যশপাল সিং, ত্রিপুরা, ১৯ ডিসেম্বর, শুক্রবার: ত্রিপুরা রাজ্যের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে অবাধে গাঁজা চাষ চললেও তা রুখতে বন দপ্তরের কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা না থাকায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বাঁধছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বন দপ্তরের সংরক্ষিত এলাকাতেই গাঁজা চাষ আজ কার্যত একটি ‘কুটিরশিল্পে’ পরিণত হয়েছে। গাছ প্রতি কমিশন থেকে শুরু করে বড়–ছোট বহু প্রভাবশালী মহল এই অবৈধ গাঁজা অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত—এমন অভিযোগ উঠছে জনগণের পক্ষ থেকে।
পরিসংখ্যানই এই অভিযোগকে আরও জোরালো করছে। ২০২৫ সালে শুধুমাত্র পুলিশ প্রশাসন রাজ্যজুড়ে আনুমানিক ১৬,৩০০ কেজিরও বেশি গাঁজা উদ্ধার করেছে এবং ৪৫ হেক্টরের বেশি জমিতে গাঁজা খেত ধ্বংস করেছে। এর মধ্যে দক্ষিণ ত্রিপুরা ও উনকোটি জেলায় সবচেয়ে বেশি গাঁজা চাষ ধ্বংস হয়েছে বলে তথ্য মিলেছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যেই প্রায় ১৫ হেক্টর গাঁজা খেত নষ্ট করা হয়। জনগণের প্রশ্ন—যদি বনভূমি কার্যত গাঁজায় ভরে ওঠে, তবে বন দপ্তরের নজরদারি ও দায়িত্ব কোথায়?
সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, বন দপ্তরের অধীনস্থ এলাকায় বছরের পর বছর ধরে অবৈধ গাঁজা চাষ চললেও দপ্তরের পক্ষ থেকে তেমন কোনও কঠোর ও ধারাবাহিক উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। ২০২৫ সালে ৪০০-রও বেশি ব্যক্তি এই চাষের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ধরা পড়লেও গাঁজা চাষ বন্ধ হয়নি। উল্টো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বনাঞ্চলে গাঁজা খেত ধ্বংসের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে পুলিশ প্রশাসনকেই। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই পুলিশকে প্রায় ১২ হেক্টর গাঁজা খেত নষ্ট করতে হয়েছে, যা প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবকেই স্পষ্ট করে তুলছে।
জনগণের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে বনভূমিকে ব্যবহার করে এই অবৈধ চাষ চালানো হচ্ছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, ধ্বংস হওয়া গাঁজার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই বিপুল অঙ্ক থেকেই বোঝা যায়, গাঁজা চাষের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় অংশের মানুষ দ্রুত আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। অথচ বন দপ্তর যদি শুরু থেকেই সক্রিয় নজরদারি ও কঠোর পদক্ষেপ নিত, তাহলে এই পরিস্থিতি অনেক আগেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব ছিল বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
বিশেষ করে, উপজাতি জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নের কথা বলা রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হয়েও বনমন্ত্রী হিসেবে অনিমেষ দেববর্মার নীরব ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ। তাঁদের অভিযোগ, বনাঞ্চলে অবৈধ গাঁজা চাষের বিরুদ্ধে বন দপ্তর ও মন্ত্রীর পক্ষ থেকে কার্যকর অবস্থান না নেওয়ায় সমস্যাটি দিন দিন আরও ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। পুলিশের একক অভিযানে বিষয়টি সামাল দেওয়া সম্ভব নয় বলেই মত জনসাধারণের।
সব মিলিয়ে, রাজ্যের বনাঞ্চলে অবাধ গাঁজা চাষ, বন দপ্তরের ভূমিকা এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নিয়ে জনমনে গভীর অসন্তোষ ও প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। জনগণের স্পষ্ট দাবি—বন দপ্তরকে অবিলম্বে সক্রিয় হতে হবে, পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে এবং বনভূমিকে অবৈধ নেশা চাষের কবল থেকে মুক্ত করতে স্থায়ী ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
Leave a Comment