দিল্লির ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট। রাজধানীর দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে যানবাহনের ধোঁয়াকেই চিহ্নিত করেছে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ। আদালতের পর্যবেক্ষণ, প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া দিল্লির বাতাসকে ক্রমশ বিষিয়ে তুলছে। বাতাসের গুণগত মানের সূচক (একিউআই) ৪০০-র কাছাকাছি। শুক্রবার দিল্লির একিউআই ছিল ৩৯১, যা কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নিরিখে অত্যন্ত খারাপ শ্রেণিভুক্ত।
দূষণ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইনি কাঠামো পর্যালোচনার জন্য সুপ্রিম কোর্টের স্বতঃপ্রণোদিত মামলার শুনানি চলছিল। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ এদিন রাজধানীর দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। শুনানিতে প্রধান বিচারপতির বলেন, ‘আমরা আলোচনা করে চলেছি, কখনও মন্তব্য করছি, কখনও পরামর্শ দিচ্ছি।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হল, একিউআই ইতিমধ্যেই ৪০০ ছুঁইছুঁই।‘ এর পরেই যানবাহনের দূষণ নিয়ে সরব হন তিনি। দিল্লির বিভিন্ন রাস্তা এবং রাজধানী সংলগ্ন সংযোগকারী সড়কগুলিতে কী ধরনের যানবাহন চলাচল করছে, তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দেন প্রধান বিচারপতি। তাঁর কথায়, যানবাহনই দূষণের অন্যতম বড় সমস্যা। শুনানির সময় পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে প্রধান বিচারপতির কটাক্ষ, ‘আবহাওয়া উপভোগ করছেন নিশ্চয়ই?’
আরও পড়ুন: মধ্যরাতে দিল্লির করোলবাগে আগুন, ঘটনাস্থলে ২২টি ইঞ্জিন
আসন্ন উৎসবের মরসুমে, বিশেষ করে দীপাবলির সময় দূষণের মাত্রা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আদালত। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, দিল্লির বায়ুদূষণের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের উপর। উৎসবের মরসুম তাঁদের কাছে রোজগারের গুরুত্বপূর্ণ সময়। ফলে বিষাক্ত বাতাসের কারণে বাইরে বেরোনো ঝুঁকিপূর্ণ হলেও জীবিকার তাগিদে তাঁদের ঘরের মধ্যে থাকা সম্ভব নয়।
এদিকে, বায়ুদূষণের মাত্রা নির্দিষ্ট সীমা ছাড়ালে স্কুলপড়ুয়াদের জন্য অনলাইন ক্লাস চালুর আবেদন জানানো হয়েছে আদালতে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শ খতিয়ে দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রতি বছর শীতের শুরুতেই দিল্লির বাতাসের গুণগত মান খারাপ হয়ে যায়। উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব ও হরিয়ানার মতো প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতে ফসল কাটার পর অবশিষ্ট গোড়া পোড়ানোর ফলে তৈরি হওয়া ধোঁয়া এই দূষণের অন্যতম কারণ। তবে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, এই সমস্যার মোকাবিলায় সচেতনতা ও শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর ক্ষতিকর দিকগুলি বোঝাতে হবে। কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা গেলেই অবস্থানর উন্নতি করা সম্ভব বলে মত আদালতের।
আরও পড়ুন: ইরানে ফের বড়সড় হামলার প্রস্তুতি আমেরিকার! ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় মার্কিন সেনা, অনিশ্চিত পরমাণু আলোচনা
মামলায় কেন্দ্রের হয়ে সওয়ার করেন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ঐশ্বর্য ভাটি। তিনি দিল্লির দূষণের পাঁচটি প্রধান কারণ আদালতের সামনে তুলে ধরেন। কলকারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের নির্গমন, নির্মাণ ও ভাঙার কাজ থেকে তৈরি ধুলো, রাস্তার ধুলো এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো।
দূষণ নিয়ন্ত্রণে ইতিমধ্যেই সরকার একাধিক পদক্ষেপ করেছে বলেও আদালতকে জানানো হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু যানবাহনের চলাচলে বিধিনিষেধ এবং জিয়ো-ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান সরকারি আইনজীবী। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফসলের গোড়া পোড়ানোর ধোঁয়া দিল্লির মোট দূষণের প্রায় ১৪ শতাংশের জন্য দায়ী।
সিপিসিবি-র নির্ধারিত সূচক অনুযায়ী, একিউআই ০ থেকে ৫০ এর মধ্যে থাকলে বাতাসের মান ‘ভালো’, ৫১ থেকে ১০০ হলে ‘সন্তোষজনক’, ১০১ থেকে ২০০ হলে ‘মাঝারি’, ২০১ থেকে ৩০০ হলে ‘খারাপ’ এবং ৩০১ থেকে ৪০০ হলে ‘অত্যন্ত খারাপ’ বলে বিবেচিত হয়। সূচক ৪০১ থেকে ৫০০ হলে ‘ভয়ানক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শুক্রবার দিল্লির একিউআই ৩৯১ হওয়ায় রাজধানীর দূষণ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দেখুন:
Leave a Comment