বিশ্বকাপ ফাইনালের স্কোরলাইন বলছে মাত্র ১-০। কিন্তু নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ১২০ মিনিটের ম্যাচের চিত্র ছিল অনেক বড়। স্পেন বনাম আর্জেন্তিনা ফাইনালে ফল নির্ধারণ করেছে শুধু ফেরান তোরেসের গোল নয়, বরং লুইস দে লা ফুয়েন্তের নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল পরিকল্পনা। রদ্রির মাঝমাঠের আধিপত্য, নিরন্তর প্রেসিং এবং বলের দখল ধরে রাখার কৌশলে লিওনেল স্কালোনির দলকে কার্যত নিজেদের ছন্দেই খেলতে দেয়নি স্পেন।
শুরু থেকেই দুই দলের পরিকল্পনায় ছিল স্পষ্ট পার্থক্য। স্পেন চেয়েছিল বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রেখে পজিশনাল ফুটবল খেলতে। অন্যদিকে আর্জেন্তিনা নির্ভর করেছিল নিচু ব্লকে রক্ষণ সাজিয়ে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকের উপর। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিকল্পনা কার্যকর হওয়ার সুযোগই পায়নি মেসিদের দল।
রদ্রির নিয়ন্ত্রণেই বদলে যায় ম্যাচের ছন্দ
মাঝমাঠে রদ্রি ছিলেন স্পেনের মূল নিয়ন্ত্রক। ডিপ-লাইং প্লেমেকার হিসেবে তিনি শুধু পাসের গতি ঠিক করেননি, পুরো ম্যাচের ছন্দও নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। তাঁর পাশে দানি ওলমো, মিকেল মেরিনো এবং ইনভার্টেড ফুল-ব্যাকদের নড়াচড়া স্পেনকে মাঝমাঠে সংখ্যাগত সুবিধা এনে দেয়।
ফলে আর্জেন্তিনা বল জিতলেও সেটি বেশিক্ষণ নিজেদের কাছে রাখতে পারেনি। বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই স্পেনের কাউন্টার-প্রেসিং শুরু হচ্ছিল এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আবার বল ফিরে আসছিল স্প্যানিশদের দখলে।
লামিনে ইয়ামালদের পজিশনাল ফুটবলে চাপে পড়ে আর্জেন্তিনা
ম্যাচের প্রথম বড় সুযোগই তৈরি হয় লামিনে ইয়ামাল ও দানি ওলমোর দ্রুত পাস বিনিময় থেকে। ইয়ামালের শট এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ঠেকিয়ে দিলেও সেই মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে যায় স্পেনের আক্রমণের ধরন।
স্পেনের লক্ষ্য ছিল চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করে—
- বলের দখল ধরে রাখা
- আর্জেন্তিনাকে ক্রমাগত দৌড় করানো
- দুই উইং ব্যবহার করে রক্ষণ ছড়িয়ে দেওয়া
- বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই প্রেসিং শুরু করা
এই সংগঠিত প্রেসিংয়ের কারণে লিওনেল মেসি, জুলিয়ান আলভারেজ ও আর্জেন্তিনার মিডফিল্ড বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কাউন্টার অ্যাটাক গড়ার মতো সময় বা জায়গা কোনওটাই পায়নি স্কালোনির দল।
স্কালোনির পরিকল্পনা কেন মাঠে ভেঙে পড়ল?
বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্তিনার অন্যতম বড় শক্তি ছিল দ্রুত ট্রানজিশন ফুটবল। কিন্তু ফাইনালে সেই অস্ত্র কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
স্কালোনি শুরু থেকেই নিচু ব্লকে দলকে সাজান। পরিকল্পনা ছিল রক্ষণ শক্ত রেখে সুযোগ বুঝে পাল্টা আক্রমণ। কিন্তু স্পেনের নিরন্তর প্রেসিং সেই কৌশল সফল হতে দেয়নি।
দ্বিতীয়ার্ধে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে নামিয়ে মাঝমাঠে শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও ম্যাচের ছবিতে তেমন পরিবর্তন আসেনি।
এর পিছনে কয়েকটি কারণ ছিল স্পষ্ট—
- স্পেনের প্রেসিং ভাঙতে পারেনি আর্জেন্তিনা
- মেসির কাছে নিয়মিত বল পৌঁছায়নি
- দুই প্রান্ত থেকে আক্রমণ গড়ে ওঠেনি
- জুলিয়ান আলভারেজ প্রায় একাই লড়েছেন
- মাঝমাঠে সংখ্যাগত ভারসাম্য থাকলেও বলের নিয়ন্ত্রণ ফেরানো যায়নি
সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল আক্রমণাত্মক মানসিকতার অভাব। দীর্ঘ সময় ধরে মনে হয়েছে, আর্জেন্তিনা যেন গোল করার চেয়ে গোল না খাওয়ার দিকেই বেশি মন দিয়েছে।
এমিলিয়ানো মার্তিনেজ শেষ পর্যন্ত একাই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন
স্পেনের ধারাবাহিক আক্রমণের সামনে একমাত্র ভরসা ছিলেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। দানি ওলমো, ফেরান তোরেস, নিকো উইলিয়ামস ও ইয়ামালের একের পর এক প্রচেষ্টা রুখে দেন তিনি।
কিন্তু রক্ষণভাগের উপর এত চাপ দীর্ঘ সময় ধরে সামলানো সম্ভব হয়নি। এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখার পর অতিরিক্ত সময়ে একজন কম নিয়ে খেলতে বাধ্য হয় আর্জেন্তিনা। সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগায় স্পেন।
১০৬ মিনিটেই আসে ম্যাচের সিদ্ধান্ত
অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে অবশেষে প্রতীক্ষিত গোলটি আসে। ডান প্রান্ত থেকে পেদ্রো পোরোর নিখুঁত ক্রস নিকো উইলিয়ামস হেড করে গোলমুখে নামিয়ে দেন। সেখানেই উপস্থিত ছিলেন ফেরান তোরেস।
এক টাচেই বল জালে জড়িয়ে স্পেনকে এগিয়ে দেন তিনি। পুরো ম্যাচে যে দল বলের দখল, আক্রমণের গতি এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল, তারাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সুযোগ কাজে লাগায়।
অনেক দেরিতে জেগে ওঠে আর্জেন্তিনা
গোল খাওয়ার পরই আর্জেন্তিনা বাধ্য হয়ে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে। গিউলিয়ানো সিমিওনে ডান দিক দিয়ে গতি বাড়ান, মেসিও মাঝমাঠে নেমে খেলার নিয়ন্ত্রণ ফেরানোর চেষ্টা করেন।
শেষ দিকে কয়েকটি আক্রমণ তৈরি হলেও স্পেনের সুসংগঠিত রক্ষণ ভাঙার মতো ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি আর্জেন্তিনা। ম্যাচের অধিকাংশ সময় নিজেদের স্বাভাবিক ট্রানজিশন ফুটবল খেলতে না পারার মূল্যই শেষ পর্যন্ত দিতে হয়েছে স্কালোনির দলকে।
ফাইনালের শেষ বাঁশি প্রমাণ করে দিল, এই জয় শুধু একটি ট্রফি জেতার গল্প নয়। এটি ছিল দে লা ফুয়েন্তের কৌশল, রদ্রির নেতৃত্বে মাঝমাঠের দখল, সংগঠিত প্রেসিং এবং গোটা টুর্নামেন্ট জুড়ে অনুসরণ করা স্প্যানিশ ফুটবল দর্শনের সার্থক পরিণতি।
Leave a Comment