ভারতীয় সিনেমার সেন্সরশিপ ব্যবস্থায় বড়সড় রদবদল। প্রায় ৩৫ বছর পর ছবি মুক্তির ছাড়পত্র দেওয়ার নিয়মে আমূল পরিবর্তন আনল কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র শংসাপত্র পর্ষদ (সিবিএফসি)। ১৯৯১ সালের ৬ ডিসেম্বর জারি হওয়া নির্দেশিকার বদলে কার্যকর হচ্ছে নতুন নিয়ম। মাদক, ধূমপান, যৌন হিংসা, নারী ও শিশুর উপস্থাপনা থেকে শুরু করে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, সংলাপ, এমনকি ছবির নামকরণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আরও স্পষ্ট বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে। ফলে আগামী দিনে চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে দৃশ্য নির্মাণ, সব ক্ষেত্রেই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে পরিচালক ও প্রযোজকদের। তবে একই সঙ্গে সৃজনশীল স্বাধীনতা এবং চলচ্চিত্রের শৈল্পিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার উপরেও জোর দিয়েছে কেন্দ্র।
কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের নতুন নির্দেশিকার উদ্দেশ্য, সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলচ্চিত্রের শংসাপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক করা। একদিকে দায়িত্বশীল গল্প বলার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে অকারণে শিল্পীর সৃজনশীল প্রকাশে বাধা না দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। শৈল্পিক উৎকর্ষ বজায় রেখে দর্শকদের জন্য সুস্থ বিনোদন নিশ্চিত করাই এই নতুন কাঠামোর অন্যতম লক্ষ্য।
হিংসা ও অপরাধের দৃশ্যে বাড়তি নজরদারি
নতুন নির্দেশিকায় হিংসা ও অপরাধের উপস্থাপনা নিয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কোনও ছবিতে অপরাধ, সমাজবিরোধী কার্যকলাপ কিংবা হিংসাকে মহিমান্বিত করা যাবে না। অপরাধের পদ্ধতি এমনভাবে দেখানো যাবে না, যা দর্শককে সেই কাজে উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা, ভয়াবহতা এবং হিংসাত্মক দৃশ্যের ব্যবহারেও আপত্তি রয়েছে। শুধুমাত্র দর্শককে চমকে দেওয়া কিংবা বিনোদনের উদ্দেশ্যে এমন দৃশ্য দেখানো যাবে না, যা মানুষের মধ্যে হিংসার প্রতি সংবেদনশীলতা কমিয়ে দেয়।
তবে অপরাধ বা হিংসা নিয়ে ছবি তৈরিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। কাহিনির প্রয়োজনে এমন বিষয় তুলে ধরা যাবে। কিন্তু তার পিছনে যথাযথ গল্পের প্রেক্ষাপট এবং বর্ণনাগত প্রয়োজনীয়তা থাকতে হবে।
শিশু, নারী ও পশুদের উপস্থাপনায় কড়াকড়ি
শিশুদের নিয়ে দৃশ্য নির্মাণের ক্ষেত্রেও একাধিক বিধিনিষেধ রয়েছে। অকারণে কোনও শিশুকে হিংসার শিকার হতে দেখা, অপরাধমূলক কাজে যুক্ত করা কিংবা জোর করে হিংসাত্মক ঘটনা প্রত্যক্ষ করানোর দৃশ্য এড়িয়ে চলতে হবে। শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি পশুদের উপর অপ্রয়োজনীয় অত্যাচার দেখানো যাবে না। শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের নিয়ে বিদ্রুপ কিংবা অপমানজনক দৃশ্যও গ্রহণযোগ্য হবে না।
যৌন হিংসা ও নারীর অসম্মানজনক উপস্থাপনায় নিষেধাজ্ঞা
নারীর মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি নতুন নির্দেশিকায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মহিলাদের হেয় বা অসম্মান করে, এমন দৃশ্য রাখা যাবে না। ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা কিংবা শ্লীলতাহানির মতো যৌন হিংসার দৃশ্যও যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। গল্পের প্রয়োজনে এমন ঘটনা দেখানো একান্ত জরুরি হলে দৃশ্যের পরিসর সীমিত রাখতে হবে। যৌন হিংসার গ্রাফিক বা অতিরিক্ত বিস্তারিত বিবরণ দেখানো যাবে না। তথাকথিত বিকৃত যৌন আচরণের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে।
মাদক, মদ ও ধূমপানের দৃশ্যে সতর্কবার্তা
মাদক সংক্রান্ত দৃশ্যের ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশিকায় বিশেষ সংযোজন রয়েছে। কোনও ছবিতে মাদকদ্রব্য বা সাইকোট্রপিক পদার্থের ব্যবহার, সেবন কিংবা পাচারের প্রসঙ্গ থাকলে নির্দিষ্ট বিধিবদ্ধ সতর্কবার্তা দেখাতে হবে। সেখানে উল্লেখ করতে হবে, অবৈধ মাদক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এবং কারাবাসের কারণ হতে পারে। মাদককে না বলার বার্তাও দিতে হবে।
শুধু সতর্কবার্তা দেখালেই চলবে না। মাদকাসক্তিকে উৎসাহিত করা, মাদক সেবনের পক্ষে যুক্তি দেওয়া কিংবা এই অভ্যাসকে আকর্ষণীয় করে তুলে ধরার উপরেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মদ্যপান, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ক্ষেত্রেও একই অবস্থান নিয়েছে পর্ষদ। অর্থাৎ সিনেমায় এই বিষয়গুলি একেবারে দেখানো যাবে না, এমন নয়। তবে সেগুলিকে ইতিবাচক বা অনুকরণযোগ্য অভ্যাস হিসেবে তুলে ধরা যাবে না।
সংলাপ, গান ও হাস্যরসেও নজর
নতুন নিয়মে শুধু দৃশ্য নয়, সংলাপ, গানের কথা এবং হাস্যরসের ব্যবহার নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে। অশ্লীলতা, কুরুচিকর বিষয়বস্তু কিংবা মানুষের স্বাভাবিক সংবেদনশীলতায় আঘাত করতে পারে, এমন উপস্থাপনা থেকে বিরত থাকতে হবে। দ্ব্যর্থক শব্দ ও সংলাপের ব্যবহার, যা নিম্নরুচিকে উসকে দিতে পারে, সেগুলিও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ফলে চিত্রনাট্যের পাশাপাশি গান ও কৌতুকের দৃশ্য তৈরিতেও নতুন নিয়মের প্রভাব পড়তে পারে।
ধর্মীয় ভাবাবেগ ও জাতীয় নিরাপত্তা
ধর্ম, জাতি, সম্প্রদায় এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়েও নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। কোনও ধর্মীয়, জাতিগত বা অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ কিংবা অবজ্ঞা ছড়াতে পারে, এমন দৃশ্য ও সংলাপ রাখা যাবে না। সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার, অবৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা কিংবা দেশবিরোধী মনোভাবকে উৎসাহিত করে, এমন বিষয়বস্তুও নিষিদ্ধ।
ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে, এমন উপস্থাপনাও গ্রহণযোগ্য হবে না। জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, এমন বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রেও আপত্তি জানানো যাবে।
এ ছাড়া ব্যক্তি বা কোনও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মানহানিকর বিষয়বস্তু এবং আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে, এমন দৃশ্যের উপরেও বিধিনিষেধ রয়েছে। বিচারব্যবস্থার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা কিংবা আদালতের নিয়ম অমান্য করতে উৎসাহিত করে, এমন উপস্থাপনাও গ্রহণযোগ্য হবে না। জাতীয় প্রতীক ও সরকারি প্রতীক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ১৯৫০ সালের সংশ্লিষ্ট আইন মেনে চলতে হবে।
বয়স অনুযায়ী শংসাপত্রের নিয়ম বহাল
