ঘোর অমাবস্যা! কালীপুজোর রাত। চারদিকে ঢাকের আওয়াজ, প্রদীপের আলো, ধূপের গন্ধ আর দেবীর সামনে ভক্তদের আবেগঘন অভিব্যক্তি। কোথাও বিশাল মণ্ডপ, কোথাও প্রাচীন পারিবারিক পুজো, কোথাও আবার সামান্য আয়োজনের মধ্যে নিবেদিত। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিবিজড়িত নৈহাটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ২১ ফুট উচ্চতার দেবী বড়মা। প্রায় নয় দশকের ঐতিহ্যবাহী এই কালীপুজোর সূচনা ভবেশ চক্রবর্তীর উদ্যোগে। জনশ্রুতি অনুসারে, নবদ্বীপের রাসে বিশাল রাধাকৃষ্ণের প্রতিমা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নৈহাটিতে নির্মাণ করেন বিশালাকার কালীমূর্তি।
প্রথমে ‘ভবেশ কালী’ নামে পরিচিত দেবী পরে বড়মা হিসেবে জনপ্রিয় হন। স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিতা দক্ষিণাকালীরূপী এই দেবীর পুজোয় ভক্তসমাগম বিপুল। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সময় কাঠামোপুজোর মাধ্যমে প্রতিমা নির্মাণ শুরু হয়। ‘ধর্ম হোক যার যার, বড়মা সবার’—এই উদার আদর্শে পুজোর প্রসাদ, বস্ত্র ও শাড়ি দুঃস্থদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ভক্তি, ঐতিহ্য ও মানবসেবার অপূর্ব সমন্বয়ে বড়মা আজ নৈহাটির মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের প্রতীক। নৈহাটিতে সেই ট্রেডিশন আজও চলছে| ট্রেডিশন অবশ্য চৌম্বক আবেশের মত, সমাজ প্রেক্ষাপটে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে| কালী পূজার আলোর রোশনাই, সমাজকে আলোর সন্ধান দেয়!
দেবী কালীর প্রকৃত স্বরূপ কোথায়? মাটির প্রতিমায়, মন্দিরের গর্ভগৃহে, না কি মানুষের মনের গভীরে?তবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে বাংলার এক অসামান্য সাধক-কবির কাছে। তাঁর নাম রামপ্রসাদ সেন।রামপ্রসাদকে মনে পড়লে প্রথমেই মনে আসে তাঁর গান। কখনও তিনি মাকে ডাকছেন আকুল হয়ে, কখনও তাঁর সঙ্গে অভিমান করছেন, কখনও সংসারের অভাব নিয়ে অভিযোগ জানাচ্ছেন, কখনও আবার নিজের মনকে বোঝাচ্ছেন যে এত চিন্তা করে লাভ নেই।
তাঁর গানের ভাষা সহজ, অথচ তার অন্তর্নিহিত দর্শন গভীর। যে কথাগুলি তিনি মাকে বলেছেন, সেগুলি যেন আমাদেরই মনের কথা—কোনও প্রিয়জনের কাছে বলা যায় এমন একান্ত ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি। তাঁর কালী ঘরের মা। মায়ের কাছে সন্তান নিজের দুঃখের কথা বলতে পারে, অভাবের কথা জানাতে পারে, এমনকি মায়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করতে পারে। এই সম্পর্কের মধ্যে ভক্তি আছে, কিন্তু তার সঙ্গে মিশে আছে আত্মীয়তা। ভয় আছে, কিন্তু ভয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে ভালোবাসা।
রামপ্রসাদের কালীসাধনার বিশেষত্ব এখানেই। তিনি দেবীকে কেবল পূজার উপকরণের মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি| জীবনের সামগ্রিক যাপন চিত্র অঙ্কিত কালী নামে। সংসারের দুঃখ, অর্থের অভাব, মানুষের প্রতি মমতা, প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা—সবকিছুই তাঁর কাছে সাধনার উপাদান হয়ে উঠেছে। তাই তাঁর জীবন ও গানকে আলাদা করে দেখা যায় না। তাঁর গানই যেন তাঁর আত্মজীবনী, আর তাঁর জীবন যেন সেই গানেরই দীর্ঘ ব্যাখ্যা।
আরও পড়ুন: রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা,পর্ব ৭: বিভার প্রেম এবং আত্মত্যাগ, ‘রবিবার’ গল্পে নারীসত্তার এক বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক দিক উন্মোচন
রামপ্রসাদের একটি গানে প্রশ্ন উঠে আসে— ‘মায়ের মূর্তি গড়তে চাই মনের ভ্রমে মাটি দিয়ে।মা বেটি কি মাটির মেয়ে, ব্যথা খাঁটি মাটি নিয়ে!’ এই পঙ্ক্তিগুলির মধ্যে রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা। খাঁটি মনে মায়ের সাধনা করে কয়জন? অপরদিকে এমনও বলা যায়, যে দেবীকে ভক্তরা বিশ্বজননী বলে মানেন, যাঁর মধ্যে তাঁরা সৃষ্টির আদি শক্তিকে উপলব্ধি করেন, তাঁকে কি কেবল মাটির তৈরি একটি প্রতিমার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায়? প্রতিমা নির্মাণের শিল্প, তার সৌন্দর্য, তার অলংকার—এসবের কি কোনও মূল্য নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু সেই মূল্য দেবীর প্রকৃত স্বরূপের সমান নয়। প্রতিমা দেবীর দৈবশক্তির আধার রূপে ভক্তের মনে স্থান নির্দিষ্ট করে!
রামপ্রসাদ আমাদের মনে করিয়ে দেন, প্রতিমা উপাসনার মাধ্যম, উপাসনার চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। মাটির প্রতিমা মানুষের ভক্তিকে দৃশ্যমান করে, তাকে একটি নির্দিষ্ট রূপের সামনে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে। কিন্তু প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে যদি মানুষের অন্তরে কোনও পরিবর্তন না আসে, যদি তার অহংকার, লোভ কিংবা নিষ্ঠুরতা অটুট থাকে, তবে সেই পূজার উদ্দেশ্য কতখানি পূর্ণ হল? এই প্রশ্ন আজও কিন্তু অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রামপ্রসাদ তাই গাইলেন, “মন, তোর এত ভাবনা কেন?একবার ‘কালী’ বলে বস রে ধ্যানে।” এই আহ্বান মনের সকল অস্থিরতার নিরসন ঘটায় |
রামপ্রসাদ প্রতিমা নির্মাণ করেন, কালীপুজো করেন, দেবীর রূপকে ভালোবাসেন | আবার সেই রূপের সীমাবদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার প্রশ্নের সহজ ভাব কঠিন দার্শনিক মনস্তত্ত্বের সরল সমাধান| কালী প্রতিমার রূপ এবং তার সীমাবদ্ধতা, দুইয়ের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। দেবী প্রতিমা রূপকে চূড়ান্ত সত্য বলে আঁকড়ে ধরলে উপলব্ধির পথ সংকীর্ণ হয়ে যায়। এই ভাবনা থেকেই তাঁর কালীসাধনা একদিকে বাংলার প্রচলিত শাক্তভক্তির সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে তাকে ছাড়িয়ে মানুষের অন্তর্জীবনের গভীরে পৌঁছে যায়।
রামপ্রসাদের কালীভাবনার সবচেয়ে মানবিক দিকটি ধরা পড়ে দেবীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মধ্যে। তিনি মাকে দূরে বসিয়ে রাখেননি। দেবী তাঁর কাছে কখনও স্নেহময়ী জননী, কখনও অভিমানী মেয়ে, কখনও সংসারের সমস্ত দুঃখের জন্য দায়ী এক সর্বশক্তিময়ী সত্তা। তাঁর গানে তাই ভক্তি একমুখী নয়। এখানে সন্তান যেমন মায়ের কাছে আশ্রয় চায়, তেমনই মাকে প্রশ্ন করে, তাঁর সঙ্গে অভিমান করে, নিজের না-পাওয়ার হিসাবও জানায়। এই সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের সাহস আছে। সাধারণত মানুষ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করার সময় নিজের অভাবের কথা বলে, বিপদ থেকে উদ্ধার চায়, সুখ ও সমৃদ্ধির কামনা করে। রামপ্রসাদও সংসারের দুঃখ থেকে মুক্তি চেয়েছেন।
কিন্তু তাঁর বিশেষত্ব এই যে, তিনি নিজের দুঃখের জন্য মাকেই প্রশ্ন করতে দ্বিধা করেননি। মা যদি সত্যিই সর্বশক্তিময়ী হন, তবে সন্তানের এত কষ্ট কেন? তিনি যদি সকলকে পালন করেন, তবে কেউ অনাহারে থাকে কেন? তাঁর জগতে এত বৈষম্য, এত বেদনা, এত না-পাওয়া কেন? এই প্রশ্নগুলি কোনও ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের ভাষায় উচ্চারিত হয়নি। সংসারের মধ্যে থেকে যিনি দুঃখ দেখেছেন, অভাব অনুভব করেছেন, প্রিয়জনের প্রতি মমতা নিয়ে বেঁচেছেন, তাঁর পক্ষে এই প্রশ্নগুলি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
রামপ্রসাদের গানে মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কটি তাই নিছক কাব্যিক কল্পনার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বাংলার গ্রামীণ জনজীবনে প্রবেশ করেছে মানুষের ঈশ্বর-অনুসন্ধানের একটি স্বতন্ত্র পথ হয়ে। এখানে ভক্তি সকল শক্তির উৎস! শাস্ত্রের জটিল তত্ত্ব সকলের কাছে সহজবোধ্য না-ও হতে পারে, কিন্তু অভাবের দিনে মাকে ডাকা, বিপদের সময় তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়া, নিজের ব্যর্থতার জন্য অভিমান করা—এই অনুভূতিগুলি মানুষের চিরকালীন অভিজ্ঞতা। রামপ্রসাদ সেই অনুভূতিগুলিকেই আধ্যাত্মিকতার ভাষা দিয়েছেন।
রামপ্রসাদের জীবনকে বুঝতে গেলে হালিশহরের কথা বিশেষভাবে মনে রাখতে হয়। এই অঞ্চলের সঙ্গে তাঁর নাম, তাঁর সাধনা এবং তাঁর স্মৃতি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। গঙ্গার কাছাকাছি বাংলার এই জনপদে তিনি সংসার করেছেন, গান রচনা করেছেন এবং দেবী কালীর আরাধনায় নিজেকে নিবেদন করেছেন বলে তাঁর জীবনকথায় উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর সাধনক্ষেত্র হিসেবে পঞ্চবটীর কথা বিশেষভাবে পরিচিত। পাঁচটি গাছকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই নির্জন স্থান ভারতীয় সাধনপরম্পরায় এক পরিচিত প্রতীক। রামপ্রসাদের পঞ্চবটীও তাঁর ভক্তদের কল্পনায় এমন এক স্থান, যেখানে সংসারের কোলাহল থেকে দূরে বসে তিনি মায়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে গভীর করেছিলেন। সাধন ক্ষেত্র এক প্রকার শক্তি কেন্দ্র! আজও দৈবী শক্তির প্রভাব অনুভূত হয়|
রামপ্রসাদের সাধনজীবন সম্পর্কে নানা কাহিনি প্রচলিত। কোথাও তাঁকে দেখা যায় গভীর রাতে ধ্যানে নিমগ্ন, কোথাও মায়ের গান গাইতে গাইতে সময়ের হিসাব ভুলে যেতে। এই কাহিনিগুলির সব বিবরণ সমানভাবে ঐতিহাসিকভাবে যাচাই করা যায় না। তবে এগুলি যে তাঁর সম্পর্কে গড়ে ওঠা দীর্ঘকালীন লোকস্মৃতির অংশ, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। রামপ্রসাদের সাধনার পরিবেশকে কেবল নির্জনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে ভুল হবে। তাঁর গানের মধ্যে সংসারের এত অনুষঙ্গ, এত বাস্তব অভিজ্ঞতা, এত মানুষের কথা রয়েছে যে তাঁকে সমাজবিচ্ছিন্ন সাধক বলে মনে হয় না। তিনি সংসারের দুঃখ থেকে পালিয়ে যাননি | তাঁর কালীসাধনা তাই কোনও বিমূর্ত আধ্যাত্মিক অনুশীলন নয়। তার শিকড় বাংলার দৈনন্দিন জীবনে প্রোথিত।
রামপ্রসাদের জীবন নিয়ে প্রচলিত কাহিনিগুলির মধ্যে অর্থাভাবের প্রসঙ্গ বারবার ফিরে আসে। তাঁকে এমন একজন মানুষ হিসেবে দেখা হয়, যিনি সংসারের অর্থনৈতিক হিসাবের তুলনায় সাধনা ও গানের জগতে বেশি নিমগ্ন থাকতেন। তাঁর জীবনের আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা থাকলেও সব বিবরণকে সমান নির্ভরযোগ্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। তবু তাঁর গানের দিকে তাকালে বোঝা যায়, সংসারের অভাব ও মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন তাঁর কাছে অচেনা ছিল না। তাঁর গানগুলিতে স্পষ্ট, সবকিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই সুখের পথ নয়।
