ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যেই ভয়াবহ দাবানলে বিপর্যস্ত স্পেন (Spain) ও ফ্রান্স (France)। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনে বনভূমি থেকে জনপদ—সবই গ্রাস করছে আগুনের লেলিহান শিখা। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে স্পেনে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জাতীয় স্তরে ‘ওয়াইল্ডফায়ার এমার্জেন্সি’ ঘোষণা করা হয়েছে। দুই দেশ মিলিয়ে প্রায় ২.৮ লক্ষ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে।
ইউরোপের একাধিক দেশে চলা অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং প্রবল বাতাস দাবানলকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে সেনা, দমকল, বিমান বাহিনী ও উদ্ধারকারী দল একযোগে কাজ করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (European Union)-এর কাছেও সহায়তা চেয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলি।
স্পেনে রাজধানী মাদ্রিদ (Madrid)-এর আশপাশে একাধিক দাবানল একত্রিত হয়ে বিশাল অগ্নিকাণ্ডের রূপ নিয়েছে। এর জেরে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে ওয়াইল্ডফায়ার এমার্জেন্সি জারি করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। দেশজুড়ে প্রায় ৬৩ হাজার থেকে ৭০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ২,৬০০-রও বেশি জরুরি পরিষেবা কর্মী নিরলসভাবে কাজ করছেন। ইতালি, গ্রিস, পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডস-সহ একাধিক ইউরোপীয় দেশও অগ্নিনির্বাপক বিমান পাঠিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে।
ফ্রান্সেও পরিস্থিতি কম উদ্বেগজনক নয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বোর্দো (Bordeaux) সংলগ্ন গিরন্দ (Gironde) এবং লঁদ (Landes) অঞ্চলে দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ফরাসি প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র ফ্রান্সেই প্রায় ১.৯৭ লক্ষ মানুষকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। বহু এলাকায় আগাম সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ জারি হয়েছে এবং ধোঁয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে লক্ষ লক্ষ ফেস মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে।
আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি যে বহু বাসিন্দা বাড়ি ছাড়ার সময় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পর্যন্ত সঙ্গে নিতে পারেননি। কোথাও কোথাও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় মানুষকে নৌকায় করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পর্যটন কেন্দ্রও খালি করে দেওয়া হয়েছে যাতে প্রাণহানির ঝুঁকি কমানো যায়।
শনিবারের সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী, ফ্রান্স ও স্পেন মিলিয়ে ২.৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ সরাসরি এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ফ্রান্সে প্রায় ১.৬৭ লক্ষ এবং স্পেনে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
দাবানলের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ বনভূমি। চলতি বছরে স্পেনে ইতিমধ্যেই ১.৩ লক্ষ হেক্টরের বেশি বনাঞ্চল আগুনে ধ্বংস হয়েছে। ফ্রান্সেও প্রায় ৯৮ হাজার হেক্টর এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান গত দুই দশকের গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় কমিশনের যৌথ গবেষণা কেন্দ্র (Joint Research Centre – JRC)।
পরিবেশবিদ ও আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, বৃষ্টির ঘাটতি এবং শুষ্ক আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এর ফলে বনভূমিতে আগুন লাগার ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনই একবার আগুন লাগলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ ইউরোপে এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা আগামী দিনেও আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে।
যদিও কিছু এলাকায় আবহাওয়ার সামান্য উন্নতি হয়েছে, তবুও আগুন এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। উদ্ধারকারী সংস্থাগুলির আশঙ্কা, আবার যদি দমকা হাওয়ার গতি বাড়ে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই ফ্রান্স ও স্পেন—দুই দেশের প্রশাসনই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত না করার এবং সরকারি নির্দেশ কঠোরভাবে মেনে চলার আবেদন জানিয়েছে।
Leave a Comment