ফ্রান্স জুড়ে বিক্ষোভ, দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি ম্যাক্রোঁর

By Suman Debnath

October 18, 2026 12:55 PM

ফ্রান্স জুড়ে বিক্ষোভ, দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি ম্যাক্রোঁর


দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বাড়তে থাকা খরচ এবং সরকারি পরিষেবার অবনতির প্রতিবাদে উত্তাল ফ্রান্স (France Protests)। শনিবার দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ঘিরে বিভিন্ন জায়গায় হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি ভবন, দোকানপাট ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই পরিস্থিতিতে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।

শনিবারের বিক্ষোভে (France Protests) কয়েক লক্ষ মানুষ রাস্তায় নামেন। রাজধানী প্যারিস-সহ দেশের একাধিক শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গিয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে খারাপ পরিবেশ এবং শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার প্রতিবাদে পড়ুয়ারাও এই আন্দোলনে যোগ দেন। আগামী ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এই বিক্ষোভ ফ্রান্সের সরকারের উপর চাপ আরও বাড়াতে পারে বলে খবর।

সরকারি ভবন ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলার নিন্দা করেছেন ম্যাক্রোঁ। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীদের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, হিংসা ও বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের মুখোমুখি হতে হবে।

ম্যাক্রোঁর কথায়, ‘যারা বিশৃঙ্খলা ছড়ায়, প্রতিষ্ঠানগুলিকে ধ্বংস করতে চায় এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে নিজেদের দাবি জানানোর অধিকার অন্যদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব।‘

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, দেশজুড়ে প্রায় ১১০টি বিক্ষোভ কর্মসূচিতে মোট ৫ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্যারিসে ছিলেন প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার। তবে আন্দোলনকারীদের আয়োজকদের দাবি, বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৮ লক্ষ।

আরও পড়ুন:  প্রযুক্তিগত ত্রুটিতে ব্রিটেনজুড়ে বিমান পরিষেবায় বিভ্রাট, বাতিল প্রায় ১৩০০ উড়ান

সরকারি প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভ ঘিরে প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দোকানপাট, পুলিশকেন্দ্র এবং সরকারি ভবনে হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎপর হয় প্রশাসন।

প্যারিসে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ও আতশবাজি ছোঁড়েন বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি সামাল দিতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। রাজধানীর একাধিক এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বেশ কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে।

প্যারিসের বাইরেও হিংসা ছড়িয়েছে। লিমোজ শহরের পুরসভা ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। মার্সেই, লিয়ঁ এবং লিল-সহ অন্যান্য শহরেও সরকারি ভবন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগ উঠেছে।

সাঁ-এতিয়েন শহরে এক তরুণ বিক্ষোভকারীর হাতে গুরুতর আঘাত লাগে। পুলিশের ব্যবহৃত গ্রেনেডের কারণে ওই আঘাত লেগেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে।

আরও পড়ুন: চোরবাগান ঘটনায় গ্রেপ্তার পুজো কমিটির দুই কর্তা-সহ সাত জন, আহতদের মেডিক্যাল কলেজে দেখতে অমিত শাহ

বিক্ষোভের সময় ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। তাঁর অভিযোগ, অতি-বামপন্থী উগ্র গোষ্ঠী এবং সুযোগসন্ধানী দুষ্কৃতীরা আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন শহরে হিংসা ছড়িয়েছে।

সমাজমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘আজ অতি-বামপন্থী গোষ্ঠীগুলি ফ্রান্সের একাধিক শহরে হিংসার ঘটনা ঘটিয়েছে। দুষ্কৃতীরাও লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞে যোগ দিয়েছে।‘

পুলিশের পদক্ষেপের পক্ষেও সওয়াল করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, আগামী ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে হিংসার মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না। লেকর্নু বলেন, ‘হিংসার মাধ্যমে কেউ নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি চাপিয়ে দিতে পারবে না।‘

আরও পড়ুন:  কিয়েভে ড্রোন হামলা রাশিয়ার, মৃত ১৭, আহত বহু

ফ্রান্সের বিক্ষোভ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও। তাঁর দাবি, অভিবাসন নীতির সঙ্গে এই ধরনের অস্থিরতার যোগ রয়েছে।

লিমোজ শহরের পুরসভা ভবনে আগুন লাগার ভিডিও-সহ এক্সে পোস্ট করে ভ্যান্স পশ্চিমের উদারপন্থী রাজনীতিকদের অভিবাসন এবং অভিবাসীদের সমাজের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার বিষয়গুলি উপেক্ষা করার অভিযোগ করেন। একই ধরনের অস্থিরতা আমেরিকাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। পাশাপাশি, মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটদের নীতির সঙ্গে ফ্রান্সের পরিস্থিতির তুলনা করেন ভ্যান্স।

আরও পড়ুন: চোরবাগান পদপিষ্টের ঘটনায় ঘোষণা এবং নিরাপত্তারক্ষীদের বারবার বাঁশি বাজানোয় কি হুড়োহুড়ি? 

ফ্রান্সজুড়ে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে স্কুলের পরিবেশ, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ এবং পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলে ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন করছিলেন। শনিবারের বিক্ষোভে সেই অসন্তোষও প্রতিফলিত হয়েছে।

এই আন্দোলনকে ঘিরে ২০১৮ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের স্মৃতিও ফিরে এসেছে। সে বছর জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বৃহত্তর প্রতিবাদে পরিণত হয়েছিল।

ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের কয়েক জন প্রাক্তন কর্মী বর্তমান বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে শনিবারের কর্মসূচি তাঁদের আন্দোলনের সংগঠিত উদ্যোগে হয়েছে কি না, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি পরিষেবার অবনতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা—একাধিক বিষয়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষ সাম্প্রতিক বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। মাক্রোঁর দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে এই অসন্তোষ ফরাসি প্রশাসনের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

দেখুন:

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment