এই রাজবাড়ি ছিল বিপ্লবীদের আস্তানা। রাজপ্রসাদের ভিতরেই তৈরি হত অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের অস্ত্র। রাতের আঁধারে রাজা বা তাঁর বিশ্বস্ত রাজ কর্মচারীরা সেই অস্ত্র ও রসদ নিয়ে পৌঁছে যেতেন বিপ্লবীদের গোপন আস্তানায়। সেই রাজবাড়ি আজ ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে। এটি হল বাঁকুড়ার রানিবাঁধ ব্লকের অম্বিকানগর (Ambikanagar) রাজবাড়ি। এই রাজবাড়িতে হত দুর্গা পুজো। যাকে ঘিরে চলত বিপ্লবীদের আনাগোনা। প্রায় ৪১৪ বছরের পুরনো এই রাজবাড়ির পুজো। রাজপাট না থাকলে সেই পুরনো স্মৃতি নিয়ে আজও রাজবাড়িতে পুজো হয়ে চলেছে।
অম্বিকানগরের (Ambikanagar) প্রথম রাজা হলেন খড়গেশ্বর ধবল দেব। ১৬১১ সালে তিনি রাজা হন। রাজা হয়েই তিনি রাজপ্রসাদ তৈরি করেন। জাঁক-জমক সহকারে পুজো শুরু হয়। ১৯০৬-০৮ সালে অম্বিকানগরের ষষ্ঠ রাজা রাইচরণ ধবল দে (Raichaaran Dhabal Dev) বিপ্লবী কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর আমলেই অম্বিকানগর রাজত্বের মধ্যে থাকা ছেঁদাপাথরের জঙ্গলে গোপনে বিপ্লবীদের জন্য বারুদ ও বোমার কারখানা তৈরি হয়।
কথিত রয়েছে রাজা রাইচরণ ধবল দেব (Raichaaran Dhabal Dev) প্রায়ই নিজে গভীর রাতে ঘোড়া ছুটিয়ে পৌঁছে যেতেন সেখানে। তিনি নিজের উদ্যোগে অম্বিকানগর (Ambikanagar) ও ছেঁদাপাথর এলাকায় দু’টি সশস্ত্র বিপ্লবী বাহিনি গড়ে তুলে ছিলেন। প্রফুল্ল চাকি, বারীন ঘোষ, নরেন গোস্বামী, ভূপেশ দত্ত-সহ ক্ষুদিরাম বসুর মত বিপ্লবীরা গোপনে বৈপ্লবিক কাজকর্ম চালাতেন রানিবাঁধের জঙ্গলমহলের ছেঁদাপাথরে। সেই সূত্র ধরে রাজা রাইচরণ ধবল দেবের (Raichaaran Dhabal Dev) (Raichaaran Dhabal Dev) বাড়ির দুর্গাপুজোয় অনেক বিপ্লবী আসতেন। পুজো দিয়ে মায়ের নামে শপথ নিয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতেন। তাই এই পুজো ‘বিপ্লবীদের পুজো’ হিসেবে পরিচিত। রাজা রাইচরণ ধবল দেব ‘বিপ্লবী’ রাজা হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: প্রতিমার সৌন্দর্য বাড়ায় চালচিত্র
আর বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ডের নিয়মিত খোঁজ রাখত ব্রিটিশ গুপ্তচররা। একবার পুরীর পান্ডার ছদ্মবেশে এক গুপ্তচর আশ্রয় নিয়েছিল অম্বিকানগর (Raichaaran Dhabal Dev) রাজবাড়ির সিংহদ্বারের কুঠুরিতে। অম্বিকানগরের (Ambikanagar) রাজাকে শায়েস্তা করতে অম্বিকানগর (Raichaaran Dhabal Dev) রাজত্ব নিলাম করে দেয় ব্রিটিশ সরকার। প্রথমে এই রাজত্ব কিনে নেয় কলকাতার এক জমিদার। পরে বিহারের দ্বারভাঙার রাজার হাতে চলে যায় অম্বিকানগর। এতেও বিপ্লবী কর্মকাণ্ড বন্ধ না হওয়ায় পরে চালর্স টেগার্ট বিশাল বাহিনি নিয়ে রাজবাড়িতে হানা দেয়।
আলিপুর বোমা মামলায় গ্রেপ্তার হন রাজা রাইচরণ ধবল দেব (Raichaaran Dhabal Dev) ও তাঁর তিন সঙ্গী। যদিও পরবর্তীতে রাজসাক্ষী নরেন গোঁসাই খুন হওয়ায় প্রমাণের অভাবে মুক্তি পেয়ে যান রাজা রাইচরণ-সহ বহু বিপ্লবী। মুক্তি পেয়ে সেবার দুর্গাপুোজর ষষ্ঠীর দিন সঙ্গীদের নিয়ে অম্বিকানগরে (Raichaaran Dhabal Dev) ফেরেন রাইচরণ। তার কয়েক বছর পরেই ১৯২৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। রাইচরণের সময়কালে পুজোর ক’দিন অম্বিকানগরে আত্মগোপন করে থাকতেন বহু বিপ্লবী।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: দ্বারকানাথ ঠাকুরের পুজোর জাঁকজমকই ছিল আলাদা, স্ত্রীর মুখের আদলে তৈরি করতেন মূর্তি
সংস্কারের অভাবে ধীরে ধীরে কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে এই বিশাল রাজপ্রাসাদ। এক সময় আশপাশের এলাকার দুর্গা পুজো না হওয়ায় অম্বিকানগর (Raichaaran Dhabal Dev) রাজবাড়ির পুজো দেখতে ভিড় জমাতেন গোটা জঙ্গলমহলের মানুষ। গত দু-দশক এলাকায় বহু নতুন পুজো শুরু হয়েছে। কিন্তু রাজ বাড়ির দুর্গাপুজোর জনপ্রিয়তা এখনও অটুটই থেকে গিয়েছে।
বর্তমানে এই পুজো সর্বজনীন রূপ নিয়েছে। রাজ ঐতিহ্য মেনে আজও সন্ধিপুজোর প্রতিটি নির্ঘণ্ট ঘোষিত হয় তোপধ্বনিতে। শাক্তমতে মায়ের পুজো হয়। তিন দিন ছাগ বলি হয়। পুজোর ক’টা দিন মোরগ লড়াই, কাঠিনাচ, পুতুলনাচ, ছৌ-নাচ-সহ নানা অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। আট থেকে আশি সবাই এই রাজবাড়ির দুর্গোৎসবে সামিল হন।
দেখুন:
Leave a Comment