নয়াদিল্লি/চেন্নাই: দেশের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে এবার সরাসরি প্রশ্নের মুখে কেন্দ্র। তামিলনাড়ুর কুডনকুল পরমাণু কেন্দ্রের খুঁটিনাটি তথ্য, নীল নকশা থেকে শুরু করে সরবরাহকারী সংস্থার তালিকা— সমস্তই ডার্ক ওয়েবে ফাঁস করে দিয়েছে র্যানসমওয়্যার গ্রুপ ‘ওয়ার্ল্ড লিকস’। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অনিল আম্বানির রিলায়্যান্স গ্রুপের সাইবার হানার জেরে এই ১৯ হাজার স্পর্শকাতর ফাইল বেহাত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রের ভেন্টিলেশন, কুলিং সিস্টেমের নকশা ও সন্ত্রাস হামলার বিমা-দলিলও। ভারতের পরমাণু নিরাপত্তায় এত বড় ফাটল আগে কখনও ধরা পড়েনি বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
রয়টার্সের হাতে আসা ফাঁস হওয়া ফাইলগুলি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, কিছু নথি ২০১৬ সালের এবং কিছু ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের। সবগুলি আদৌ আসল কি না তা এখনও নিশ্চিত নয়, তবে ফাইলগুলিতে যা রয়েছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। ইন্সপেকশন রেকর্ড, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের বিন্যাস, অনুমোদিত সরবরাহকারীদের নাম, এমনকি ২০২৪ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের তথ্যও হাতছাড়া হয়েছে। রিলায়্যান্স গ্রুপের মোট ৮ লক্ষ ৫৮ হাজার ফাইল ফাঁসের ঘটনায় এই ১৯ হাজার ফাইল ভারতের পরমাণু গবেষণা সংক্রান্ত বলে দাবি করেছে ওয়ার্ল্ড লিকস।
যদিও পুরো ঘটনাটিকে ‘আংশিক তথ্যফাঁস’ বলে উল্লেখ করেছে রিলায়্যান্স গ্রুপ। তাদের দাবি, থার্ড-পার্টি ডেটা সেন্টার পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা ‘ইয়োটা’র মাধ্যমেই এই তথ্য বেহাত হয়েছে। ইয়োটা জানিয়েছে, গত ২৯ মে রিলায়্যান্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের একটি সন্দেহজনক সার্ভারে গতিবিধি ধরা পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে আটকে দেওয়া হলেও জুনের শেষে এসে রিলায়্যান্স জানায়, বাইরে থেকে হানা সফলই হয়েছে। এখনও পর্যন্ত হানাদারকে শনাক্ত করা যায়নি, যৌথ তদন্ত শুরু হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে কুডনকুল কেন্দ্রের ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটের নকশা ও পরিকাঠামো নির্মাণের বরাত পায় রিলায়্যান্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার। নির্মীয়মান এই দুটি ইউনিট থেকে ২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, ২০২৭ সালের মধ্যে যা চালু হওয়ার কথা। এই ঘটনায় নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের সিনিয়র ডিরেক্টর নিকোলাস রথ সাফ জানিয়েছেন, এই তথ্যফাঁস পরমাণু কেন্দ্রটির বিপদ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিটি দেশের সরকারেরই এমন স্পর্শকাতর জায়গায় সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে অনেক বেশি সতর্ক হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ওয়ার্ল্ড লিকস এর আগেও নাইকি, টাটা গ্রুপের মতো সংস্থায় হানা দিয়েছে। গত জুনেই টাটা গ্রুপের কাছ থেকে অ্যাপল ও টেসলার নকশা সংক্রান্ত গোপন তথ্য হাতিয়ে ১.৫ মিলিয়ন ডলার দাবি করেছিল তারা। সেই নিয়মে কিছু তথ্য প্রকাশ করে দেওয়া হলেও বাকি তথ্য রেখে দেওয়া হয় ব্ল্যাকমেল করে মোটা টাকা আদায়ের জন্য। বিশেষ ব্রাউজার ছাড়া ওই ওয়েবসাইটে সাধারণ মানুষের পৌঁছনো সম্ভব নয়। ভারতের মূল সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ইন্ডিয়ান কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম ঘটনা খতিয়ে দেখছে, যদিও সরকারিভাবে এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
ফলে দেওয়া নথি ঘেঁটে রয়টার্স জানিয়েছে, পরমাণু কেন্দ্রের মূল সিস্টেমের ফাইল এতে নেই যা রাশিয়ার সরকারি সংস্থা রোসাটম সরবরাহ করে। তবে ‘কমন কন্ট্রোল রুম’-এর ফ্লোর লেআউট, ভেন্টিলেশন ও কুলিং সিস্টেমের নীলনকশা এবং সরঞ্জামের ছবি ফাঁস হয়েছে। পাশাপাশি রিলায়্যান্স ও নিউক্লিয়ার কর্পোরেশনের যৌথ বিমার একটি নথি বলছে, ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটে বড় কোনও দুর্ঘটনা বা সন্ত্রাস হামলা হলে ১১২ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ মিলবে।
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্ত একটি গ্রুপ কুডনকুল কেন্দ্রের প্রশাসনিক নেটওয়ার্কে হানা দিয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। তখন কেন্দ্রীয় সংস্থার দাবি ছিল, তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি। সাইবার সুরক্ষা সংস্থা সার্ফশার্ক জানাচ্ছে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সাইবার হানার শিকার দেশের তালিকায় ভারত তৃতীয় স্থানে। গত বছরই ২.৮৯ কোটি অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে। দেশের ২০৪টি সংস্থায় সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৭৩ শতাংশ জানে না তারা কখনও সাইবার হানার শিকার হয়েছে কি না, ৫৭ শতাংশের প্রয়োজনীয় প্রতিরোধী ব্যবস্থাই নেই। এই প্রেক্ষাপটে পরমাণু তথ্যফাঁস ভারতের সাইবার নিরাপত্তার বিশাল ফাঁকফোকরকেই ফের উস্কে দিল।
Leave a Comment