ছবির বয়সভিত্তিক শংসাপত্রের ক্ষেত্রে আগের ব্যবস্থাই বজায় রাখা হয়েছে। ইউ/এ ৭+, ইউ/এ ১৩+ এবং ইউ/এ ১৬+—এই তিনটি বিভাগ থাকছে। অর্থাৎ সাত, তেরো এবং ষোলো বছরের বেশি বয়সিদের উপযোগী ছবির ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী শংসাপত্র দেওয়া হবে। কম বয়সি দর্শকদের জন্য অভিভাবকের পরামর্শের বিষয়টিও বিবেচনায় থাকবে। যে ছবিগুলি অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উপযুক্ত নয়, সেগুলি শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের দেখার জন্য ছাড়পত্র পাবে।
অন্য দিকে, ইউ শ্রেণির শংসাপত্র পাওয়া ছবিকে পরিবারের সব বয়সের সদস্যদের একসঙ্গে দেখার উপযোগী হতে হবে। কোনও ছবি যদি বিশেষ কোনও পেশাগত বা নির্দিষ্ট দর্শকগোষ্ঠীর জন্য উপযুক্ত হয়, তা হলে সেই অনুযায়ী দর্শকের পরিসরও সীমাবদ্ধ করা যেতে পারে।
বিচ্ছিন্ন দৃশ্য নয়, বিচার হবে গোটা ছবির
নতুন নির্দেশিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, কোনও ছবিকে শুধুমাত্র কয়েকটি বিচ্ছিন্ন দৃশ্যের ভিত্তিতে বিচার করা হবে না। গোটা ছবির কাহিনি, নির্মাতার বক্তব্য এবং তার সামগ্রিক প্রভাব বিবেচনা করেই শংসাপত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ছবিতে যে সময়কাল তুলে ধরা হয়েছে, সেই সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি বর্তমান সমাজের মূল্যবোধও মাথায় রাখতে হবে।
বিশেষত ঐতিহাসিক ছবি, পিরিয়ড ড্রামা কিংবা ভিন্ন সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে তৈরি সিনেমার ক্ষেত্রে এই নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কোনও দৃশ্যের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে তার বৃহত্তর কাহিনির সঙ্গে সম্পর্ক বিচার করার সুযোগ থাকবে। তবে ছবির সামগ্রিক উপস্থাপনা যেন দর্শকের নৈতিক বোধের অবক্ষয় না ঘটায়, সেই শর্তও রাখা হয়েছে।
ছবির নামকরণেও পর্ষদের নজর
এ বার শুধু চিত্রনাট্য, সংলাপ কিংবা দৃশ্য নয়, ছবির নামও থাকবে পর্ষদের নজরদারিতে। কোনও ছবির শিরোনাম উস্কানিমূলক, অশ্লীল, আপত্তিকর কিংবা সার্টিফিকেশনের নির্দেশিকার পরিপন্থী কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। অর্থাৎ নামকরণের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সামাজিক ও নৈতিক মানদণ্ড মেনে চলতে হবে নির্মাতাদের।
সব মিলিয়ে নতুন নির্দেশিকায় ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। মাদক, যৌন হিংসা, নারী ও শিশুর মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলিতে আরও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গোটা ছবির প্রেক্ষাপট বিচার করার নির্দেশ সৃজনশীল স্বাধীনতার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কাগজে-কলমে নির্দেশিকা তৈরি হওয়া আর বাস্তবে তার প্রয়োগ এক বিষয় নয়। বিশেষত অপরাধ, যৌন হিংসা, সামাজিক বৈষম্য কিংবা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিতর্কের মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে ছবি তৈরির ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম কী ভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই। শেষ পর্যন্ত শিল্পীর স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য কতটা বজায় থাকে, তার উত্তর মিলবে আগামী দিনে কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র শংসাপত্র পর্ষদের সিদ্ধান্তেই।
Leave a Comment