রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা,পর্ব ৭: বিভার প্রেম এবং আত্মত্যাগ, ‘রবিবার’ গল্পে নারীসত্তার এক বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক দিক উন্মোচন

By Suman Debnath

October 31, 2026 1:45 PM

রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা,পর্ব ৭: বিভার প্রেম এবং আত্মত্যাগ, ‘রবিবার’ গল্পে নারীসত্তার এক বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক দিক উন্মোচন


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্পে নারীচরিত্রের আলোচনায় ‘রবিবার’ গল্পটি অনন্য। এই গল্পে বিভা স্বতন্ত্র মনোজগৎ, ব্যক্তিত্ব, আকাঙ্ক্ষা, অভিমান ও আত্মমর্যাদার অধিকারী। সমাজের প্রচলিত বিধিনিষেধ, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং সম্পর্কের জটিলতার মধ্যে দাঁড়িয়েও তারা নিজেদের অস্তিত্বের স্বর খুঁজে নিতে চায়। ‘রবিবার’ গল্পে এই নারীসত্তার এক বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক ও মানবিক দিক উন্মোচিত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা সামাজিক প্রেক্ষাপটে রচিত প্রতিটি ছোটগল্পের শেষ পর্বে নারীচরিত্রের যে বিবর্তন লক্ষ করা যায়, ‘রবিবার’ তার একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। ‘তিন সঙ্গী’ গল্পগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত এই গল্পে সমাজ দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ নারী-পুরুষের প্রেমকে নিছক আবেগ, অধিকার কিংবা দাম্পত্যের প্রচলিত সংজ্ঞার ঊর্ধ্বে বিচার করেছেন | প্রেমের রং তুলির সঙ্গে যুক্ত করেছেন ব্যক্তিস্বাধীনতা, শিল্পবোধ, ধর্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা এবং অপর ব্যক্তির প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধা। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন বিভা এবং অভীক। কিন্তু এই দুই চরিত্রের সম্পর্কের গভীরে প্রবেশ করলে বোঝা যায়, ‘রবিবার’ আসলে এক নারীর অন্তর্জগৎ, তার ভালোবাসার ক্ষমতা এবং নিজের ভালোবাসাকে নিয়ন্ত্রণ করার কঠিন মানসিক শক্তিরও আখ্যান।

বিভা এক ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে। তার পারিবারিক পরিবেশে ধর্মীয় অনুশাসন, আচারবিচার ও সামাজিক মর্যাদার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। অন্যদিকে অভীক সেই পরিবারেরই সন্তান হয়েও প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস ও বংশগত সংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। সে নাস্তিক, স্বাধীনচেতা এবং চিত্রশিল্পী। তার জীবনদর্শন ও বিভার পারিবারিক সংস্কার, এই দুইয়ের মধ্যে রয়েছে গভীর ব্যবধান। বাস্তব জীবনপটে এই বিপরীত মেরুর দুই মানুষের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক অদ্ভুত আকর্ষণ। এই আকর্ষণের ভিত্তি বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি চিন্তার সংঘাত, মানসিক নির্ভরতা এবং একে অপরকে সম্পূর্ণভাবে পাওয়ার অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা।

রবীন্দ্রনাথের কল্পনার জগতে নারী চরিত্রের অধিকাংশই সৌন্দর্যে রত্না| বিভার সৌন্দর্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বর্ণনাও তাৎপর্যপূর্ণ। তার রূপের চেয়ে লাবণ্য বড়। লাবণ্য ব্যক্তিত্বেরও। অভীক বিভার মধ্যে এমন এক সৌন্দর্য আবিষ্কার করে, যা সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। সে বিভাকে শিল্পীর দৃষ্টিতে দেখে। কিন্তু বিভা অভীকের শিল্পীসত্তাকে সেইভাবে স্বীকৃতি দিতে পারে না। অভীকের ছবি নিয়ে অন্যরা যখন উচ্ছ্বসিত হয়, বিভা তখন অনেক সময় অস্বস্তি ও লজ্জা অনুভব করে। কারণ তার চোখে অভীকের প্রতিভার যথার্থ প্রকাশ তখনও ঘটেনি। এই মতপার্থক্য তাদের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক দিক।

বিভার চরিত্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য তার আত্মমর্যাদাবোধ। কলেজের পরীক্ষায় সে অভীককে অতিক্রম করেছিল। কিন্তু সেই সাফল্যে তার মনে আনন্দের পরিবর্তে এক ধরনের অস্বস্তি জন্মেছিল। অভীক পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে, অথচ ছবি আঁকায় সময় ব্যয় করছে, এই বিষয়টি তাকে ব্যথিত করেছিল। সে অভীককে ভালোবাসে, তাই তার ব্যর্থতা মেনে নিতে পারে না। কিন্তু এই ভালোবাসার মধ্যেও রয়েছে প্রত্যাশা। বিভা চায় অভীক তার প্রতিভার যথার্থ প্রতিষ্ঠা অর্জন করুক। সে শুধু একজন প্রেমিককে চায় না, চায় একজন সার্থক শিল্পীকে। এইখানেই বিভা রবীন্দ্রনাথের প্রচলিত প্রেমিকানির্ভর নারীচরিত্র থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। তার প্রেমের মধ্যে আবেগ আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু অধিকারবোধের একচ্ছত্র আধিপত্য নেই। সে অভীককে নিজের কাছে পেতে চায়, অথচ তার শিল্পীসত্তাকে সংসারের সাধারণ বন্ধনে আবদ্ধ করতেও চায় না।

Image: Social Media

বিভার চরিত্রের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশিত হয়েছে শীলা প্রসঙ্গে। অভীক শীলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করে এবং তাকে নিয়ে ঘোরাফেরা করে। এমনকি শীলার জন্য একটি দামি গাড়ি কেনার পরিকল্পনাও করে। অভীকের এই আচরণে বিভার মনে যে আঘাত লাগে, তা সে অস্বীকার করে না। কিন্তু তার ঈর্ষার প্রকৃতি সাধারণ প্রেমিকার ঈর্ষা নয়। সে অভীককে জানায়, তার কষ্টের কারণ শুধু ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়| নারীর প্রতি অভীকের এই অবাধ, অসংযত এবং কখনও কখনও অসম্মানজনক আচরণ। বিভার বক্তব্যে নারীর সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিত্বের প্রশ্নটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে মনে করে, পুরুষের আধুনিকতার নামে নারীর স্বাতন্ত্র্য ও সম্মানকে খাটো করা আধুনিকতার পরিপন্থী। উত্তরাধুনিক চিন্তার আলোকে এমন মনস্তত্ত্ব অত্যন্ত বাস্তবধর্মী|

এখানে শীলার চরিত্রটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শীলা অভীকের জীবনে আধুনিকতার একটি ভিন্ন প্রকাশ। তার মধ্যে রয়েছে প্রচলিত সামাজিক শিষ্টাচারকে অগ্রাহ্য করার প্রবণতা, আত্মপ্রদর্শন এবং পুরুষের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার সাহস। বিভা ও শীলার মধ্যে এই পার্থক্যকে রবীন্দ্রনাথ সরলভাবে ভালো-মন্দের দ্বন্দ্বে পরিণত করেননি। বরং তাঁদের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে নারীর স্বাধীনতা, সামাজিক স্বীকৃতি এবং পুরুষের দৃষ্টিতে নারীর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। শীলা অভীকের কাছে শিল্পীসত্তার সাময়িক প্রেরণা, কিন্তু বিভা তার জীবনের গভীরতর সত্য। অভীক নিজেই শেষ পর্যন্ত এই পার্থক্য স্বীকার করে।

বিভার চরিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভালোবাসার গভীরতা এবং আত্মসংযম। সে অভীককে ভালোবাসে, কিন্তু ভালোবাসার বিনিময়ে নিজেকে ভিক্ষুকের মতো উপস্থাপন করতে চায় না। অভীক যখন তাকে বলে যে সে তাকে ছাড়া থাকতে পারে না, তখন বিভা নিজের আবেগকে অস্বীকার না করেও জানিয়ে দেয় যে সে কাঙালপনা করতে চায় না। এই সংলাপের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ এক আধুনিক নারীর আত্মমর্যাদার পরিচয় দিয়েছেন। নারী ভালোবাসবে, কিন্তু ভালোবাসার জন্য নিজের সমস্ত ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দেবে, এমন ধারণাকে বিভা প্রত্যাখ্যান করে।

আরও পড়ুন:  মনোজ আগরওয়ালের মেয়াদ বাড়াতে কেন্দ্রের ছাড়পত্র

আরও পড়ুন: রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা, পর্ব ৫: হৈমন্তীর বাবার আজও রয়েছে টেলিপ্যাথির জোর

