নতুন ফর্ম ৬-এ সিলমোহর দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট, কমিশনের দাবিতে প্রশ্ন শীর্ষ আদালতের

By Suman Debnath

October 12, 2026 6:10 PM

নতুন ফর্ম ৬-এ সিলমোহর দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট, কমিশনের দাবিতে প্রশ্ন শীর্ষ আদালতের


প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ জানায়, আদালতের আগের পর্যবেক্ষণকে নতুন ফর্ম ৬-এর সাংবিধানিক বৈধতা সম্পর্কে বিচারবিভাগীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। নতুন ফর্ম নিয়ে আদালত কোনও রায় দেয়নি, এটাই তাদের বক্তব্য। এক আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বেঞ্চ জানায়, আদালতের বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।

বিচারপতি বাগচী স্পষ্ট করেন, ৫ অক্টোবর প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের অর্থ ছিল, বিহারের বিশেষ নিবিড় সংশোধন সংক্রান্ত রায় দেওয়ার সময় সংশোধিত ফর্মটি চালু হয়নি। তার অর্থ এই নয় যে, সুপ্রিম কোর্ট ফর্মটির অনুমোদন দিয়েছে বা তা খারিজ করেছে। আদালত জানায়, বিষয়টি তাদের নজরে আসায় এবার তা খতিয়ে দেখা হবে। আগামী ২৭ অক্টোবর বিশেষ নিবিড় সংশোধন সংক্রান্ত মামলাগুলির সঙ্গে এই মামলাটিও শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই দিন নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও বৃহত্তর চ্যালেঞ্জের শুনানি হওয়ার কথা।

গত ৫ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, ফর্ম ৬-এ কোনও সংশোধন তারা অনুমোদন করেনি। পরিবর্তনগুলি কে অনুমোদন করেছে এবং সেগুলির প্রকৃতি কী, তা জানতে নথি তলব করেছিল আদালত। নির্বাচন কমিশনের অনলাইন পোর্টালে থাকা ফর্মে কথিত পরিবর্তনকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া আবেদনের ভিত্তিতে নোটিসও জারি করা হয়।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যুক্ত একটি অতিরিক্ত ঘোষণা। সেখানে আবেদনকারীকে জানাতে হচ্ছে, তাঁর নিজের নাম অথবা তাঁর বাবা-মা কিংবা দাদু-ঠাকুমার নাম আগের বিশেষ নিবিড় সংশোধনে তৈরি ভোটার তালিকায় ছিল কি না। চলতি সংশোধন প্রক্রিয়ার মধ্যে অনলাইন আবেদনপত্রে এই ঘোষণা যুক্ত করা হয়। এর আইনি ভিত্তি কী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে প্রথমবার ভোটার হতে চাওয়া তরুণ-তরুণী এবং আগে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার পরে ফের নাম তুলতে চাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই শর্তের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন:  তুরস্ক থেকে মাদক পাচারে অভিযুক্ত নভপ্রীতকে ভারতে ফেরানো হল ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’, মন্তব্য শাহের

গত ২৬ সেপ্টেম্বরের একটি বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন কমিশন দাবি করেছিল, বিশেষ নিবিড় সংশোধনের ক্ষেত্রে ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত ঘোষণাটি সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদন করেছে। কমিশনের বক্তব্য ছিল, ১৯৬০ সালের নির্বাচক নিবন্ধন বিধিতে নির্ধারিত মূল ফর্ম ৬ অপরিবর্তিত রয়েছে। অতিরিক্ত ঘোষণাটি কেবল বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ার জন্য যুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের এই দাবির পরেই আদালতের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

মনে করা হচ্ছে, কমিশন বিহারের বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের মে মাসের রায়ের কথা উল্লেখ করেছিল। ওই মামলায় ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় অতিরিক্ত নথি চাওয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা খতিয়ে দেখেছিল আদালত। কিন্তু ফর্ম ৬-এর সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত অতিরিক্ত ঘোষণাটি তার পরে চালু করা হয়।

২০২৫ সালে বিহারের বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ‘অ্যানেক্সার ডি’ নামে একটি ঘোষণাপত্রের উল্লেখ ছিল। ফর্ম ৬ পূরণকারীদের সেই ঘোষণা জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তবে সেখানে আবেদনকারীর বাবা-মা বা দাদু-ঠাকুমার আগের বিশেষ নিবিড় সংশোধনে যাচাইয়ের তথ্য চাওয়া হয়নি। চলতি বছরের জুলাই মাসে ফর্মে এই অতিরিক্ত পরিবর্তনের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

আইনি বিতর্কের মূল প্রশ্ন, নির্ধারিত বিধি সংশোধন না করেই অনলাইন আবেদনপত্রে নতুন শর্ত আরোপ করা যায় কি না। জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ২৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করে কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচক নিবন্ধন বিধি তৈরি করে। সেই বিধিতে পরিবর্তন আনতে হলে নির্ধারিত আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সংশোধিত বিধি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রকাশ করা এবং সংসদে পেশ করার বিধানও রয়েছে।

ফর্ম ৬ মূলত ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদনপত্র। ফলে অতিরিক্ত ঘোষণার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। কোনও তরুণ ভোটারের নাম আগের বিশেষ নিবিড় সংশোধনের তালিকায় না থাকাই স্বাভাবিক হতে পারে। আবার আগে নাম বাদ পড়েছে, এমন কেউ পুনরায় নাম তুলতে গেলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগসূত্রের তথ্য দিতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে পারেন। ফলে নতুন শর্তের পরিধি ও বৈধতা যোগ্য নাগরিকদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

আরও পড়ুন:  টিকিট নেই, টিটিইর সঙ্গে বচসা! আচমকাই নিজের পোশাক ছিঁড়ে ‘নাটক’, ভাইরাল ভিডিওতেই ফাঁস তরুণী

৫ অক্টোবর মামলার শুনানিতে আবেদনকারীর পক্ষে সওয়াল করে প্রবীণ আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী জানিয়েছিলেন, ফর্ম ৬-এ দুটি নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। আদালত তখনই স্পষ্ট করে দেয়, এই পরিবর্তন তারা অনুমোদন করেনি। সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে সংশ্লিষ্ট নথি খতিয়ে দেখতে চায় বেঞ্চ।

একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনার বিবেক যোশী ও সুখবীর সিং সান্ধুও ফর্ম ৬-এর পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, নির্বাচক নিবন্ধন বিধি, ১৯৬০-এ ফর্মটি নির্দিষ্ট করে দেওয়া রয়েছে। তাই আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে শুধু অনলাইন সংস্করণে বদল এনে ফর্মটির শর্ত পরিবর্তন করা যায় না।

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, মূল বিধিবদ্ধ ফর্ম ৬-এ কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। বিশেষ নিবিড় সংশোধনের সময়ের জন্যই অতিরিক্ত ঘোষণাটি যুক্ত করা হয়েছিল। কমিশন পরে জানায়, সংশোধন প্রক্রিয়া চলাকালীনই ওই ঘোষণা প্রযোজ্য হবে। যে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিতে বিশেষ নিবিড় সংশোধন শেষ হয়েছে, সেখানে অনলাইন ফর্ম থেকে অতিরিক্ত ঘোষণাটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই অঞ্চলগুলিতে আবেদনকারীরা ফের ১৯৬০ সালের বিধিতে নির্ধারিত মূল ফর্ম ৬ ব্যবহার করছেন।

ফলে নতুন ফর্ম ৬-এর বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত অবস্থান এখনও স্পষ্ট নয়। আগামী ২৭ অক্টোবর মামলাটির শুনানিতে এই অতিরিক্ত ঘোষণার আইনি ভিত্তি এবং তা চালুর পদ্ধতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment