---Advertisement---

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মেগা পরিকল্পনা | Amar Bangla BANGLADESH

By Suman Debnath

August 8, 2026 1:50 PM

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মেগা পরিকল্পনা | Amar Bangla BANGLADESH

---Advertisement---


রাজধানী ঢাকার একদিকে আধুনিক নগরায়ণের প্রতিচ্ছবি—মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে ও সুউচ্চ ভবন। অন্যদিকে শহরের বিভিন্ন সড়ক, ফুটপাত ও বর্জ্য সংগ্রহস্থলে জমে থাকা আবর্জনা নগরজীবনের বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের শুরুতে পরিচ্ছন্ন দেখালেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে প্লাস্টিক, পচা বর্জ্য ও দুর্গন্ধ।


প্রায় দুই কোটি মানুষের এই মহানগরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তাই শুধু পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও নগরবাসীর জীবনমানের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।


এই পরিস্থিতি বদলাতে এবার বর্জ্যকে বোঝা হিসেবে না দেখে সম্পদে রূপান্তরের বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি নতুন একটি মডেলে বর্জ্য না পুড়িয়ে বিদ্যুৎ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।


বর্জ্য থেকে তৈরি হবে একাধিক পণ্য


ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) মাতুয়াইলে এমন একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে প্রতিদিনের বিপুল পরিমাণ বর্জ্যকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন সম্পদে রূপান্তর করা হবে।


পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে মিথেন গ্যাস, বিদ্যুৎ, জৈব সার, পশুখাদ্য, তেল, শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী কার্বন, সলিড রিকভারড ফুয়েল (এসআরএফ) এবং ইকো-ব্রিকস উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।


অর্থাৎ এতদিন যে বর্জ্য শহরের জন্য দুর্গন্ধ, দূষণ ও জনদুর্ভোগের কারণ ছিল, সেটিই ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ ও শিল্পের কাঁচামালে পরিণত হতে পারে।


আমিনবাজার ও মাতুয়াইলে দুই ধরনের উদ্যোগ


রাজধানীর বর্জ্য সংকট মোকাবিলায় আমিনবাজার ও মাতুয়াইলে দুটি বড় প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই প্রকল্পের প্রযুক্তিগত পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।


ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রকল্পের লক্ষ্য মূলত ‘ওয়েস্ট টু এনার্জি’ বা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এর একটি অংশে বর্জ্য পোড়ানোর প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।


অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রকল্পে বর্জ্য না পুড়িয়ে তা থেকে বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


এই দুই মডেল নিয়ে পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বর্জ্য পোড়ানোর ক্ষেত্রে পরিবেশগত ঝুঁকি কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


বর্জ্য পোড়ানোর প্রকল্প নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগ


বাংলাদেশের নগর বর্জ্যের বড় অংশই ভেজা ও জৈব পদার্থ। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট বর্জ্যের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পচনশীল বা ভেজা জৈব বর্জ্য হতে পারে।


এ ধরনের বর্জ্যের তাপ উৎপাদন ক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ায় সরাসরি পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাড়তি জ্বালানির প্রয়োজন হতে পারে।


আরও বড় উদ্বেগ তৈরি হয় প্লাস্টিক ও রাসায়নিকযুক্ত বর্জ্য পোড়ানোর ক্ষেত্রে। যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও উন্নত প্রযুক্তি ছাড়া এ ধরনের বর্জ্য পোড়ানো হলে ডাইঅক্সিন ও ফিউরানের মতো ক্ষতিকর পদার্থ নির্গমনের আশঙ্কা থাকে।

আরও পড়ুন:  গ্যাস সংকটে চট্টগ্রামে দুর্ভোগ | Amar Bangla BANGLADESH


ফলে বর্জ্যের স্তূপ কমলেও পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নতুন ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে পরিবেশবিদদের মধ্যে।


দক্ষিণ ঢাকার প্রকল্পে বর্জ্য না পুড়িয়ে সম্পদ তৈরির পরিকল্পনা


ডিএসসিসির পরিকল্পনাটি এ জায়গায় আলাদা। সিটি করপোরেশনের প্রতিদিনের প্রায় ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টন বর্জ্যকে সরাসরি পুড়িয়ে ফেলার পরিবর্তে বিভিন্ন ধাপে প্রক্রিয়াজাত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।


প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা।


পরিকল্পনার মূল দর্শন হলো—বর্জ্যের যতটা সম্ভব অংশ পুনর্ব্যবহার করে অর্থনৈতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা।


দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের নকশা অনুযায়ী, ক্ষতিকর ধোঁয়া সৃষ্টি না করে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় বর্জ্য থেকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।


বছরে ১৫ হাজার টন মিথেন গ্যাস


প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে সংগৃহীত বর্জ্য থেকে বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন মিথেন গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।


এই গ্যাস ব্যবহার করে বছরে প্রায় ৮১ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। দৈনিক হিসাবে উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ২২১ মেগাওয়াট-ঘণ্টা হতে পারে।


শুধু বিদ্যুৎ নয়, একই প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ জৈব সার ও পশুখাদ্য তৈরির লক্ষ্যও রয়েছে।


পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদনের সম্ভাব্য পরিমাণের মধ্যে রয়েছে—


প্রায় ৪১০ টন পরিবেশবান্ধব জৈব সার

প্রায় ২০ টন বিএসএফ প্রোটিন, যা পোলট্রি ও ফিশ ফিডে ব্যবহারযোগ্য

প্রায় ১১ দশমিক ৫২ টন বিএসএফ তেল, যা কসমেটিক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে

প্রায় ৪৭ হাজার ৭৭৫ লিটার পাইরোলাইসিস তেল

প্রায় ৭ দশমিক ৩৫ টন পাইরোলাইসিস ব্ল্যাক কার্বন

প্রায় ২৫৫ টন সলিড রিকভারড ফুয়েল বা এসআরএফ

প্রায় ১২৮ টন ইকো-ব্রিকস


এভাবে একই বর্জ্য থেকে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, সার, পশুখাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।


১৫ বছরের প্রকল্প, বিদেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা


স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির মাঠপর্যায়ের কাজ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। উৎপাদন কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য রাখা হয়েছে আগামী জানুয়ারি থেকে।


প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ১৫ বছর। চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী, জমি সরবরাহ ছাড়া ডিএসসিসির বড় ধরনের সরাসরি আর্থিক বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না। প্রকল্পের মূল বিনিয়োগ আসবে বিদেশি উৎস থেকে।


রাজস্ব আয়ের দিক থেকেও প্রকল্পটি সিটি করপোরেশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি থেকে অর্জিত মোট লভ্যাংশের ২০ শতাংশ ডিএসসিসি পাবে। পাশাপাশি জায়গা ব্যবহারের জন্য প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা ভাড়া পাওয়ার কথাও রয়েছে।

আরও পড়ুন:  এমপি নজরুলকে ঘিরে নতুন ভিডিও


৪৫ একর জমিতে বাস্তবায়নের উদ্যোগ


প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ৪৫ একর জমি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ১০ একর জমি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে।


মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।


তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আরও আলোচনা প্রয়োজন বলে জানা গেছে।


চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দক্ষিণ সিটি


ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালামের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের আগেই দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রকল্পটি নিয়ে এমওইউ করা হয়েছিল।


তবে এখনো প্রকল্পের সব বিষয় চূড়ান্ত হয়নি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও প্রক্রিয়াটির সঙ্গে যুক্ত থাকায় সিটি করপোরেশন ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বৈঠকের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।


পুরোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন ভাবনা


ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে মূল সমস্যা ছিল সংগ্রহ, পরিবহন, স্থানান্তর ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। রাজধানীতে ২০১৬ সাল থেকে দুই সিটি করপোরেশন মিলে শতাধিক সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন বা এসটিএস নির্মাণ করেছে। এর ফলে রাস্তার পাশে উন্মুক্ত ডাস্টবিন ও বড় কনটেইনারের ব্যবহার অনেকটা কমেছে।


তবে জায়গার সংকট, অপরিকল্পিত অবস্থান এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে অনেক এসটিএসই এখন আশপাশের মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠেছে। সেখান থেকে বর্জ্য ছড়িয়ে পড়া, দুর্গন্ধ এবং পরিবেশদূষনের অভিযোগও রয়েছে।


নতুন প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু এসব বর্জ্য সরিয়ে ফেলা নয়, বরং বর্জ্যকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করা।


সফল হলে বদলাতে পারে ঢাকার চেহারা


বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবেশগত নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কার্যকারিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যবস্থাপনা।


বর্জ্য পোড়ানোর প্রযুক্তি ব্যবহৃত হলে নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশগত মান কঠোরভাবে নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি বর্জ্য না পুড়িয়ে সম্পদে রূপান্তরের প্রকল্পেও প্রযুক্তির কার্যকারিতা, উৎপাদিত পণ্যের বাজার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।


ডিএসসিসির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর বিপুল পরিমাণ বর্জ্যকে আর শুধু ফেলে দেওয়ার বস্তু হিসেবে দেখতে হবে না। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সার, পশুখাদ্য ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও রূপ দেওয়া সম্ভব হতে পারে।


তবে প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, প্রযুক্তির কার্যকারিতা, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং নিয়মিত নজরদারির ওপর। পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ঢাকার দীর্ঘদিনের বর্জ্য সংকট থেকে একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে—যেখানে নগরের আবর্জনাই হয়ে উঠবে বিদ্যুৎ ও সম্পদের উৎস।


আমার বাঙলা/ রাব্বি

---Advertisement---

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment