ভয়কে কোনও জায়গা দেন না তিনি। হারলেও বদলাবে না দলের খেলার ধরন। এমনই জানিয়ে দিলেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে পঞ্চম ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ ৩-২ ব্যবধানে জেতার পর দলের আগ্রাসী ক্রিকেটের পক্ষেই সওয়াল করলেন তিনি। গম্ভীরের স্পষ্ট বক্তব্য, পরিস্থিতি যেমনই হোক বা হারার আশঙ্কা থাকুক, ভারত নিজেদের ‘হাই রিস্ক, হাই রিওয়ার্ড’ ক্রিকেটের ধরন বজায় রাখবে।
আরপ্লাস নিউজ ডিজিতাল ডেস্ক
রবিবার হ্যামিলটনের সেডন পার্কে সিরিজের পঞ্চম তথা শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে সাত উইকেটে হারের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন গম্ভীর। তাঁর মতে, এই সিরিজে দলের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু জয় নয়, বরং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, চাপ সামলানো এবং প্রথম তিনটি ম্যাচে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দাপট দেখানো। সিরিজ শুরুর আগে অনুশীলনের জন্য মাত্র একটি সেশন পাওয়া নিয়ে তিনি চিন্তিত কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে গম্ভীর জানান, তিনি কোনও অজুহাতে বিশ্বাস করেন না। যে পরিস্থিতিই আসুক, দেশের হয়ে ভালো ফল করাই দলের দায়িত্ব। গম্ভীর বলেন, “আমি কোনও কিছুতেই ভয় পাই না। আমার অভিধানে বা চিন্তাভাবনায় ভয় বলে কোনও শব্দের জায়গা নেই। আমরা পেশাদার ক্রিকেটার। আমি সব সময় বিশ্বাস করি, কোনও অজুহাত দেওয়া উচিত নয়। আমাদের সামনে যে পরিস্থিতিই আসুক, সেখান থেকে সেরাটা বের করে আনার চেষ্টা করব এবং দেশের জন্য ভালো ফল করে যাব।”
সিরিজে দলের পারফরম্যান্সের কথা বলতে গিয়ে ভারতের সফল রান তাড়া করার ক্ষমতার প্রশংসা করেন প্রধান কোচ। তাঁর কথায়, কঠিন পরিস্থিতি থেকেও দল যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা প্রশংসার যোগ্য। তিনি বলেন, “জয়ের পাশাপাশি এই সিরিজে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হল, ছেলেরা যেভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে এবং প্রথম তিনটি ম্যাচে দাপট দেখিয়েছে। আমরা যখন কঠিন পরিস্থিতিতে ছিলাম, তখন তিন তরুণ ক্রিকেটার ২২০ রান করে দলকে জয়ের মুখ দেখিয়েছিল। এরপর মাত্র ১৪ ওভারে ১৯৯ রান করে জয় পেয়েছি।মাত্র একটি অনুশীলন সেশন পেয়েও প্রথম ম্যাচ জিতেছি। এই মানসিকতাই আমাদের দলের আসল শক্তি।” গম্ভীর আরও জানান, শেষ দু’টি ম্যাচও জেতার লক্ষ্য ছিল দলের। তবে চাপের মুখে নিজেদের সামলে নেওয়া এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার ধরন বদলাতে পারাই এই সিরিজের বড় শিক্ষা।
অনুশীলনের সময় ব্যাটার ও বোলারদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলা এবং তাঁদের পরামর্শ দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন করা হয় তাঁকে। উত্তরে গম্ভীর জানান, ক্রিকেটারদের সেরা প্রস্তুতি দেওয়াই তাঁর কাজ। নিউজিল্যান্ডে খেলার নিজের অভিজ্ঞতাও তিনি ক্রিকেটারদের সঙ্গে ভাগ করে নেন। ভারতের আগ্রাসী ক্রিকেটের ধরন নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন গম্ভীর। তাঁর মতে, এই ধরনের ক্রিকেট খেলতে গিয়ে কখনও বড় ব্যবধানে হারলেও দলের দর্শন বদলাবে না।
তিনি বলেন, “গত দু’বছর থেকে আড়াই বছর ধরে আমরা বেশি ঝুঁকি নিয়ে বড় সাফল্যের লক্ষ্যে ক্রিকেট খেলছি। এর ফলে আমরা ম্যাচ হারব, কখনও বড় ব্যবধানেও হারতে হতে পারে। কিন্তু আমাদের খেলার দর্শন বদলাবে না। এই দর্শনই আমাদের সাফল্য এনে দিয়েছে। তাই আমরা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।” গম্ভীরের কথায়, “কোনও দিন হয়তো ১০০ রানে হারতে হবে, আবার কোনও দিন ১০ ওভারের মধ্যে ১৫০ টার্গেট রান করে জিতব। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ভারত যেখানেই খেলি না কেন, আমরা এই ধরনের ক্রিকেটই খেলতে চাই।”
দলে প্রতিভাবান ক্রিকেটার থাকা সত্ত্বেও সবাইকে প্রথম একাদশে সুযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। বাদ পড়া ক্রিকেটারদের সঙ্গে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলা কতটা কঠিন, সেই প্রশ্নেরও উত্তর দেন গম্ভীর। তিনি বলেন, জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গম্ভীরের কথায়, “এটাই আমার কাজ। আমি আগেও বলেছি, আমার কাজ সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়। ড্রেসিংরুমে বসে সবাইকে খুশি করার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব সহজ। কিন্তু আমার কাজ হল দলের মধ্যে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এবং যারা দীর্ঘদিন ধরে ভালো খেলছে, তাদের পাশে থাকা ও স্পষ্টভাবে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানানো।”
এই ধরনের আলোচনা যে সব সময় সহজ হয় না, তা স্বীকার করে নিয়েছেন ভারতীয় দলের কোচ। তাঁর মতে, একজন কোচের কাছে সততা ও স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, “কোচ হিসেবে এই কথোপকথনগুলো সব সময় কঠিন হয়। প্রতিটি আন্তর্জাতিক দলেই প্রতিভাবান ক্রিকেটার থাকে। আমার কাছে সততা, স্পষ্ট কথা বলা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটাই একজন প্রধান কোচের কাজ। আমি যদি নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করি, তাহলে যে কারও চোখে চোখ রেখে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব।”
গত চার-পাঁচ মাসে বিভিন্ন ফরম্যাট, আলাদা পরিবেশ এবং বিভিন্ন ধরনের ক্রিকেটারদের সামলাতে গিয়ে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন কি না, সেই প্রশ্নেও মুখ খোলেন গম্ভীর। তিনি স্বীকার করেন, কখনও কখনও তাঁর ক্লান্ত লাগে। তবে চাপ সামলানোর ক্ষমতা তাঁর রয়েছে বলেও জানান। গম্ভীর বলেন, “হ্যাঁ, সত্যি বলতে কখনও কখনও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু আমি সেই চাপ সামলানোর মতো যথেষ্ট শক্তিশালী। যত দিন পারব, চাপ সামলে যাব। আমি এভাবেই তৈরি হয়েছি। চাপ নিতে পারি, কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারি। তবে আমিও একজন মানুষ, তাই মাঝে মাঝে ক্লান্ত লাগতেই পারে। এখনও পর্যন্ত সেই চাপ সামলে নিতে পেরেছি।”
এদিকে, সিরিজের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে সাত উইকেটে হেরেছে ভারত। রবিবার হ্যামিলটনের সেডন পার্কে প্রথমে ব্যাট করে ২০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৯১ রান তোলে ভারত। জবাবে মাত্র ১৭.৪ ওভারেই ৩ উইকেট হারিয়ে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় নিউজিল্যান্ড। তবে শেষ ম্যাচে হারলেও পাঁচ ম্যাচের সিরিজ ৩-২ ব্যবধানে জিতে নেয় ভারত।
নিউজিল্যান্ডের হয়ে দুরন্ত ব্যাটিং করেন টিম সাইফার্ট। মাত্র ৫০ বলে ৯৩ রান করেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল ১১টি চার ও ৫টি ছক্কা। অন্যদিকে, গ্লেন ফিলিপস ৩৮ বলে ৬৫ রান করে অপরাজিত থাকেন। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৮টি চার ও ৩টি ছক্কা। তৃতীয় উইকেটে এই দুই ব্যাটার ৮৬ রানের জুটি গড়ে নিউজিল্যান্ডের জয় অনেকটাই নিশ্চিত করেন। এই সিরিজে চতুর্থবারের মতো অর্ধশতরান করলেন ফিলিপস। এর ফলে দ্বিপাক্ষিক টি-টোয়েন্টি সিরিজে চার বা তার বেশি অর্ধশতরান করার তালিকায় মহম্মদ রিজওয়ান এবং এস রবিচন্দ্রনের সঙ্গে জায়গা করে নিলেন তিনি।
এর আগে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় ভারত। মাত্র ১৯ রানের মধ্যে ২ উইকেট হারায় দল। এরপর ঈশান কিষাণ ও অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার ৯৩ রানের দুরন্ত জুটি গড়ে দলকে সামাল দেন। ৩১ বলে ৬১ রান করেন ঈশান। অন্যদিকে, মাত্র ২৩ বলে ৫০ রান করেন শ্রেয়স। এছাড়া নীতীশ কুমার রেড্ডি ১৭ বলে ২২ রান এবং নমন ধীর ২৩ বলে ৩৩ রান করেন। তাঁদের ব্যাটিংয়ের সুবাদে ১৯১ রানে পৌঁছয় ভারতের ইনিংস। নিউজিল্যান্ডের হয়ে দুরন্ত বোলিং করেন অ্যাডাম মিলনে। ১৯ রান দিয়ে ৪টি উইকেট তুলে নেন তিনি। ব্লেয়ার টিকনার ও নাথান স্মিথও উইকেট পান। শেষ ম্যাচে হারলেও সিরিজ জয়ের আনন্দ নিয়েই মাঠ ছাড়ে ভারত। অন্যদিকে, শেষ ম্যাচে জয় তুলে নিয়ে সিরিজ শেষ করে নিউজিল্যান্ড।
Leave a Comment