ব্যাঙ্কের অনাদায়ী ও সন্দেহজনক ঋণের হিসাব ঘিরে আয়কর সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলায় বড়সড় স্বস্তি পেল ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্ক। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার (আরবিআই) নির্দেশিকা মেনে সন্দেহজনক ও ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের জন্য সংরক্ষিত অর্থের উপর ৯৬ কোটি ৬৫ লক্ষ টাকার করছাড়ের দাবি খারিজ করা যাবে না। এই মর্মে ব্যাঙ্কের আবেদন মঞ্জুর করল কলকাতা হাই কোর্ট।
বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজ ও বিচারপতি সুদীপ দেবের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দিয়েছে, আয়কর আইনের প্রথম শর্তাধীন বিধানে ‘অ্যাট ইটস অপশন’ বা ‘করদাতার নিজের বিকল্পে’ কথাটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। আইনের এই শব্দবন্ধকে অগ্রাহ্য করা যাবে না। কোনও প্রশাসনিক নির্দেশিকা বা সার্কুলার দিয়ে সংসদে প্রণীত আইনের স্পষ্ট ভাষাকে খর্ব করা সম্ভব নয়।
মামলার সূত্রপাত ২০০৪-০৫ অর্থবর্ষের আয়কর মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে। ব্যাঙ্কের দাবি ছিল, মূল ধারায় অনাদায়ী ও সন্দেহজনক ঋণের জন্য সংরক্ষিত অর্থের উপর করছাড়ের পাশাপাশি, আরবিআইয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী সন্দেহজনক ও ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের জন্য রাখা ৯৬ কোটি ৬৫ লক্ষ টাকার উপরও পৃথক করছাড় প্রাপ্য। কিন্তু আয়কর দফতর সেই দাবি খারিজ করে দেয়। তাদের যুক্তি ছিল, মূল ধারায় একবার করছাড়ের সুবিধা পাওয়া হয়ে গেলে একই আইনের প্রথম শর্তাধীন বিধানের অধীনে নতুন করে করছাড় দাবি করা যায় না।
আয়কর কমিশনার (আপিল) এবং আয়কর ট্রাইব্যুনালও সেই অবস্থানকেই মান্যতা দিয়েছিল। তাদের ব্যাখ্যা ছিল, আইনের ওই শর্তাধীন বিধানটি মূল ধারার বিকল্প মাত্র, অতিরিক্ত করছাড়ের সুযোগ নয়।
এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় ব্যাঙ্ক। তাদের বক্তব্য ছিল, আরবিআইয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী চিহ্নিত নির্দিষ্ট ধরনের সম্পদের জন্য আইনে আলাদা সুবিধার কথা বলা হয়েছে। সেখানে করদাতাকে নিজের বিকল্প বেছে নেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে। ফলে মূল ধারায় করছাড় মঞ্জুর হওয়ার অর্থ এই নয় যে, প্রথম শর্তাধীন বিধানের সুবিধা থেকে ব্যাঙ্ক বঞ্চিত হবে।
দু’পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, আইনের কোনও শব্দকে অকারণ বা অর্থহীন বলে ধরে নেওয়া যায় না। ‘অ্যাট ইটস অপশন’ কথাটির স্বাভাবিক অর্থ বজায় রাখতে হবে। এই বিকল্প বেছে নেওয়ার অধিকার আইন মেনে চলা করদাতার, আয়কর আধিকারিকের নয়। রাজস্ব দফতরের ব্যাখ্যা মেনে নিলে আইনে দেওয়া ওই বিকল্পের কার্যত কোনও অর্থই থাকে না।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, ব্যাঙ্কিং ব্যবসার বিশেষ চরিত্র এবং আরবিআইয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী ঋণ ও সম্পদের শ্রেণিবিভাগের বিষয়টি মাথায় রেখেই সংসদ এই বিশেষ বিধান তৈরি করেছে। তাই বিধানটির উদ্দেশ্যকে গুরুত্ব দিয়েই আইনের ব্যাখ্যা করতে হবে। আগের বছরগুলিতে একই ব্যাখ্যা অনুসরণ করা হয়েছে বলে ভুল ব্যাখ্যাকে বহাল রাখা যায় না। একই ভাবে প্রশাসনিক সার্কুলার বা ব্যাখ্যামূলক নির্দেশিকা আইনের স্পষ্ট বিধানের উপরে স্থান পেতে পারে না।
এই যুক্তিতেই ব্যাঙ্কের ৯৬ কোটি ৬৫ লক্ষ টাকার করছাড়ের দাবি বিকল্প সুবিধা বলে খারিজ করার ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে হাই কোর্ট। তবে করছাড়ের দাবি মঞ্জুর করার আগে সংশ্লিষ্ট আইনি শর্ত, আরবিআইয়ের শ্রেণিবিভাগ এবং নির্ধারিত শতাংশ ও আর্থিক সীমা পূরণ হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে আয়কর আধিকারিককে। আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে আদালত যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, সেই প্রশ্ন আর নতুন করে খোলা যাবে না।

Leave a Comment