। মহিলা, যুব সম্প্রদায়, প্রবীণদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। ভালো ভাবমূর্তির যে সমস্ত তৃণমূল নেতা-কর্মী বিজেপিতে আসতে চান, তাঁদের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বলে সূত্রের খবর। বলা যেতে পারে, সরকারকে সামনে রেখে সরকারের কাজের প্রচার, সংগঠনের বিস্তার এবং জনপ্রতিনিধি ও নেতৃত্বের সমন্বয়, তিনটিকেই একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়ে গেলেন নীতিন নবীন।
Leave a Comment