কলকাতা: ২০১৮ সালে মাত্র ১০ হাজার টাকা দিয়ে শুরু হয়েছিল পুজো অনুদানের যাত্রা। ২০২৫ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ মাত্র ৮ বছরে বেড়েছে ১১ গুণেরও বেশি। কিন্তু ২০২৬ সালে রাজ্যের শাসনক্ষমতায় বদল এসেছে। তৃণমূল সরিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি, মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তবে সম্প্রতি নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার রাজ্যের ৬০টি রথযাত্রা কমিটিকে ৫ লক্ষ টাকা করে অনুদান ঘোষণা করায় পুজো কমিটিগুলোর প্রত্যাশা তুঙ্গে। প্রশ্ন উঠছে— ২০২৬ সালে পুজো কমিটিগুলো কত টাকা পেতে পারে? কী ইঙ্গিত দিচ্ছে নতুন সরকারের এই সিদ্ধান্ত? চলুন, একনজরে দেখে নেওয়া যাক।
রথযাত্রায় ৫ লক্ষ টাকা: পুজোর জন্য কী ইঙ্গিত?
সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকার প্রথম বড় সাংস্কৃতিক অনুদান হিসেবে ৬০টি রথযাত্রা কমিটিকে ৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা করেছে। এতে মোট খরচ হয়েছে ৩ কোটি টাকা। এই সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ আগের তৃণমূল সরকার কখনও রথযাত্রা কমিটিগুলোকে এমন বড় অঙ্কের অনুদান দেয়নি। তৃণমূল জমানায় রথযাত্রা ছিল মূলত ধর্মীয় অনুষ্ঠান, তাকে ঘিরে সরকারি অনুদানের সংস্কৃতি ছিল না। সেখানে বিজেপি সরকার প্রথম থেকেই রথযাত্রাকে পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করল। এতেই স্পষ্ট, নতুন সরকার সংস্কৃতি ও উৎসবের প্রতি কতটা উদার মনোভাবাপন্ন।
পুজো অনুদান কি তাহলে বাড়বে?
এই প্রশ্নই এখন ঘুরছে ক্লাবগুলোর অন্দরে। রথযাত্রার তুলনায় দুর্গাপুজোর পরিসর অনেক বড়। রাজ্যে প্রায় ৪০ হাজার অনুমোদিত দুর্গাপুজো কমিটি রয়েছে। সব ক্লাবকে রথযাত্রার মতো ৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়া সম্ভব নয়— তাতে খরচ দাঁড়াবে ২ হাজার কোটি টাকা, যা রাজ্যের পক্ষে বহন করা কঠিন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, রথযাত্রার এই সিদ্ধান্ত থেকে পাঁচটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালে কত হতে পারে অনুদান? পাঁচটি সম্ভাবনা
১. সর্বনিম্ন সম্ভাবনা— ১০,০০০ টাকা (শুরুয়াতি স্তরে ফিরে যাওয়া): মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আগেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, “পুজো অনুদান তাঁরাই পাবেন, যাঁদের অর্থের দরকার।” সেই নিরিখে যদি বাছাই প্রক্রিয়া কঠোর হয়, তাহলে অনেক ক্লাব ২০১৮ সালের সূচনালগ্নের ১০ হাজার টাকাই পেতে পারে। এটি হবে অনুদানের ইতিহাসে সর্বনিম্ন স্তর।
২. নিম্নমুখী সম্ভাবনা— ২৫,০০০ টাকা (মধ্যমপন্থা): সরকার চাইবে না পুজো কমিটিগুলো পুরোপুরি বিরোধী হয়ে যাক। তাই একেবারে ১০ হাজারে নামিয়ে না দিয়ে ২৫ হাজার টাকায় রাখতে পারে। পাশাপাশি শর্তসাপেক্ষে শুধু ছোট ক্লাবগুলিকেই এই অনুদান দেওয়া হতে পারে।
৩. মধ্যম সম্ভাবনা— ৫০,০০০ টাকা (সর্বাধিক সম্ভব): রথযাত্রায় ৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার পর পুজো কমিটিগুলোকে একেবারে হাতশূন্য করার ঝুঁকি নেবে না সরকার। বরং ছোট ক্লাবগুলিকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হতে পারে। বড় ক্লাবগুলো বিদ্যুৎ বিলে ছাড় বা অন্যান্য পরোক্ষ সুবিধা পেতে পারে।
৪. উচ্চমুখী সম্ভাবনা— ১,০০,০০০ টাকা (নতুন বার্তা দিতে চাইলে): রথযাত্রার ৫ লক্ষ টাকার নিরিখে যদি সরকার পুজোতেও বড় অঙ্ক দিতে চায়, তাহলে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অনুদান আসতে পারে। তবে তা সব ক্লাব পাবে না। যারা প্রকৃতই আর্থিকভাবে দুর্বল, শুধু তারাই এই অনুদান পাবে।
৫. সর্বোচ্চ সম্ভাবনা— ২,০০,০০০ টাকা (বিরাট চমক): বিজেপি যদি সত্যিই সংস্কৃতি ও উৎসবের প্রতি নিজেদের উদারতা প্রমাণ করতে চায়, তাহলে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অনুদান ঘোষণা করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে বাছাই প্রক্রিয়া হবে অত্যন্ত কঠোর। মোট ক্লাবের মাত্র ১০-১৫ শতাংশ এই অনুদান পেতে পারে। এতে মোট খরচ হতে পারে ৮০-১২০ কোটি টাকা, যা রথযাত্রার ৫ লক্ষ টাকার নিরিখে খুবই সামান্য।
একনজরে: ২০২৬-এ পুজো অনুদানের ৫ সম্ভাবনা
যেভাবে বেড়েছে অনুদান: ২০১৮-২০২৫
তথ্য বলছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকার প্রতি বছরই কোনও না কোনও হারে পুজো অনুদান বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে এক ধাক্কায় ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এই অনুদান বাবদ ২০২৫ সালে রাজ্যের মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রথযাত্রায় ৫ লক্ষ টাকা অনুদান দিয়ে বিজেপি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে— তারা সংস্কৃতি ও উৎসবের বিরোধী নয়, বরং আরও উদার। এমনকি আগের সরকার যে ধর্মীয় উৎসবে নিয়মিত অনুদান দিত না, সেখানে বিজেপি প্রথম থেকেই রথযাত্রাকে গুরুত্ব দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করল। এই মনোভাব পুজোর ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হবে বলেই ধরে নেওয়া যায়। তবে একইসঙ্গে সরকারি কোষাগারের ওপর বাড়তি চাপ এড়াতে তারা বাছাই প্রক্রিয়া কঠোর করবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্লাবভিত্তিক অনুদানের পাশাপাশি পুজো পরিকাঠামো— যেমন আলো, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তায় ভর্তুকি দেওয়ার পথেও হাঁটতে পারে সরকার।
রথযাত্রার ৫ লক্ষ টাকা অনুদান পুজো কমিটিগুলোর প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে নিঃসন্দেহে। তবে বাস্তবতা হলো, পুজোর বিশালতা ও ক্লাবের সংখ্যার নিরিখে সেই অনুপাতে টাকা বাড়ানো কঠিন। তবু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গতবারের ১.১০ লক্ষ টাকা না হোক, অন্তত ২৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকার গণ্ডি অতিক্রম করতে পারে অনুদানের অঙ্ক। এখন দেখার, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও তাঁর দল ঠিক কী সিদ্ধান্ত নেন।
Leave a Comment