পুজোর ছুটিতে বুলডোজার চালিয়ে উচ্ছেদের অভিযোগে কলকাতা হাই কোর্টের তীব্র ভর্ৎসনার মুখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো বসতি থেকে চা-বাগানের শ্রমিকদের সরানোর চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন বিচারপতি। স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, জাতীয় স্বার্থে প্রকল্পের কাজ চলতে পারে, তাতে আদালতের কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু প্রকল্পের দোহাই দিয়ে আইনকে অগ্রাহ্য করে কাউকে উচ্ছেদ করা যাবে না। শুনানিতে বিচারপতির তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, ‘‘বুলডোজার এখন একটি ম্যাজিক ওয়ার্ডে পরিণত হয়েছে। ধর্নায় বসলেই কেউ দখলদার হয়ে যায় না। বুলডোজারও নিয়ে আসা যায় না।’’
মামলাকারীদের আইনজীবী শামিম আহমেদ আদালতে জানান, তাঁরা সময় চেয়েছিলেন। কিন্তু পুজোর ছুটির মধ্যেই ফের বুলডোজার চালিয়ে উচ্ছেদের চেষ্টা হচ্ছে। প্রায় দেড়শো বছর ধরে ওই এলাকায় বসতি রয়েছে। সেই বসতি অবৈধ হলে আইন মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু কোনও রকম আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বুলডোজার চালিয়ে বাসিন্দাদের সরানো যায় না।
আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যও আদালতে অভিযোগ করেন, হাই কোর্টের অবকাশের সুযোগ নিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসে চা-বাগানে কাজের সূত্রে ওই শ্রমিকেরা সেখানে বসবাস করছেন। তাঁদের ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে এ ভাবে উচ্ছেদ করা যায় না। প্রকল্পের গুরুত্ব যতই থাকুক, শ্রমিকদের মানবিক অধিকার উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
এর পরেই বিচারপতি স্পষ্ট করে দেন, প্রকল্পের কাজে আদালত কোনও বাধা দিতে চান না। আগে থেকেই প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি রয়েছে। সেই নির্দেশ নিয়ে কোনও পক্ষের আপত্তি থাকলে তারা স্থগিতাদেশ চাইতে পারে। কিন্তু প্রকল্পের কাজ চালানোর অনুমতি দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, উচ্ছেদের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া মানতে হবে না।
বুলডোজার অভিযান নিয়ে শুনানিতে বিচারপতির কটাক্ষ, ‘‘মশা মারতে কামান আনছেন?’’ তাঁর প্রশ্ন, শুধু ধর্নায় বসার কারণে কাউকে দখলদার বা অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করা যায় কি? যাঁরা সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁদের সরানোর আগে কী আইনি পদক্ষেপ করা হয়েছে? নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনেই কি উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে? আদালতের বক্তব্য, প্রতিবাদ বা ধর্নায় বসলেই কারও বিরুদ্ধে বুলডোজার নিয়ে হাজির হওয়া যায় না।
অন্য দিকে, পোর্ট কর্তৃপক্ষের হয়ে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ধীরাজ ত্রিবেদী জানান, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিটি ভারত-ভুটান সীমান্ত এলাকায়। সেখানে প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের কাজ করছে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ (এলপিএআই)। রাজ্য সরকার জমি দিয়েছে এবং সেই জমি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ওই এলাকায় আগে একটি চা-বাগান ছিল। সেখানে কয়েক জন শ্রমিক কাজ করতেন। কর্তৃপক্ষের দাবি, কাউকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে না। বরং কয়েক জন ব্যক্তি ধর্নায় বসে প্রকল্পের কাজে বাধা দিচ্ছেন এবং কর্মীদের হুমকি দিচ্ছেন।
রাজ্য সরকারের তরফেও জানানো হয়, ধর্নার কারণে প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এই ঘটনায় পুলিশ এফআইআর দায়ের করেছে।
তবে আদালত বুঝিয়ে দিয়েছে, প্রকল্পের কাজ চালানো এবং বসতি উচ্ছেদ সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। জাতীয় স্বার্থে প্রকল্পের কাজ চলতে পারে, কিন্তু তার জন্য দেশের আইন অমান্য করা যাবে না। বিচারপতির কথায়, ‘‘ভারতে আইন রয়েছে। কোনও পদক্ষেপ করতে হলে আইন অনুযায়ী করতে হবে।’’ এমনকি ওই এলাকায় প্রাসাদ থাকলেও তা ভাঙতে হলে আইনি প্রক্রিয়া মেনেই পদক্ষেপ করতে হত।
শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশ, প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যেতে কোনও বাধা নেই। তবে সংশ্লিষ্ট এলাকায় উচ্ছেদ-সহ কোনও পদক্ষেপ করতে হলে অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ, প্রকল্পের কাজে আদালতের ছাড় মিললেও বুলডোজার চালিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অনুমতি দেয়নি হাই কোর্ট।
Leave a Comment