কলকাতার মহাজাতি সদনে ‘ঊমা সম্মান’ পেলেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। ৮ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার ‘লে রিদম’-এর উদ্যোগে আয়োজিত ‘শিকল ভাঙার গল্প’ অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এই সম্মান তুলে দেওয়া হয়। নিজের লেখা কবিতা পাঠের পাশাপাশি নারীর বেদনা, প্রেম ও মুক্তির কথাও তুলে ধরেন তিনি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে বাংলায় থাকার এবং কলকাতা বইমেলায় আসার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন তসলিমা।
নতুন সরকারের আমলে বাংলার পরিস্থিতি নিয়ে নিজের ভাল লাগার কথা জানিয়ে তসলিমা বলেন, “নতুন সরকারের আমলে ভাল আছে রাজ্য। অনেকেই আমাকে বলেছেন। আমারও ভাল লাগছে। এক সরকার তাড়িয়েছিল। এক সরকার আসতে দেয়নি। আরেক সরকার আমাকে নিয়ে এল। অনেক পার্থক্য।” কলকাতা বইমেলায় আসতে চান, বাংলায় থাকতে চান, বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে চান বলেও জানিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন বাংলার বাইরে থাকা লেখিকার এই ইচ্ছা প্রকাশ অনুষ্ঠানের অন্যতম তাৎপর্য হয়ে ওঠে।
‘লে রিদম’ ও ‘দিশাশক্তি নিউজ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তসলিমা ‘মায়ের কাছেও চিঠি’সহ নিজের লেখা একাধিক কবিতা পাঠ করেন। তাঁর লেখা এবং অন্যান্য কবিতা অবলম্বনে গান পরিবেশন করেন সোমদত্তা বন্দ্যোপাধ্যায়, মৌসুমী হোসেন ও পিয়ালী হালদার। গানে সুর দিয়েছেন মৌসুমী হোসেন। দেবী বন্দনার নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন মৈত্রেয়ী পাহাড়ী।
অনুষ্ঠানের মূল ভাবনা ছিল নারীর লড়াই, আত্মপ্রকাশ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। সেই প্রসঙ্গে তসলিমা বলেন, “নারীর বেদনা, প্রেম আর মুক্তির গান নিয়েই আজকের এই অনুষ্ঠান।” তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি নারীর সামাজিক অবস্থান ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও উঠে আসে।
সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা মহিলাদের এ দিন ‘ঊমা সম্মান’ দেওয়া হয়। পাশাপাশি কয়েক জন বিশিষ্ট নাগরিককে প্রয়াত সঙ্গীতশিল্পী রিনি মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে ‘রিনি মুখোপাধ্যায় লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়। সদ্যপ্রয়াত সঙ্গীতশিল্পী বিভা সেনগুপ্তকে মরণোত্তর সম্মান জানানো হয়। তাঁর পরিবারের সদস্যদের হাতে সেই সম্মান তুলে দেওয়া হয়। সম্মানিতদের মধ্যে ছিলেন বিধায়ক রত্না দেবনাথ, টেরাকোটা শিল্পী দোলন কুণ্ডু মণ্ডল ও মৈত্রেয়ী পাহাড়ী-সহ আরও কয়েক জন কৃতী মহিলা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়, পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, স্বামী কৃপাকরানন্দ মহারাজ, জাদুকর পি সি সরকার জুনিয়র, পানিহাটির বিধায়ক রত্না দেবনাথ এবং পি সি চন্দ্র গোষ্ঠীর ম্যানেজিং ডিরেক্টর অরুণকুমার চন্দ্র ও জয়েন্ট ডিরেক্টর শুভ্র চন্দ্র। তাপস রায় বলেন, “আজকের এই অনুষ্ঠানে এসে ভাল লাগছে। মায়েদের, দিদিদের পেলাম। সকলেই জীবন্ত দুর্গা।”
দিল্লিভিত্তিক অলাভজনক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘লে রিদম’ ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতির প্রসার, নারীর ক্ষমতায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করে। সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা রাজীব মুখোপাধ্যায় বলেন, “ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে একটি বলিষ্ঠ সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে রিনি মুখোপাধ্যায় ‘লে রিদম’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজ আমরা তাঁর সেই ধারাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং শিল্পকে সামাজিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
তবে এ দিনের অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে তসলিমা নাসরিনের হাতে ‘ঊমা সম্মান’ তুলে দেওয়া এবং তাঁর কলকাতা বইমেলায় আসার ইচ্ছা প্রকাশ। বাংলায় থাকা ও ঘুরে বেড়ানোর আকাঙ্ক্ষার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর সেই ইচ্ছা বাস্তবে কতটা পূরণ হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।







Leave a Comment