গল্পে বিভার পিতার প্রতি গভীর আনুগত্যও তার চরিত্রের একটি জটিল দিক। মায়ের মৃত্যুর পর পিতার সেবা ও তাঁর ইচ্ছা পালনই হয়ে উঠেছিল বিভার জীবনের প্রধান ব্রত। পিতার আদর্শকে সে নিজের আদর্শ করে নিয়েছে। অভীককে বিয়ে করার ক্ষেত্রে তার প্রধান বাধা ধর্মীয় বিশ্বাসের পার্থক্যের চেয়েও গভীর। সে পিতার ইচ্ছাকে নিজের অস্তিত্বের অংশ করে নিয়েছে। অভীক বারবার তাকে সেই বন্ধন অতিক্রম করতে বললেও বিভা শেষ মুহূর্তে তা পারে না। এখানে প্রশ্ন ওঠে, বিভা কি সত্যিই স্বাধীন? নাকি তার আত্মমর্যাদার আড়ালে রয়েছে পারিবারিক সংস্কার ও পিতৃঋণের এক অদৃশ্য শৃঙ্খল? জীবন উৎকর্ষে সঞ্জাত এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।

কারণ বিভা একই সঙ্গে স্বাধীনচেতা এবং সংস্কারবদ্ধ। সে অভীকের সঙ্গে তর্ক করে, তার ভুল ধরিয়ে দেয়, তার শিল্পীসত্তাকে স্বীকৃতি দিতে নিজের মতো করে চেষ্টা করে| অথচ পিতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের জীবনসঙ্গী নির্বাচন করতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ এখানে নারীর স্বাধীনতার একটি বাস্তব সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন। শিক্ষিত ও আর্থিকভাবে সচ্ছল নারীও অনেক সময় নিজের গভীরতম সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পারিবারিক মূল্যবোধের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে বিভার আর একটি পরিচয় আমাদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। সে কেবল প্রেমে নিমগ্ন নারী নয়| সে সমাজসচেতন, শিক্ষানুরাগী এবং দেশহিতৈষী। তার কাছে অমরবাবু গণিতশাস্ত্রের একজন প্রতিভাবান অধ্যাপক। তিনি আন্তর্জাতিক গণিত সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, কিন্তু আর্থিক অসুবিধার কারণে বিদেশযাত্রা অনিশ্চিত। বিভা তাঁর প্রতিভার যথার্থ মূল্য বোঝে। তাই নিজের অর্থ ব্যবহার করে তাঁকে সাহায্য করার ব্যবস্থা করে। নিজের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি এবং মায়ের দেওয়া গয়না পর্যন্ত সে বিক্রি করতে প্রস্তুত হয়।

Image: AI নির্মিত

এই ঘটনায় বিভার ব্যক্তিত্বের এক অসাধারণ দিক প্রকাশিত হয়। অভীকের জন্য সে একসময় আটশো টাকা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু সেই সাহায্য প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। এবার অমরবাবুর জন্য সে নিজের গয়না বিক্রি করতে উদ্যোগী। পার্থক্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। অভীকের প্রতি তার ভালোবাসা ব্যক্তিগত আবেগের সঙ্গে যুক্ত, আর অমরবাবুর প্রতি তার শ্রদ্ধা যুক্ত হয়েছে বৃহত্তর মানবিক ও জাতীয় কল্যাণের সঙ্গে।

সে বিশ্বাস করে, একজন প্রতিভাবান মানুষের সাফল্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, দেশেরও গৌরব। অভীক যখন বিভাকে প্রশ্ন করে, একজন পুরুষের প্রতিভা বিকাশে সাহায্য করার জন্য একজন নারীকে কেন নিজের গয়না বিক্রি করতে হবে, তখন বিভার উত্তর তার মানবিক দর্শনকে প্রকাশ করে। তার কাছে মহৎ প্রতিভার পাশে দাঁড়ানোই বড় কথা। ব্যক্তিগত সম্পত্তি কিংবা অলংকারের চেয়ে মানুষের সৃষ্টিশীল সম্ভাবনার মূল্য অনেক বেশি। বিভার চরিত্রে প্রেমিকা সত্তা যেমন প্রকট, প্রকট সহমর্মিতাও |

‘রবিবার’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ নারীকে যে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নারী কি কেবল পুরুষের প্রতিভার অনুপ্রেরণা?সে নিজেও প্রতিভার মূল্যায়ন করতে পারে, প্রতিভার বিকাশে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং নিজের সম্পদ উৎসর্গ করতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে নিছক গৃহস্থালির পরিসর থেকে বের করে বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ করে তোলে। অভীক ও বিভার সম্পর্কের মধ্যে এক গভীর বৈপরীত্য বিদ্যমান। অভীক নিজেকে নাস্তিক বলে পরিচয় দেয়, কিন্তু বিভার প্রতি তার ভালোবাসা ক্রমশ তাকে এমন এক স্বর্গীয় অনুভূতির কাছে নিয়ে যায়, যার নিসর্গ চিত্র ব্যাখ্যা যুক্তি দিয়ে সম্ভব নয়। বিভার বিশ্বাস, সংযম ও নৈতিকতার সামনে তার যুক্তিবাদী অহংকার বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে। অন্যদিকে বিভা ধর্মবিশ্বাসী হয়েও অভীকের নাস্তিকতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে পারে না। সে অভীকের চিন্তাকে বোঝার চেষ্টা করে, যদিও তার নিজের বিশ্বাসের ভিত থেকে সরে আসে না।

আরও পড়ুন: রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা,পর্ব ৬: রবীন্দ্রনাথের ‘মাল্যদান’ এবং টেস্টটিউব চিঠির গল্প

এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, নারী-পুরুষের প্রকৃত সম্পর্ক কেবল মতের মিলের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় না। কখনো কখনো মতের অমিলই সম্পর্ককে গভীর করে তোলে। কিন্তু ভালোবাসার গভীরতা থাকলেই যে জীবনের সব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব, তা নয়। বিভা ও অভীকের ক্ষেত্রে ভালোবাসা আছে, শ্রদ্ধা আছে, পারস্পরিক আকর্ষণ আছে, কিন্তু একসঙ্গে জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নেই। গল্পের শেষ পর্বে বিভার মানসিক যন্ত্রণা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। অভীক একসময় তাকে ছেড়ে বিলেতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে জাহাজের স্টোকারের কাজ নিয়ে যাত্রা করে, কারণ নিজের শিল্পীসত্তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে চায়। বিভার কাছ থেকে অর্থসাহায্য না নিয়ে নিজের শ্রমের বিনিময়ে সে বিদেশে যেতে চায়। অভীকের এই সিদ্ধান্তে যেমন রয়েছে আত্মসম্মান, তেমনই রয়েছে বিভার কাছ থেকে নিজের প্রতিভার স্বীকৃতি আদায়ের এক গভীর আকাঙ্ক্ষা। এই উভয় সত্তা তাদের প্রেমকে গভীর করে তোলে।

আরও পড়ুন:  আমতলার পার্টি অফিস ভাঙা মামলায় নতুন মোড়! হাইকোর্টে রাজ্যের বড় দাবি

অভীক চলে যাওয়ার পর বিভার জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত সংযত অথচ মর্মস্পর্শী ভাষায় প্রকাশ করেছেন। বিভার মনে হয়, অভীক হয়তো তার উপর অভিমান করে চলে গিয়েছে, আর কোনও দিন ফিরবে না। সে নিজেকেই দোষী মনে করে। অভীকের ছেলেমানুষি, অবিবেচনা, আবদার, সবকিছুই তখন তার কাছে ভালোবাসার স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে। যে নারী এতক্ষণ নিজের আবেগকে সংযত রেখেছিল, সে এবার নিঃসঙ্গতায় ভেঙে পড়ে। এই কান্না দুর্বলতার নয়| দীর্ঘদিন ধরে সংযত করে গোপন রাখা ভালোবাসার স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ।

অভীকের চিঠি গল্পের শেষ পর্বকে এক অসাধারণ মানবিক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। সেখানে সে স্বীকার করে, বিভার কাছে সে তার শিল্পীসত্তার যথার্থ স্বীকৃতি পায়নি, কিন্তু বিভার সত্যনিষ্ঠাকে সে গভীর মূল্য দিয়েছে। সে জানে, বিভা কৃত্রিম প্রশংসা করতে পারে না। তাই তার কাছ থেকে একদিন যে স্বীকৃতি আসবে, সেটিই হবে সবচেয়ে মূল্যবান। চিঠিতে অভীক বিভাকে অন্য নারীদের থেকে পৃথক করে দেখেছে। অন্য নারীরা তার কাছে নক্ষত্রমণ্ডলীর মতো, কিন্তু বিভা একমাত্র ধ্রুবতারা। চিঠিতে অভীকের নাস্তিক মানসিকতারও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। সে উপলব্ধি করতে শুরু করে, ভালোবাসার মধ্যে এমন এক অলৌকিক সত্য রয়েছে, যা যুক্তি দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায় না।

