ভারতের মাটিতে বসে মায়ানমারের বিদ্রোহীদের ড্রোন যুদ্ধের তালিম, তবু জামিনে বিদেশযাত্রার ছাড়পত্র পেলেন মার্কিন জঙ্গি ভ্যানডাইক: তুলকালাম বিতর্ক

By Suman Debnath

October 23, 2026 6:40 PM

ভারতের মাটিতে বসে মায়ানমারের বিদ্রোহীদের ড্রোন যুদ্ধের তালিম, তবু জামিনে বিদেশযাত্রার ছাড়পত্র পেলেন মার্কিন জঙ্গি ভ্যানডাইক: তুলকালাম বিতর্ক


ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় ভেঙে মিজোরাম হয়ে মায়ানমারের জঙ্গলে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলিকে অত্যাধুনিক ড্রোন যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অথচ জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এমন স্পর্শকাতর মামলায় অভিযুক্ত মার্কিন ভাড়াটে যোদ্ধা (US mercenary) ম্যাথু অ্যারন ভ্যানডাইক (Matthew Aaron VanDyke) এবং ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিকের বিদেশে থাকার মেয়াদ আগামী বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাড়িয়ে দিল দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ আদালত। শুক্রবার এনআইএ-র (National Investigation Agency-NIA) বিশেষ আদালতে সশরীরে হাজিরা দেওয়ার পরেই ভ্যানডাইককে ফের আমেরিকায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে তাঁর সহ-অভিযুক্ত ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিক অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে ভারতে ফেরার নামই করেননি, ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে হাজিরা দিয়েই বিদেশে থাকার মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছেন তাঁরা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং মোদী সরকারের বিদেশনীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে।

মায়ানমারে ড্রোন যুদ্ধের ছক

এই হাই-প্রোফাইল আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের পর্দাফাঁস হয়েছিল খাস কলকাতার বুকে। চলতি বছরের ১৩ মার্চ রাত ন’টা নাগাদ কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ম্যাথু অ্যারন ভ্যানডাইককে গ্রেফতার করে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ। ওই একই অভিযানে দিল্লি থেকে তিন জন এবং লখনউ থেকে আরও তিন জন ইউক্রেনীয় নাগরিককে (হুরবা পেত্রো, স্লিভিয়াক তারাস, ইভান সুকমানোভস্কি, স্তেফানকিভ মারিয়ান, হোনচারুক মাকসিম এবং কামিনস্কি ভিক্টর) পাকড়াও করা হয়।

 এনআইএ-র প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। বৈধ ভিসা নিয়ে ভারতে ঢুকলেও নিষিদ্ধ এলাকার বিশেষ ছাড়পত্র বা রেস্ট্রিক্টেড এরিয়া পারমিট (RAP) ছাড়াই গোপনে মিজোরামে ঢুকেছিলেন এই সাত বিদেশি। সেখান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে মায়ানমারে গিয়ে সামরিক জুন্টা-বিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (CNF) এবং কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মির (KIA) গেরিলাদের অত্যাধুনিক কমব্যাট ড্রোন ওড়ানো, ড্রোন সংযোজন এবং রেডিয়ো ফ্রিকোয়েন্সি জ্যামিং প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন তাঁরা। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে পোড়খাওয়া ইউক্রেনীয় প্রাক্তন সৈন্যদের মোটা টাকার বিনিময়ে মায়ানমারের জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার মূল মস্তিষ্ক ছিলেন এই ভ্যানডাইক।

আরও পড়ুন:  শরৎ এল রে: ছত্তীশগড়ে স্টেশনারি দিয়ে দুর্গাপুজোর মণ্ডপ, বিসর্জনের পর শিশুদের বিলি করা হবে খাতা-কলম

 কে এই ম্যাথু ভ্যানডাইক

 চব্বিশের কোঠা পেরোনো সাধারণ কোনও তরুণ পর্যটক নন এই ম্যাথু ভ্যানডাইক। বাল্টিমোরের বাসিন্দা এবং জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী এই মার্কিন নাগরিক আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় একজন পেশাদার ফরেন ফাইটার বা ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবেই পরিচিত। সন্স অব লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল (Sons of Liberty International-SOLI) নামে একটি বেসরকারি সামরিক ও নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা তিনি।

 ২০১১ সালে লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে মুয়াম্মার গদ্দাফির বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের হয়ে সরাসরি বন্দুক হাতে লড়েছিলেন ভ্যানডাইক, এমনকি গদ্দাফি বাহিনীর হাতে যুদ্ধবন্দিও হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সিরিয়া ও ইরাকে আইএস-বিরোধী যুদ্ধে স্থানীয় খ্রিস্টান মিলিশিয়াদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া থেকে শুরু করে ইউক্রেন যুদ্ধেও সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাঁর। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মায়ানমারে চিনের প্রভাব খর্ব করতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ বা পশ্চিমি শক্তিগুলির যে ছায়াযুদ্ধ চলছে, ভ্যানডাইকের দলবল ছিল তারই অগ্রণী বাহিনী। আর সেই ভূ-রাজনৈতিক খেলার করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল।

দ্বিচারিতার অভিযোগে সরব বিরোধীরা

 এই মামলার সবচেয়ে বিতর্কিত এবং রহস্যজনক দিকটি হল এনআইএ-র চার্জশিট থেকে সন্ত্রাসদমন আইন ইউএপিএ (UAPA) উধাও হয়ে যাওয়া। মার্চ মাসে গ্রেপ্তারির সময়ে ভ্যানডাইক ও ছয় ইউক্রেনীয়র বিরুদ্ধে ইউএপিএ-র মতো জামিন-অযোগ্য কড়া ধারা প্রয়োগ করেছিল এনআইএ। প্রায় ১৮০ দিন তিহাড়ের ৮ ও ৯ নম্বর জেলে বন্দি ছিলেন ভ্যানডাইক।

 কিন্তু গত ১ সেপ্টেম্বর আচমকাই ভ্যানডাইকের পরিবারের তরফে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে তিহাড়ে নির্জন কারাবাসের অভিযোগ তোলা হয় এবং মার্কিন সরকারের জরুরি কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়। আশ্চর্যজনকভাবে তার কয়েক দিনের মধ্যেই সেপ্টেম্বরের গোড়ায় এনআইএ যে চার্জশিট পেশ করে, তাতে ইউএপিএ-র কোনও ধারাই রাখা হয়নি। কেবলমাত্র ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্টের ২১ ও ২৩ ধারায় (যা জরিমানা দিয়েই মিটিয়ে নেওয়া সম্ভব) চার্জশিট দেওয়ায় সহজেই ডিফল্ট বেল বা বিধিবদ্ধ জামিন পেয়ে যান সাত বিদেশি এবং সেপ্টেম্বর মাসেই আদালত তাঁদের এক মাসের জন্য নিজেদের দেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়।

আরও পড়ুন:  ব্রিকসের নৈশভোজে পুতিন-জিনপিংয়ের পাশে শুভেন্দু, মুম্বাইয়ে আম্বানির সঙ্গে বৈঠক

 এনআইএ-র এই ইউ-টার্ন নিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে কাঠগড়ায় তুলেছে বিরোধী দল কংগ্রেস। দলের বর্ষীয়ান নেতা জয়রাম রমেশ প্রশ্ন তুলেছেন, ওয়াশিংটনের দাদাগিরি ও চাপের কাছে মাথা নত করেই কি এক মার্কিন ভাড়াটে যোদ্ধার ঘাড় থেকে সন্ত্রাসবাদের ধারা সরিয়ে নিল মোদী সরকার? এই ছাড় দেওয়ার বিনিময়ে আমেরিকার কাছ থেকে ঠিক কী প্রতিদান পাচ্ছে নয়াদিল্লি? নাগরিক সমাজের একাংশেরও প্রশ্ন, দেশের মাটিতে ছাত্রনেতা, সমাজকর্মী বা সাংবাদিকদের ইউএপিএ ধারায় বছরের পর বছর বিনা বিচারে জেলে পচতে হয়, এমনকি জাতীয় পতাকা নিয়ে প্রতিবাদ করলেও তিহাড়ে যেতে হয়। অথচ বিদেশের মাটিতে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের ড্রোন যুদ্ধের তালিম দিতে এসে ধরা পড়া এক মার্কিন নাগরিকের ক্ষেত্রে রাতারাতি আইন নরম হয়ে যায় কীভাবে?

নিজের উকিল নিজেই

 এক মাস আমেরিকায় পরিবারের সঙ্গে কাটিয়ে আদালতের শর্ত মেনে শুক্রবার দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ আদালতে হাজিরা দিতে এসেছিলেন ভ্যানডাইক। কিন্তু অভিযুক্তের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর বদলে আদালতের বাইরে সংবাদসংস্থার ক্যামেরার সামনে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের সুর শোনা গেল তাঁর গলায়। ভ্যানডাইকের সাফ বক্তব্য, তাঁর বিরুদ্ধে এই মামলা আর টেনে নিয়ে যাওয়ার কোনও যৌক্তিকতাই নেই।

 আর্থিক অনটনের কারণে নিজের আইনজীবীকেও ছাড়িয়ে দিয়েছেন জানিয়ে মার্কিন যোদ্ধা বলেন, টাকার সমস্যাই এখন মূল বিষয়, তাই এবার থেকে নিজের সওয়াল তিনি নিজেই করবেন। মার্কিন দূতাবাসের কাছ থেকে কোনও সাহায্য পাওয়ার কথাও অস্বীকার করেছেন তিনি। যদিও এনআইএ-র আইনজীবী রাহুল ত্যাগী আদালতে দাবি করেছেন যে ইউএপিএ সংক্রান্ত তদন্ত এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং ভবিষ্যতে অতিরিক্ত চার্জশিট পেশ করা হতে পারে। কিন্তু ছয় ইউক্রেনীয় অভিযুক্ত যেভাবে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ইউক্রেনে বসেই ভিডিও কনফারেন্সে হাজিরা সেরে ফেললেন এবং ভ্যানডাইকও ফের চার মাসের জন্য আমেরিকায় উড়ে যাওয়ার ছাড়পত্র পেলেন, তাতে এই হাই-প্রোফাইল মামলার ভবিষ্যৎ যে কোন দিকে গড়াচ্ছে তা নিয়ে ঘোরতর সংশয় তৈরি হয়েছে।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment