একসময় প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল চন্ডির বান। ঘন সবুজ অরণ্য, শান্ত হ্রদ এবং মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য পরিচিত এই পর্যটন কেন্দ্র বহু বছর ধরে দর্শনার্থীদের মন জয় করে এসেছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে সেই পুরনো জৌলুস। বর্তমানে অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চন্ডির বানের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে পর্যটকরাও।
বাম আমলে ধাপে ধাপে গড়ে তোলা হয়েছিল এই পর্যটন কেন্দ্র। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে পর্যটন অবকাঠামোর সমন্বয়ে এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি প্রতিবেশী রাজ্য থেকেও বহু মানুষ এখানে বেড়াতে আসতেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে অবকাশ যাপনের জন্য এটি ছিল একটি আদর্শ স্থান। বিশেষ করে সপ্তাহান্তে পর্যটকদের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠত গোটা এলাকা।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করে। সরকার পরিবর্তনের পর এলাকাবাসীর মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, নতুন সরকার চন্ডির বানের উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেবে এবং পর্যটন কেন্দ্রটিকে আরও আধুনিক রূপে গড়ে তুলবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলেই অভিযোগ স্থানীয়দের।
এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পর্যটন কেন্দ্রটির রক্ষণাবেক্ষণ কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে। হ্রদের চারপাশে আগাছা, ভাঙাচোরা অবকাঠামো এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ পর্যটকদের কাছে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। একসময় যেখানে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকত এলাকা, সেখানে এখন অনেক সময় নির্জনতার চিত্র চোখে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী প্রতিমা ভৌমিক এবং ধনপুরের বিধায়ক বিন্দু দেবনাথের কাছ থেকে উন্নয়নের প্রত্যাশা থাকলেও এখনও পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনও বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। যদিও বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে উন্নয়নের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তবে বাস্তব ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন খুব একটা চোখে পড়ছে না বলে মত এলাকাবাসীর।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরি এবং অর্থমন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহ রায়ও এই পর্যটন কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। তবে সেই সফরের পরও চন্ডির বানের অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের। বরং অবহেলা ও পরিচর্যার অভাবে পর্যটন কেন্দ্রটির সৌন্দর্য দিন দিন ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক পর্যটকও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, চন্ডির বানের প্রাকৃতিক সম্ভাবনা এখনও রয়েছে, কিন্তু যথাযথ পরিচর্যা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অনেক দর্শনার্থী জানান, পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে যেসব মৌলিক সুবিধা থাকা উচিত, তার অনেক কিছুরই অভাব রয়েছে। ফলে এখানে এসে প্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা না পাওয়ায় হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে।
এদিকে এক সাধারণ নাগরিক মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, রাজ্যের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই পর্যটন কেন্দ্রকে রক্ষা করতে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তার মতে, চন্ডির বান শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি এলাকার ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতীক। যথাযথ পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এটিকে আবারও রাজ্যের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করা সম্ভব।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশা, প্রশাসন ও পর্যটন দপ্তর দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে চন্ডির বানের সংস্কার, সৌন্দর্যায়ন এবং আধুনিকীকরণের কাজ শুরু করবে। তাহলে একসময়ের জনপ্রিয় এই পর্যটন কেন্দ্র আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে এলাকার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
Leave a Comment