একের পর এক ভারতীয় ক্রিকেটারের চোট। শ্রীলঙ্কা সফরের 6 ঘোষণার সময় দলে ছিলেন জসপ্রীত বুমরা এবং সাই সুদর্শন। দু’জনের নামের পাশে ছিল ‘ফিটনেস সাপেক্ষে’ শর্ত। শেষ পর্যন্ত কেউই শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে খেলতে পারছেন না। প্রশ্ন উঠেছে বিসিসিআইয়ের সেন্টার অফ এক্সেলেন্স (সিওই)-এর চোট সামলানোর পদ্ধতি নিয়ে। সেই সমালোচনার জবাব দিলেন সিওই-র প্রধান ভিভিএস ল্যক্সমণ।
লক্ষ্মণের স্পষ্ট বক্তব্য, চোটের জন্য কাউকে ‘দোষী’ খোঁজা ঠিক নয়। তিনি বলেন, ‘সিওই শুধু পুনর্বাসন কেন্দ্র নয়। ক্রিকেটারদের উৎকর্ষে সাহায্য করার জন্য এর চেয়ে আরও বড় ভূমিকা রয়েছে। তাই চোটের জন্য আমরা ‘দোষ’ শব্দটি ব্যবহার করতে চাই না। কারণ, ওই শব্দ ব্যবহার করলেই কাউকে বলির পাঁঠা বানানো হয়’।
বুমরাহ এবং সুদর্শনের চোট ঘিরে সিওই, নির্বাচক এবং টিম ম্যানেজমেন্টের মধ্যে যোগাযোগের অভাব রয়েছে—এমন অভিযোগও উঠেছিল। তা উড়িয়ে দিয়ে লক্ষ্মণ বলেন, ‘দুই দলের (পুরুষ ও মহিলা) টিম ম্যানেজমেন্ট, দুই দলের স্পোর্টস সায়েন্স অ্যান্ড মেডিসিন (এসএসএম) কর্মী এবং সিওই-র মধ্যে দারুণ সমন্বয় রয়েছে। যোগাযোগও খুব মসৃণ ভাবে হচ্ছে।’
তাহলে বুমরা ও সুদর্শনকে পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই কেন দলে নেওয়া হল? লক্ষ্মণের ব্যাখ্যা, তাঁদের নামের পাশে যে চিহ্ন ছিল, সেটিই আসল কথা। তিনি বলেন, ‘বুমরা এবং সুদর্শনের নামের পাশে সব সময়ই একটি চিহ্ন ছিল। আপনারা জানেন, বিসিসিআইয়ের দল ঘোষণায় কোনও ক্রিকেটারের নামের পাশে অ্যাসটেরিস্ক থাকলে তার অর্থ হল—ফিটনেস সাপেক্ষে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বুমরা এবং সুদর্শনকে শ্রীলঙ্কার জন্য ফিটনেস সাপেক্ষে দলে নেওয়া হয়েছিল। আমরা তাঁদের মূল্যায়ন করি, এক ধাপ থেকে পরের ধাপে নিয়ে যাই। যদি তাঁদের উন্নতি ধীর হয়, তা হলে নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যান এবং প্রধান কোচকে জানানো হয়। সেটাই মসৃণ ভাবে হচ্ছে। তাঁরাও বুঝতে পারেন যে আন্তর্জাতিক সিরিজে খেলার মতো অবস্থায় তাঁরা এখনও পৌঁছননি।’
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, চোট সারতে যে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়, তা কি ঠিক ভাবে মানা হচ্ছে? এখানেই লক্ষ্মণের সাফ জবাব—মানুষের শরীরকে ঘড়ির কাঁটার মতো চালানো যায় না। তাঁর কথায়, ‘এখানে একটা বিষয় বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে নির্দেশিকা এবং সময়সীমা দেওয়া হয়, তা প্রত্যাশার ভিত্তিতে দেওয়া হয়। কিন্তু এটা মানুষের শরীর। এটা কোনও যন্ত্র নয় যে সব সময় নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই সব কিছু হয়ে যাবে।’
লক্ষ্মণ ব্যাখ্যা করেন, চোট সারার প্রক্রিয়া আসলে নির্দিষ্ট সময়ের নয়, ধাপে ধাপে এগোনোর। তিনি বলেন, ‘একজন ক্রিকেটার কী ভাবে এগোচ্ছে, তা ক্রমাগত বোঝার প্রক্রিয়া চলে। সেই অনুযায়ী তাঁর উপর কাজের চাপ বাড়ানো হয়। চোট ধরা পড়ার সময় থেকে তিনি সিওই ছেড়ে ফিট ঘোষিত হওয়া পর্যন্ত এটাই প্রক্রিয়া।’
বুমরাহর ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওয়ান ডে সিরিজে চোট পাওয়ার পর তাঁকে শ্রীলঙ্কা সফরের দলে রাখা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাঁটুর সমস্যার কারণে তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তাঁর জায়গায় দলে ঢুকেছেন আউকিব নবি। অন্য দিকে, ‘এ’ দলের হয়ে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে খেলার সময় চোট পাওয়া সুদর্শনও ফিট হতে পারেননি।
লক্ষ্মণ আরও জানান, সিওই-র কাজ শুধু চোট সারানো নয়। ‘যখন কোনও পরিবেশে কোনও ক্রিকেটার চোট পান, ভারতীয় দলের ফিজিও প্রথমে চোটের ধরন বোঝেন। তার পরে আমাদের বিশেষজ্ঞ এবং চিকিৎসকদের সাহায্য নেওয়া হয়।’
তিনি বলেন, ‘রোগ নির্ণয়ের পরে সেই ক্রিকেটারকে ভারতীয় দলের এসএসএম কর্মীদের মাধ্যমে সিওই-তে পাঠানো হয়। এখানে আসার পর প্রথমে এসএসএম দল তাঁকে ক্লিনিক্যালি পরীক্ষা করে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে তাঁর সুস্থ হয়ে দলে ফেরার পরিকল্পনা তৈরি হয়।’
এর পরের ধাপ নিয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন লক্ষ্মণ। তাঁর কথায়, ‘পরের ধাপে যাওয়ার জন্য ক্রিকেটার প্রস্তুত হলে শক্তি ও কন্ডিশনিংয়ের কাজ শুরু হয়। তার পরে ধীরে ধীরে স্কিলের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়, কাজের চাপ বাড়ানো হয় এবং ফিট ঘোষণা করার আগে দু’টি রিটার্ন-টু-প্লে ম্যাচ খেলানো হয়।’
কেন এত ধাপ? লক্ষ্মণের ব্যাখ্যা, ক্রিকেটার যেন দলে ফেরার পর প্রথম ম্যাচ থেকেই নিজের সেরা ক্রিকেট খেলতে পারেন। তিনি বলেন, ‘পুরুষ বা মহিলা ভারতীয় দলে, কিংবা রাজ্য দল বা অন্য যে দলেই সে ফিরে যাক না কেন, তাকে পুরোপুরি প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রথম ম্যাচ থেকেই যেন নিজের সেরা ক্ষমতা অনুযায়ী খেলতে পারে, সেটাই লক্ষ্য।’
একের পর এক ক্রিকেটার চোট পাওয়াটা আদৌ উদ্বেগের বিষয় কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছিল। লক্ষ্মণ অবশ্য বলছেন, এই পর্যায়ের খেলায় চোটের ঝুঁকি থাকবেই। তাঁর কথায়, ‘আমার মনে হয় না এটা উদ্বেগের কারণ। তবে অবশ্যই, যখন কেউ সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলছে, তখন তাকে ১০০ শতাংশেরও বেশি দিতে হয়।’
বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সইকিয়াও ব্যাখ্যা করেছেন, কেন চোট থাকা সত্ত্বেও বুমরাহ বা সুদর্শনের মতো ক্রিকেটারদের দলে রাখা হয়। তাঁর বক্তব্য, দল নির্বাচন সাধারণত সফরের তিন-চার সপ্তাহ আগে হয়। তাই সেই সময়ে কোনও ক্রিকেটারের ২১ বা ২৮ দিন পরের ফিটনেস নিশ্চিত ভাবে জানা সম্ভব নয়।
সইকিয়া বলেন, ‘তিন বা চার সপ্তাহ আগে আমরা ক্রিকেটারের সঠিক অবস্থাটা জানি না। তাই ‘ফিটনেস সাপেক্ষে’ বলা হয়, কারণ সেই ক্রিকেটার তখন পুনর্বাসন কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে। যদি ২১ বা ২৮ দিনের মধ্যে সে ফিট হয়ে যায়, তা হলে তাকে দলে নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু নির্বাচনের দিন সে ফিট নয় বলে আমরা তাকে সরাসরি বাতিল করি না। কারণ, যখন সত্যিই সফরে যাওয়া বা ম্যাচ খেলার প্রয়োজন হবে, তখন সে পুরোপুরি ফিট হয়ে যেতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে আমরা সব সময় ‘ফিটনেস সাপেক্ষে’ রাখি। আমরা ক্রিকেটারকেও সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করতে চাই না।’
শেষে সইকিয়ার কথাতেও লক্ষ্মণের বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি। বলেন, ‘২১ দিনের মধ্যে সে ফিট হবে কি না, তা কেউ আগে থেকে বলতে পারে না। ভিভিএস ঠিকই বলেছেন—এটা মানুষের শরীর, যন্ত্র নয়। কারও পুরোপুরি সুস্থ হতে ১৪ দিন লাগতে পারে, আবার কারও ২৮ দিনও লাগতে পারে। সেটা নির্ভর করে তাঁর নিজের শরীরের গঠনের উপর।’
বুমরাহ, সুদর্শন, হর্ষিত রানা, নীতীশ কুমার রেড্ডি, ওয়াশিংটন সুন্দর, হার্দিক পাণ্ড্যদের চোটের মধ্যে সিওই-কে ঘিরে যখন প্রশ্ন বাড়ছে, তখন লক্ষ্মণের বার্তা স্পষ্ট—ফিটনেসের সময়সীমা কাগজে লেখা যেতে পারে, কিন্তু শরীরকে সেই ঘড়ি মেনে চলতে বাধ্য করা যায় না।
Leave a Comment