বিভার ভালোবাসা তাকে নিজের বিশ্বাসের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। সে ভবিষ্যতে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং নিজের বিশ্বাস ও মতবাদ বিভার হাতে সমর্পণ করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে।এখানে বিভার ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সে অভীককে ধর্মান্তরিত করেনি, তার নাস্তিকতাকে জোর করে বদলানোর চেষ্টা করেনি, কিংবা নিজের বিশ্বাসকে তার উপর চাপিয়ে দেয়নি। অথচ তার ভালোবাসা ও নৈতিক ব্যক্তিত্ব অভীকের ভিতরে এক গভীর পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। নারী এখানে পুরুষের জীবনদর্শনের এক নীরব নির্মাতা।

Image: AI নির্মিত

‘রবিবার’ গল্পের বিভাকে সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা করতে গেলে বিশ্লেষকের আতসকাচে কি পাওয়া যায়? সে প্রেমিকা, কন্যা, সমাজসচেতন নারী, শিক্ষানুরাগী এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। তার মধ্যে যেমন রয়েছে ভালোবাসার আকুলতা, তেমনই রয়েছে আত্মসংযমের কঠোরতা। সে যেমন অভীকের জন্য কাঁদে, তেমনই নিজের বিশ্বাস ও সিদ্ধান্তের প্রশ্নে আপস করতে পারে না। সে যেমন অভীকের প্রতিভার বিকাশ চায়, তেমনই অন্য এক প্রতিভাবান মানুষের ভবিষ্যৎ নির্মাণেও নিজের সম্পদ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়।

রবীন্দ্রনাথের নারীচরিত্রের বিবর্তনের দিকে তাকালে বিভাকে এক বিশেষ অবস্থানে দেখতে হয়। ‘নষ্টনীড়’-এর চারুলতা, ‘স্ত্রীর পত্র’-এর মৃণাল, ‘হৈমন্তী’-র হৈমন্তী, ‘ল্যাবরেটরি’-র নীলা ও সোহিনী, প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার প্রতিনিধি। চারুলতার মধ্যে রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক নিঃসঙ্গতা ও অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা, মৃণালের মধ্যে আত্মমুক্তির বিদ্রোহ, হৈমন্তীর মধ্যে সত্যনিষ্ঠা ও নীরব প্রতিবাদ, আর সোহিনীর মধ্যে রয়েছে অসাধারণ আত্মবিশ্বাস ও কর্মক্ষমতা। বিভা তাঁদের থেকে স্বতন্ত্র।

তার বিদ্রোহ প্রকাশ্য নয়, তার প্রতিবাদ উচ্চকণ্ঠ নয়। সে নিজের ভালোবাসা ও আত্মমর্যাদার মধ্যে একটি কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। তবে বিভার আত্মসংযমকে নিছক আত্মত্যাগের মহিমা বলে দেখলে তার চরিত্রের জটিলতা উপেক্ষিত হবে। পিতার ইচ্ছার প্রতি তার আনুগত্য তাকে অভীকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে বাধা দেয়। এই সিদ্ধান্তে তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। সে নিজের জীবনের পূর্ণ অধিকার অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু সেই অসম্পূর্ণতার মধ্যেও সে নিজের ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা ও ভালোবাসার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে।

সবশেষে বলা যায়, ‘রবিবার’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ নারীকে কোনও পুরুষের জীবনের অলংকার হিসেবে দেখেননি। বিভা নিজের স্বতন্ত্র বোধ, চিন্তা ও সিদ্ধান্তের অধিকারী। সে ভালোবাসে, কিন্তু নিজেকে হারায় না; ত্যাগ করে, কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন দেয় না; কাঁদে, কিন্তু নিজের বিশ্বাসের ভিত ভেঙে ফেলে না। শীলা ও বিভার বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে লেখক আধুনিক নারীসত্তার বিভিন্ন প্রকাশও তুলে ধরেছেন।

রবীন্দ্রনাথের কাছে ভালোবাসার চূড়ান্ত সার্থকতা হয়তো অধিকার অর্জনে নয়, বরং অপর মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তাকে চিনতে পারার মধ্যে। বিভা সেই চিনতে পারার ক্ষমতার অধিকারিণী। অভীক যখন দূর সমুদ্রযাত্রায় বেরিয়ে পড়ে, তখন তার সঙ্গে শারীরিকভাবে না থাকলেও বিভা তার মনের গভীরে স্থায়ী হয়ে থাকে। আর এই খানেই ‘রবিবার’ গল্পের নারীচরিত্র বিভা বাংলা ছোটগল্পের এক স্মরণীয় সৃষ্টি হয়ে ওঠে।

দেখুন:

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment