গাড়ির তেল বানাতে চলে যাচ্ছে বাচ্চা-মুরগির খাবার! কালীপুজো কাটতেই ডিম ও চিকেনের দাম ৩০% বাড়ার আশঙ্কা

By Suman Debnath

November 6, 2026 8:05 PM

গাড়ির তেল বানাতে চলে যাচ্ছে বাচ্চা-মুরগির খাবার! কালীপুজো কাটতেই ডিম ও চিকেনের দাম ৩০% বাড়ার আশঙ্কা


কালীপুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই বাঙালির রবিবারের পাত থেকে উবে যেতে পারে প্রিয় চিকেন ও ডিমের ঝোল। আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই মুরগির মাংস ও ডিমের দাম অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে বাজারে যে ডিম আপনি ৭ থেকে ৮ টাকায় কিনছেন, তা ৯ বা ১০ টাকায় পৌঁছতে পারে। আর ২৫০ টাকা কেজির চিকেন ছুঁতে পারে ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা। কিন্তু এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা স্রেফ জোগান ঘাটতি নয়, আসল ভিলেন হল গাড়ির জ্বালানি। অর্থাৎ পরিবেশবান্ধব তেল মানে ইথানল তৈরির জন্য ভুট্টার যথেচ্ছ ব্যবহারই সর্বনাশের মূলে।

ইথানল তৈরির দাপটে মাথায় হাত পোল্ট্রির

নজিরবিহীন এই পরিস্থিতির জন্য পোল্ট্রি শিল্পের কর্তারা সরাসরি আঙুল তুলছেন কেন্দ্রের ইথানল নীতির দিকে। তাঁদের দাবি, বর্তমান সংকটের প্রধান এবং আসল কারণ ইথানল। গাড়ির দূষণ কমাতে ও খনিজ তেলের আমদানি হ্রাস করতে পেট্রলে ২০ শতাংশ ইথানল বা জৈব জ্বালানি মেশাচ্ছে কেন্দ্র। আর এই ইথানল তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে ভুট্টা ও ভাঙা চাল বা খুদ।

তেল উৎপাদনকারী সংস্থাগুলি ইথানল তৈরির জন্য বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ভুট্টা ও খুদ বা ভাঙা চাল চড়া দামে কিনে নিচ্ছে। সাধারণত দেশে উৎপাদিত ভুট্টার প্রায় ৬০ শতাংশই মুরগির খাবার বা পোল্ট্রি ফিড তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এখন সেই শস্যের বড় অংশই চলে যাচ্ছে ইথানল তৈরিতে। ফলে পোল্ট্রি মালিকদের সঙ্গে ইথানল উৎপাদনকারীদের কার্যত এক অদৃশ্য দড়ি-টানাটানি শুরু হয়েছে। তেল সংস্থাগুলি চড়া দাম দিয়ে ভুট্টা তুলে নেওয়ায় পোল্ট্রি ফিডের বাজারে জোগানে হাহাকার দেখা দিয়েছে এবং হু-হু করে বাড়ছে কাঁচামালের দাম।

আরও পড়ুন:  ‘কর্মই ধর্ম, উই উইল ডু ইট’, নিজের ২৫ বছরের যাত্রায় বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

ফিডের খরচে বড় ধাক্কা

পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে পোল্ট্রি ফিড তৈরির সমস্ত কাঁচামালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। গত বছর যে ভুট্টার কেজি ছিল ১৮ টাকা, আজ খোলা বাজারে তা ৩৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগেও এর দাম ছিল ২৬ থেকে ২৭ টাকা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ফড়ে ও মজুতদারদের কারসাজিতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ভুট্টার দর প্রতি কেজি ৪০ টাকা ছুঁয়ে ফেলবে।

একই অবস্থা ভাঙা চাল বা খুদের ক্ষেত্রেও। ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে যে ভাঙা চালের দর ছিল কেজি প্রতি ১৪ থেকে ১৫ টাকা, আজ তা ৩১ থেকে ৩২ টাকায় পৌঁছেছে। এক মাস আগের ২২ থেকে ২৩ টাকা দর মাত্র ৩০ দিনের ব্যবধানে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। ভুট্টা ও চালের এই অভাব মেটাতে আগে চাষিরা জোয়ার, বাজরা বা রাগির মতো বিকল্প শস্যের দিকে ঝুঁকতেন, কিন্তু বর্তমান বাজারে সেই বিকল্পগুলির দামও সাধারণের সাধ্যের বাইরে চলে গিয়েছে।

বৃষ্টির খামখেয়ালিপনা

জ্বালানি তৈরির জন্য শস্যের টানাটানির মধ্যেই বাড়তি কুপ্রভাব ফেলেছে আবহাওয়া। মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকের মতো ভুট্টা উৎপাদনকারী প্রধান রাজ্যগুলিতে এ বছর মরশুমি বৃষ্টি কম হওয়ায় খরিফ ভুট্টার ফলন প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই ঘাটতির পূর্বাভাস পেতেই সুযোগ বুঝে মাঠে নেমে পড়েছেন একদল ব্যবসায়ী ও চাষি। দাম আরও চড়ার আশায় তাঁরা ঘরে ভুট্টা মজুত করা শুরু করেছেন, যার ফলে খোলা বাজারে ঘাটতি আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। এছাড়া পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে খরিফ ধানের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কায় চালের বাজারেও একই রকম সংকট তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন:  'দেশদ্রোহী কে? আমরা তর্ক করব, বিচারক হোন মোহন ভাগবত', মোদীকে ফের খোলা বিতর্কের চ্যালেঞ্জ রাহুলের

ভরা শীতে জোগানে টান

পোল্ট্রি ফিডের দাম আকাশছোঁয়া হওয়ায় মুরগি বাঁচিয়ে রাখার দৈনিক খরচ সামলাতে পারছেন না সাধারণ খামারিরা। ফলে লোকসান কমাতে তাঁরা অনেক কম বয়সি ও কম ওজনের মুরগিই বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ভেঙ্কটেশ্বর হ্যাচারিজের জেনারেল ম্যানেজার কেজি আনন্দ জানিয়েছেন, এ বছর ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে মুরগির উৎপাদন অন্তত ২০ শতাংশের বেশি হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ চাষিরা বেশি দিন মুরগি খাইয়ে বড় করার ঝুঁকি নিতে পারছেন না।

বছরের ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাস দুটিই হল উৎসব, পিকনিক ও বড়দিনের জেরে ডিম ও চিকেন ব্যবহারের পিক সিজন বা সর্বোচ্চ চাহিদার সময়। উৎসবের ঠিক মুখেই যদি উৎপাদন কুড়ি শতাংশের বেশি কমে যায়, তবে বাজারে এর প্রভাব কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

বাঙালির ডিম-ভাত, চিকেন কষায় টান

পশ্চিমবঙ্গের মানুষের খাদ্যতালিকায় ডিম ও চিকেন প্রায় রোজকার অপরিহার্য অংশ। রাজ্যে প্রতিদিন কোটি কোটি ডিমের চাহিদা রয়েছে এবং এর একটা বড় অংশ আসে অন্ধ্রপ্রদেশ বা ওড়িশা থেকে। জাতীয় স্তরে ফিডের দাম বাড়ার কারণে ডিমের পাইকারি দর এই মুহূর্তে ৬ থেকে ৭ টাকা থাকলেও, ডিসেম্বরের মধ্যে তা প্রতি পিস ৮ থেকে ৯ টাকায় পৌঁছতে বাধ্য। অর্থাৎ, দোকানে ডিমের দাম দাঁড়াবে প্রতি পিস ১০ থেকে ১১ টাকা। একই সঙ্গে চিকেনের খুচরা দরও ৩০০ টাকার গণ্ডি পেরনোর প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। উৎসবের মরশুমে যখন মধ্যবিত্ত মানুষ একটু ভালোমন্দ খাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, ঠিক তখনই ভুট্টার ইথানল যাত্রা তাঁদের রান্নাঘরের বাজেটকে রীতিমতো ওলটপালট করে দিতে চলেছে।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment