সর্বভারতীয় সভাপতি পশ্চিমবঙ্গে আসার দু’দিন আগেই রাজ্য বিজেপিতে বড়সড় সাংগঠনিক রদবদল। বদলে গেল মহিলা মোর্চা ও যুব মোর্চার শীর্ষপদ। একই সঙ্গে সাতটি সাংগঠনিক জেলার সভাপতিকেও সরিয়ে নতুন মুখ আনা হল। ‘এক ব্যক্তি, এক পদ’ নীতি মেনে মন্ত্রী হওয়া নেতাদেরও সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েক দফায় দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় পরিবর্তন হয়েছে। প্রথমে সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সম্পাদক-সহ বিভিন্ন পদাধিকারীর তালিকা প্রকাশ করা হয়। পরে ঘোষণা করা হয় রাজ্য কার্যকারিণী, সংবাদমাধ্যম, সমাজমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তদের নাম। বৃহস্পতিবার সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) পদে অমিতাভ চক্রবর্তীর পুনর্নিয়োগের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তার পরের দিনই গুরুত্বপূর্ণ শাখা সংগঠন ও জেলা স্তরে রদবদল করা হল।
২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের আগে ঘোষিত কমিটিতে যাঁরা সাংগঠনিক পদে ছিলেন, কিন্তু পরে মন্ত্রী হয়েছেন, তাঁদের সেই দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা জেলা সভাপতিদের পরিবর্তনের বিষয়টিও শুক্রবার অনেকটাই সেরে ফেলেছে দল।
মহিলা মোর্চার নতুন রাজ্য সভানেত্রী হলেন অঞ্জনা বসু। বাংলা টেলিভিশনের পরিচিত মুখ অঞ্জনা ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। ভোটের পরে দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে জল্পনা ছড়ালেও পরবর্তী সময়ে ফের সক্রিয় হন তিনি। কয়েক মাস আগে কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের পরামর্শক সদস্য করা হয় তাঁকে। সম্প্রতি কলকাতার একটি কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পান।
এ বার ফাল্গুনী পাত্রকে সরিয়ে মহিলা মোর্চার শীর্ষপদে আনা হল অঞ্জনাকে। এর ফলে মহিলা মোর্চার নেতৃত্বে ফের এক পরিচিত মুখকে বেছে নিল বিজেপি। এর আগে রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, লকেট চট্টোপাধ্যায় ও অগ্নিমিত্রা পাল মহিলা মোর্চার নেতৃত্বে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তনুজা চক্রবর্তী ও ফাল্গুনী পাত্র দলের পুরনো কর্মী হিসাবে দায়িত্ব সামলেছেন।
যুব মোর্চার ক্ষেত্রেও ‘এক ব্যক্তি, এক পদ’ নীতি কার্যকর হয়েছে। এত দিন যুব মোর্চার সভাপতি ছিলেন ইন্দ্রনীল খাঁ। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে জিতে তিনি মন্ত্রী হয়েছেন। ফলে সংগঠনের শীর্ষপদে তাঁর থাকা সম্ভব ছিল না। তাঁর জায়গায় যুব মোর্চার সভাপতি করা হয়েছে অমিত সামন্তকে। ইন্দ্রনীলের কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অমিত। এ বার তাঁকেই সংগঠনের শীর্ষপদে তুলে আনা হল।
রাজ্য বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোতেও একাধিক পরিবর্তন হয়েছে। সহ-সভাপতি পদে থাকা জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, অগ্নিমিত্রা পাল ও দীপক বর্মন এবং রাজ্য সম্পাদক শঙ্কর ঘোষ—চারজনকেই সাংগঠনিক পদ থেকে সরানো হয়েছে। কারণ, তাঁরা প্রত্যেকেই বর্তমানে রাজ্য সরকারের মন্ত্রী।
তবে রাজ্য সম্পাদক পদ থেকে শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের অপসারণ নিয়ে দলের অন্দরে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি মন্ত্রী নন, বিধায়ক। বিজেপিতে বিধায়ক বা সাংসদদের সাংগঠনিক পদে থাকার ক্ষেত্রে বাধা নেই। ফলে তাঁকে কেন সরানো হল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দলীয় সূত্রে দাবি, যাদবপুরে তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা নিয়ে দলের একাংশের আপত্তি ছিল। যদিও তাঁর অপসারণের সঙ্গে সেই বিষয়টির সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
নতুন সাংগঠনিক তালিকায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত সুনীল বনসলের প্রভাবও নজরে পড়ছে। পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বে থাকার সময়ে তাঁর নেতৃত্বে ‘বুথ সশক্তিকরণ অভিযান’ চালানো হয়েছিল। সেই সময় তাঁর সঙ্গে কাজ করা একাধিক নেতা ইতিমধ্যেই রাজ্য বিজেপিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন।
প্রবাল রাহা আগেই রাজ্য সহ-সভাপতি হয়েছেন। শশী অগ্নিহোত্রী হয়েছেন সাধারণ সম্পাদক। শাখারভ সরকার রাজ্য সম্পাদক পদে রয়েছেন। অনুপম ঘোষকে সংবাদমাধ্যম বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শুক্রবারের নতুন তালিকায় রামপদ দাসকে সহ-সভাপতি এবং নীলাঞ্জন অধিকারী ও শঙ্কর চক্রবর্তীকে রাজ্য সম্পাদক করা হয়েছে। যুব মোর্চার নতুন সভাপতি অমিত সামন্তকেও বনসল-ঘনিষ্ঠ হিসাবে দেখা হয়।
এ দিকে ফাল্গুনী পাত্রকে মহিলা মোর্চার সভানেত্রীর পদ থেকে সরিয়ে রাজ্য দলের সহ-সভানেত্রী করা হয়েছে। শমীক ভট্টাচার্যের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ অনল বিশ্বাসকে রাজ্য সম্পাদক করা হয়েছে। একই পদে আনা হয়েছে মিঠুন চক্রবর্তীর ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত সঞ্জয় বর্মাকেও।
জেলা স্তরেও বড় রদবদল হয়েছে। বনগাঁ, বারাসত, শ্রীরামপুর, আরামবাগ, মেদিনীপুর, বর্ধমান ও কাটোয়া—এই সাত সাংগঠনিক জেলায় নতুন সভাপতি ঘোষণা করা হয়েছে। বনগাঁয় নৃপেন বিশ্বাস, বারাসতে দীপঙ্কর চক্রবর্তী, শ্রীরামপুরে শশী সিংহ, আরামবাগে প্রশান্ত দিগার, মেদিনীপুরে সৌমেন তিওয়ারি, বর্ধমানে আশিস পাল এবং কাটোয়ায় মানিক রায়কে নতুন জেলা সভাপতি করা হয়েছে।
Leave a Comment