আবার অন্যদিকে, সেই মানুষটিই মায়ের কাছে অভিযোগ জানাচ্ছেন, সংসারের বোঝা তাঁর পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে উঠছে। এই দ্বৈত অভিজ্ঞতার মধ্যেই রামপ্রসাদের মানবিকতা। তিনি সংসারকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেননি, আবার সংসারের আকর্ষণকেও চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করেননি। তাঁর কাছে সংসার ছিল সাধনার ক্ষেত্র, কিন্তু সংসারের সুখ-দুঃখের মধ্যে আটকে থাকলে মানুষ নিজের অন্তরের স্বাধীনতা হারাতে পারে। এখানে তাঁর বক্তব্যকে দারিদ্র্যের মহিমাকীর্তন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। দারিদ্র্য মানুষের স্বাধীনতা সীমিত করে, জীবনকে কঠিন করে তোলে। কিন্তু সম্পদ থাকলেই যে মনের শান্তি নিশ্চিত হয় না, রামপ্রসাদের অভিজ্ঞতা সেই কথাও মনে করিয়ে দেয়।
রামপ্রসাদের জীবনকে তাঁর সময়ের বৃহত্তর ইতিহাসের বাইরে রেখে বিচার করা যায় না। আঠারো শতকের বাংলা ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং সামাজিক সংকটের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। মুর্শিদকুলি খানের রাজস্বব্যবস্থা, নবাবি শাসনের পরিবর্তন, আলিবর্দি খানের সময়ে মারাঠা আক্রমণ এবং ১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধ বাংলার ইতিহাসকে ক্রমশ উপনিবেশিক শাসন এবং শোষণের দিকে নিয়ে চলেছিল| ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভ করে।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা কোম্পানির হাতে যাওয়ার ফলে বাংলার অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে গভীর পরিবর্তন ঘটে। এর পরিণতিগুলির মধ্যে ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ ছিল অন্যতম ভয়াবহ। বাংলার বিপুল জনসংখ্যা অনাহার ও রোগে আক্রান্ত হয়, বহু মানুষ প্রাণ হারান। দুর্ভিক্ষের কারণ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানা বিশ্লেষণ থাকলেও খরা, খাদ্যসংকট, রাজস্বনীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার সম্মিলিত প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। এই সময় দাঁড়িয়ে তাঁর গানে মানুষের দুঃখ ও অসহায়তার যে অনুভব রয়েছে, তা আঠারো শতকের বাংলার বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সংগতিপূর্ণ।
যে সমাজে মানুষ রাজনৈতিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছিল, সেখানে ঈশ্বরের কাছে আশ্রয় চাওয়া ছিল এক সহজাত প্রতিক্রিয়া। রামপ্রসাদের গানে ভক্তি ও দর্শনের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন! এইভাবে তাঁর ব্যক্তিগত সাধনা বাংলার সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে একটি সূক্ষ্ম সম্পর্ক স্থাপন করে। তিনি ইতিহাসের রাজনৈতিক ভাষ্যকার নন, কিন্তু তাঁর গানের মানবিক বোধ আমাদের সেই সময়ের মানুষের মানসিক জগৎ সম্পর্কে ভাবতে সাহায্য করে।
শাক্ত সাধক ও ভক্তিবাদী গীতিকার রাম প্রসাদের জীবনালেখ্য কেমন ছিল? প্রচলিত মতে, ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দে অধুনা উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হালিশহর, প্রাচীন কুমারহট্টে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা রামরাম সেন। শৈশব থেকেই বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষায় তাঁর শিক্ষালাভের কথা জানা যায়। সংসারের দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি কলকাতায় এক বিত্তশালী ব্যক্তির বাড়িতে হিসাবরক্ষকের কাজ গ্রহণ করেছিলেন বলে প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু হিসাবের খাতায় সাংসারিক আয়-ব্যয়ের পরিবর্তে ফুটে উঠত দেবী কালীর উদ্দেশে নিবেদিত তাঁর আকুল প্রার্থনা। জনশ্রুতি অনুসারে, তাঁর এই প্রতিভা ও ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে নিয়োগকর্তা তাঁকে চাকরির পরিবর্তে গান রচনায় মনোনিবেশ করার সুযোগ করে দেন।
রামপ্রসাদের রচিত শ্যামাসংগীত ‘রামপ্রসাদী’ নামে স্বতন্ত্রে পরিচিত। কালীকীর্তন, বিদ্যাসুন্দর ও কৃষ্ণকীর্তন তাঁর নামে প্রচলিত উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে। নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতাও তাঁর জীবনের সঙ্গে যুক্ত বলে বিবরণ পাওয়া যায়।প্রায় ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জীবনাবসান ঘটে বলে সাধারণভাবে স্বীকৃত। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু হয়নি। রামপ্রসাদের গানে তন্ত্রসাধনার গভীরতা, বাংলার লোকজ অনুভূতি এবং সন্তানের মায়ের কাছে আত্মসমর্পণের সহজ ভাষা একাকার হয়েছে। তাঁর গান পরবর্তী শাক্তকবি ও সংগীতসাধকদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বাংলার মানুষের কাছে তিনি আজও এমন এক সাধক, যাঁর গানে দেবী দূর আকাশের অধিষ্ঠাত্রী নন—তিনি ঘরের মা, দুঃখের সঙ্গিনী এবং জীবনের অন্তিম আশ্রয়।
কালীকে ঘিরে মানুষের মনে ভয় ও মুগ্ধতা পাশাপাশি কাজ করে। তাঁর গাঢ় বর্ণ, মুণ্ডমালা, খড়্গ, প্রসারিত জিহ্বা এবং শ্মশানসংলগ্ন রূপ তাঁকে অন্য অনেক দেবীমূর্তি থেকে পৃথক করে। কিন্তু শাক্তধর্মে এই ভয়ংকরতার মধ্যেই রয়েছে গভীর দার্শনিক তাৎপর্য। কালী কালের সঙ্গে যুক্ত, পরিবর্তন ও লয়ের শক্তির সঙ্গে যুক্ত, তিনি সেই সত্যেরও প্রতীক, যার সামনে মানুষের অহংকার, সম্পদ ও ক্ষমতার স্থায়িত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে। রামপ্রসাদ এই ভয়ংকর রূপের মধ্যেও মায়ের স্নেহ অনুভব করেছেন। তাঁর কাছে দেবীর কালো রং কেবল অন্ধকার থেকে আলোর অভিযাত্রী । সেই কালো রূপের মধ্যেই তিনি সমস্ত জগতের আলো ও রহস্যকে অনুভব করেন। যে মহাশক্তি সৃষ্টি ও ধ্বংস, জন্ম ও মৃত্যু, আনন্দ ও বেদনা, সবকিছুকে ধারণ করেন |
এখানে কালীভক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পায়। মানুষ সাধারণত নিজের পছন্দমতো ঈশ্বরের রূপকে গ্রহণ করতে চায়। কিন্তু কালীসাধনায় ভয় ও মাতৃত্ব পাশাপাশি অবস্থান করে। দেবী একদিকে সন্তানকে আশ্রয় দেন, অন্যদিকে তাঁর রূপ মনে করিয়ে দেয় যে জীবন অনিত্য এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। রামপ্রসাদ এই দুই অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করে মায়ের কাছে আশ্রয় চেয়েছেন, আবার সেই মায়েরই মহাশক্তির সামনে নিজের ক্ষুদ্রতাকে উপলব্ধি করেছেন।
আরও পড়ুন: ‘যে হাতে বিবেকানন্দের পদস্পর্শ করেছি, সেই হাতে গান্ধী নয়!’—ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের লেন্সে দুর্ধর্ষ বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের বিস্ময়কর উক্তি
রামপ্রসাদের কালীসাধনার দার্শনিক গভীরতা বোঝার জন্য তাঁর মাতৃভাবকে বিশেষভাবে লক্ষ করা দরকার। তিনি ঈশ্বরকে মা বলে ডাকেন, নিজেকে সন্তানের আসনে রাখেন। এই সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে নিবিড় ভালোবাসা, কিন্তু সেই ভালোবাসার মধ্যেই একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্ন বিদ্যমান | সাধনার চরম অবস্থায় যদি ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে কোনও ভেদ না থাকে, তবে এই মা ও সন্তানের সম্পর্কের কী হবে? অদ্বৈত দর্শনে পরম সত্যের সঙ্গে আত্মার ঐক্য উপলব্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা।
কিন্তু ভক্তির জগতে সম্পর্কের আনন্দও স্বতন্ত্র মূল্য বহন করে। ভক্ত ঈশ্বরকে ভালোবাসতে চান, তাঁর সান্নিধ্য অনুভব করতে চান, তাঁর কাছে নিজের কথা বলতে চান। সেই সম্পর্কের মধ্যেই থাকে আনন্দের এক বিশেষ স্বাদ। রামপ্রসাদের একটি গানে এই অনুভূতি অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে—‘নির্বাণে কী আছে ফল, জলে মিশায়ে জল,চিনি হওয়া ভালো নয়, মন, চিনি খেতে ভালোবাসি।‘ চিনির সঙ্গে মিশে যাওয়া আর চিনির স্বাদ গ্রহণ করা এক অভিজ্ঞতা নয়। প্রথমটিতে পৃথক সত্তার অনুভূতি বিলীন হয়ে যায় |
দ্বিতীয়টিতে সম্পর্কের আনন্দ অক্ষুণ্ণ থাকে। রামপ্রসাদের এই উপমা ভক্তির মাধুর্যকে সামনে নিয়ে আসে। তাঁর কাছে মাকে ভালোবাসার আনন্দ এত গভীর যে, সেই সম্পর্কের পরিচয়টুকু হারিয়ে ফেলতে তিনি রাজি নন । তিনি মায়ের সঙ্গে একাত্ম হতে চান, আবার সন্তান হয়েই থাকতে চান। এই দ্বৈত আকাঙ্ক্ষা কোনও দুর্বলতা প্রেমের নিজস্ব স্বরূপের প্রকাশ। মানুষের ভালোবাসার সম্পর্কেও এমন অনুভূতি দেখা যায়। আমরা প্রিয়জনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হতে চাই, কিন্তু সেই সম্পর্কের স্বাতন্ত্র্যও হারাতে চাই না। রামপ্রসাদ এই মানবিক অভিজ্ঞতাকে আধ্যাত্মিক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। সেই কারণেই তাঁর গানে দর্শন শুষ্ক তত্ত্বের চেয়ে মহত্তর! তিনি জটিল প্রশ্নকে জীবনের সহজ উপমায় প্রকাশ করেন।
রামপ্রসাদের জীবনের শেষ দিনগুলি নিয়ে হালিশহরে একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি রয়েছে। এই কাহিনি অনুসারে, ১৭৮১ সালে, তাঁর বয়স যখন প্রায় ষাট বছর, তখন দীপান্বিতা অমাবস্যায় তিনি নিজের হাতে কালীপ্রতিমা গড়ে পুজোর আয়োজন করেছিলেন। সারা রাত ধরে চলেছিল পুজো, গান ও সাধনা। তাঁর কণ্ঠে নাকি সেদিন বিদায়ের সুর শোনা গিয়েছিল। পরদিন প্রতিমা বিসর্জনের সময় তিনি ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে বলেছিলেন, মায়ের বিসর্জনের সঙ্গে তাঁরও বিসর্জন হবে। কথাটির অর্থ তখন কেউ বুঝতে পারেননি। প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা গঙ্গার ঘাটে পৌঁছলে তিনি জলে নেমে মায়ের দিকে তাকিয়ে গান গাইতে থাকেন। প্রচলিত বর্ণনায় বলা হয়, ‘দক্ষিণা হয়েছে’ কথাটি উচ্চারণ করার পর তাঁর দেহ জলে লুটিয়ে পড়ে। এইভাবেই অস্তমিত হয় সাধকের জীবন সূর্য!
রামপ্রসাদের জীবন ও সাধনার মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক ছিল, এই কাহিনি যেন তারই চূড়ান্ত প্রকাশ। রামপ্রসাদের মৃত্যুর পর তাঁর সাধনক্ষেত্রের ইতিহাসও একসময় বিস্মৃতির পথে এগিয়েছিল বলে প্রচলিত বিবরণে জানা যায়। তাঁর বংশধরেরা ধীরে ধীরে হালিশহর ছেড়ে চলে যান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ও পঞ্চবটীর এলাকা জঙ্গলে ঢেকে যায়। একসময় সেই ভিটের সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।এই বিস্মৃতির বিরুদ্ধে উদ্যোগ নেওয়া হয় উনিশ শতকে। ১৮৮২ সালে হালিশহরের ‘পূর্ণিমা ব্রত সমিতি’ রামপ্রসাদের ভিটে ও পঞ্চবটী খুঁজে বের করার কাজে এগিয়ে আসে বলে সংশ্লিষ্ট জীবনকথায় উল্লেখ রয়েছে।
সমিতির সম্পাদক ভূষণচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে বর্ণিত হয়েছে। কাজটি সহজ ছিল না। দীর্ঘদিনের অবহেলায় স্থানটি জঙ্গলে ঢেকে গিয়েছিল। স্থানীয় মানুষের একাংশের মধ্যে সাধনপীঠ পরিষ্কার করা নিয়ে ভয় ও সংশয় ছিল। তাঁদের ধারণা ছিল, সাধনক্ষেত্রের পরিবর্তন ঘটালে অমঙ্গল হতে পারে। কিন্তু উদ্যোগীরা সেই বাধা অতিক্রম করে স্থানটিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে ভিটের জমি দান, পঞ্চবটী সংরক্ষণ এবং মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৫৭ সালের ১২ জুন কষ্টিপাথরের কালীপ্রতিমা প্রতিষ্ঠার কথা এই ইতিহাসে রয়েছে। দেবীর নাম রাখা হয় ‘জগদীশ্বরী’। রামপ্রসাদের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই স্থান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাঁর সাধনার উত্তরাধিকার বহন করতে শুরু করে।
রামপ্রসাদের স্মৃতিরক্ষা এক অর্থে তাঁর গানেরই সামাজিক পরিণতি। তিনি জীবদ্দশায় মনের ভক্তিকে বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে বড় করে দেখেছিলেন। পরবর্তী প্রজন্ম তাঁর স্মৃতিকে সংরক্ষণ করতে গিয়ে সেই ভক্তিরই একটি দৃশ্যমান আশ্রয় তৈরি করেছে। আজকের পৃথিবীতে মানুষের জীবনের গতি দ্রুত, আকাঙ্ক্ষা অসংখ্য, আর উদ্বেগেরও শেষ নেই। সাফল্য, সম্পদ, সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও ব্যক্তিগত অর্জনের প্রতিযোগিতায় মানুষ কখনও কখনও নিজের মনের কথাই শুনতে পায় না। এই সময়ে রামপ্রসাদের গান আমাদের থামতে শেখায়। নিজের মনের দিকে তাকাতে শেখায়। প্রশ্ন করতে শেখায়, আমরা যা অর্জন করছি, তার মধ্যে সত্যিই কি শান্তি খুঁজে পাচ্ছি?
তাঁর কালীসাধনা ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের অন্তর্জীবনকে স্পর্শ করে। কারণ তাঁর গানের মূল অভিজ্ঞতাগুলি সর্বজনীন—ভালোবাসা, অভিমান, দুঃখ, নির্ভরতা, হারানোর বেদনা এবং জীবনের অনিশ্চয়তার মধ্যে আশ্রয় খোঁজা। তিনি আমাদের শেখান না যে বিশ্বাস থাকলে জীবনের সব সমস্যা মুছে যাবে। বরং তাঁর গানে দেখা যায়, বিশ্বাসী মানুষও কাঁদে, প্রশ্ন করে, হতাশ হয়। কিন্তু সেই অবস্থাতেও সে নিজের অন্তরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে না। রামপ্রসাদের কাছে সেই অন্তরঙ্গ সম্পর্কের নাম মা কালী। তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল, আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে মানবিকতার কোনও বিরোধ নেই। যে মানুষ নিজের দুঃখ বোঝে, সে অন্যের দুঃখও বুঝতে পারে। যে মানুষ নিজের অসহায়তার কথা স্বীকার করতে শেখে, সে অন্য মানুষের দুর্বলতাকে সহজে অবজ্ঞা করতে পারে না। রামপ্রসাদের গানে এই মানবিক বোধ বারবার প্রকাশিত হয়েছে।
তাঁর কাছে দেবীকে পাওয়ার অর্থ শুধু ব্যক্তিগত মুক্তি নয়, নিজের মনকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে ভালোবাসা, সহানুভূতি ও আত্মসমীক্ষার জন্য সেখানে জায়গা থাকে। এই কারণেই তাঁর কালীসাধনা আজও অর্থবহ। তাঁর গান আমাদের কেবল অতীতের বাংলায় ফিরিয়ে নিয়ে যায় না, বর্তমানের জীবনকেও নতুন করে দেখতে শেখায়। রামপ্রসাদের কালী তাই একদিকে বাংলার শাক্তধর্মের ঐতিহ্য, অন্যদিকে মানুষের অন্তর্লোকের প্রতীক। তিনি মাটির প্রতিমা নির্মাণ করেছেন, কিন্তু সেই প্রতিমার মধ্যে আবদ্ধ থাকতে চাননি। তিনি মন্দিরে গিয়েছেন, পুজো করেছেন, গান গেয়েছেন | আবার বারবার ফিরে এসেছেন নিজের মনের কাছে। কারণ তাঁর উপলব্ধিতে দেবীকে খুঁজে পাওয়া এবং নিজের অন্তরাত্মার উপলব্ধি, এই দুই সাধনা পরস্পরের পরিপূরক।
শেষ পর্যন্ত রামপ্রসাদের সমগ্র সাধনাকে যদি একটি সম্পর্কের মধ্যে ধরা যায়, তবে তা মা ও সন্তানের সম্পর্ক। অসীমের সামনে দাঁড়িয়েও তিনি সম্পর্কের উষ্ণতা হারাতে চাননি। মুক্তির আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও তিনি ভালোবাসার আনন্দকে অক্ষুণ্ণ রাখতে চেয়েছেন। আর সেই কারণেই তাঁর গান কেবল সাধকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হয়ে থাকেনি | তা হয়ে উঠেছে বাংলার মানুষের সম্মিলিত হৃদয়ের ভাষা।হালিশহরের গঙ্গার ধারে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থান আজও আমাদের সেই মানুষটির কথা মনে করিয়ে দেয়, যিনি মায়ের কাছে নিজের সমস্ত দুঃখ ও আনন্দ উজাড় করে দিয়েছিলেন।
সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, কালীপুজোর আয়োজনও বদলেছে। কিন্তু তাঁর গানের প্রশ্নটি আজও অমলিন, কোথায় খুঁজি তারে? রামপ্রসাদের কালীসাধনার চিরন্তন তাৎপর্য এখানেই—দেবীকে পাওয়া মানে শুধু কোনও অলৌকিক শক্তির কাছে পৌঁছনো নয়, নিজের মনকে ভালোবাসা, প্রশ্ন, সহমর্মিতা ও আত্মসমর্পণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া। তাঁর গানের মধ্যে সেই উন্মুক্ততারই সন্ধান মেলে। আর যত দিন মানুষের মনে অভাব থাকবে, অভিমান থাকবে, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা থাকবে, তত দিন রামপ্রসাদের কণ্ঠে উচ্চারিত মায়ের ডাকও বাংলার মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।
দেখুন:
Leave a Comment