বেঙ্গালুরুতে পারিবারিক অশান্তির জেরে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ। স্ত্রী, শাশুড়ি, দুই শ্যালক, দুই শ্যালিকা এবং সাত বছরের এক শিশুকে খুনের অভিযোগ উঠেছে এক ক্যাবচালকের বিরুদ্ধে। শুধু হত্যাই নয়, প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে মৃতদেহগুলি শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্তের নাম ইন্দুশেখর। তিনি বেঙ্গালুরুর রাজাজিনগর এলাকার বাসিন্দা। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহ এবং শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে বিবাদের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
ঘটনাটি বেঙ্গালুরুর শ্রীরামপুর এলাকার। অভিযুক্তের স্ত্রী সুনীতা-সহ তাঁর পরিবারের সাত সদস্যকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে ইন্দুশেখরের বিরুদ্ধে। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন সুনীতার মা রূপবতী, দুই ভাই শিবকুমার ও শঙ্কর। এ ছাড়াও রয়েছেন পরিবারের দুই সদস্য দিব্যা ও নলিনী এবং শিবকুমারের সাত বছরের ছেলে পুনীত।
– Advertisement –
২০ বছরের দাম্পত্য, দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, প্রায় ২০ বছর আগে সুনীতার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল অভিযুক্তের। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তাঁদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তি চলছিল। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ হলেই সুনীতার বাপের বাড়ির সদস্যরা হস্তক্ষেপ করতেন বলে জানা গিয়েছে।
তদন্তকারীদের অনুমান, স্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা বারবার তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছেন বলে মনে করতেন ইন্দুশেখর। এই বিষয়টি নিয়ে তাঁর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সেই পারিবারিক বিবাদই শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের কারণ কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
পার্টির অছিলায় দুই শ্যালককে বাড়িতে ডেকে আনার অভিযোগ
তদন্তে পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, পরিকল্পনা করেই একাধিক সদস্যকে হত্যা করা হয়েছিল। অভিযোগ, প্রথমে স্ত্রী সুনীতা এবং তাঁর মা রূপবতীকে খুন করেন অভিযুক্ত। এরপর পার্টি করার অছিলায় দুই শ্যালক শিবকুমার ও শঙ্করকে নিজের বাড়িতে ডেকে আনেন তিনি।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, তাঁরা বাড়িতে পৌঁছনোর পর ভারী শিলনোড়া দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাঁদের হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের অন্য সদস্য নলিনী, দিব্যা এবং সাত বছরের পুনীতকেও খুন করা হয় বলে অভিযোগ। তবে হত্যাকাণ্ডের সঠিক সময় ও প্রতিটি ঘটনার ধারাবাহিকতা এখনও তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
– Advertisement –
শহর থেকে ৬০-৭০ কিলোমিটার দূরে দেহ ফেলার অভিযোগ
অভিযোগ, সাতজনকে হত্যার পর তাঁদের দেহ গাড়িতে চাপিয়ে বেঙ্গালুরু থেকে প্রায় ৬০-৭০ কিলোমিটার দূরে চিক্কাবল্লাপুর জেলার বিভিন্ন নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দেহগুলি ফেলে আসা হয়েছিল বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পর্যটনকেন্দ্র নন্দী হিলসের কাছ থেকে সাত বছরের শিশু পুনীতের দেহ উদ্ধার হয়েছে। বাকি ছয়জনের দেহের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। অভিযুক্তের গাড়ির গতিবিধি, সম্ভাব্য দেহ ফেলার জায়গা এবং ফরেন্সিক তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পরিবারের সদস্যদের খোঁজে পুলিশে অভিযোগ করেছিলেন সুনীতা!
এই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক, পরিবারের একাধিক সদস্য নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর তাঁদের খোঁজ পেতে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সুনীতা নিজেই। পরিবারের লোকজনের কোনও সন্ধান না পেয়ে তিনি নিখোঁজ ডায়েরি করেছিলেন বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
অভিযোগ, নিখোঁজের অভিযোগ জানানোর পর বাড়িতে ফিরে আসেন সুনীতা। এরপর তাঁকেও হত্যা করা হয় বলে তদন্তকারীদের দাবি। অর্থাৎ, পরিবারের সদস্যদের নিখোঁজ হওয়ার রহস্যের তদন্ত শুরু হওয়ার পরই সামনে আসে আরও ভয়াবহ তথ্য।
নিখোঁজের অভিযোগের তদন্তে নেমে পরিবারের সদস্যদের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড এবং অন্যান্য তথ্য খতিয়ে দেখতে শুরু করে পুলিশ। সেই সূত্রেই ইন্দুশেখরের গতিবিধি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
এরপর শ্রীরামপুর ও রাজাজিনগর থানার পুলিশ তাঁকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। পুলিশের দাবি, জেরার সময় সাতজনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন অভিযুক্ত। যদিও তাঁর বয়ান, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং দেহগুলি কোথায় ফেলা হয়েছে, সেই সমস্ত তথ্য এখনও যাচাই করা হচ্ছে।
একটি পরিবারের সাত সদস্যের এমন পরিণতি ঘিরে বেঙ্গালুরুতে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নিখোঁজ সদস্যদের খোঁজে পুলিশের কাছে যাওয়া সুনীতাকেও শেষ পর্যন্ত হত্যার অভিযোগ এই ঘটনাকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে। বাকি ছয়জনের দেহ উদ্ধার এবং হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রহস্য উন্মোচনই এখন তদন্তকারীদের প্রধান লক্ষ্য।
Leave a Comment