দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে গোটা বাংলা। কিন্তু এই বিপুল জনসমাগমের মধ্যে সামান্য অসাবধানতাও ডেকে আনতে পারে বড়সড় বিপদ। তাই দুর্গাপুজো এবং কালীপুজো নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখতে একগুচ্ছ কড়া পদক্ষেপ ঘোষণা করল রাজ্য দমকল ও জরুরি পরিষেবা দপ্তর (West Bengal Fire & Emergency Services Department)। এবার অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে নজরদারি চালানোরও পরিকল্পনা করা হয়েছে।
নিউ টাউনের দমকল অফিসে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের প্রস্তুতি বৈঠকের পর দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী জানান, মহালয়া থেকে শুরু করে জগদ্ধাত্রী পুজো পর্যন্ত গোটা রাজ্য জুড়ে বিশেষ সতর্কতা জারি থাকবে। রাজ্যের ৬০ হাজারেরও বেশি পুজোমণ্ডপকে এই সুরক্ষা বলয়ের আওতায় আনা হচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন, পুজোমণ্ডপগুলির অগ্নি-সুরক্ষা খতিয়ে দেখার কাজ অবিলম্বে শুরু হবে। দেখা হবে, মণ্ডপ কতটা মজবুত। পরীক্ষা করা হবে, আপৎকালীন পরিস্থিতিতে সেখান থেকে বেরোনোর পথ (Emergency exit routes) কতটা চওড়া ও বাধাহীন। মণ্ডপ তৈরিতে ব্যবহৃত কাপড় ও সামগ্রীতে অগ্নি-প্রতিরোধক রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা বাধ্যতামূলকভাবে দেখা হবে। পাশাপাশি প্রতিটি পুজো কমিটির সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকদের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (Fire extinguisher) ব্যবহারের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি সব কমিটির তথ্য নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস প্রস্তুত করা হচ্ছে।
এছাড়াও অগ্নি-সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ করতে পরিকাঠামোয় বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ রদবদল আনা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, গত বছর রাজ্যে ৯৯টি অস্থায়ী দমকল কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছিল। ভিড় ও বিপদের ঝুঁকি মাথায় রেখে এ বার সেই সংখ্যা বাড়িয়ে করা হবে ১০৯টি। পুজোর দিনগুলিতে অর্থাৎ, সপ্তমী থেকে দশমী, দুপুর ৩টে থেকে ভিড় না কমা পর্যন্ত এই কেন্দ্রগুলি সম্পূর্ণ সক্রিয় থাকবে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, উত্তর কলকাতা, দক্ষিণ কলকাতা এবং বিভিন্ন জেলার ঘিঞ্জি ও সরু গলিতে বড় দমকলের ইঞ্জিন ঢুকতে সমস্যা হয়। এই সমস্যার মোকাবিলায় নামানো হচ্ছে ৩৫০টিরও বেশি মোটরসাইকেল-মাউন্টেড কমপ্রেসড এয়ার ফোম সিস্টেম (Compressed Air Foam System) বা CAFS ইউনিট। প্রতিটি ডিভিশনাল ফায়ার অফিসার (DFO) অন্তত চারটি করে এমন বাইক মোতায়েন রাখা হবে।
এর বাইরে দমকল দপ্তর সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ পুজোগুলির কাছে ৫০টি ‘ফায়ার সেফটি অ্যাওয়ারনেস কিয়স্ক’ তৈরি করবে। গত বছর এমন কিয়স্কের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫টি। সেখানে আধুনিক সরঞ্জামের প্রদর্শনীর পাশাপাশি হবে লাইভ মহড়াও।
কৌশিকবাবুর সংযোজন, আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কলকাতা পুলিশের সদর দপ্তর লালবাজার এবং জেলা পুলিশ সদর দপ্তরের কন্ট্রোল রুমে দমকলের বিশেষ প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। বিকেল ৪টে থেকে ভিড় নিয়ন্ত্রণ শেষ হওয়া পর্যন্ত পুলিশ ও দমকলের যৌথ সমন্বয় বজায় রাখা হবে। একই সঙ্গে দমকলের সেন্ট্রাল ওয়ার্কশপ ২৪ ঘণ্টাই খোলা রাখা হচ্ছে, যাতে কোনও গাড়ি বা সরঞ্জামে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে তা দ্রুত মেরামত করে নামিয়ে দেওয়া যায়।
পুজোর দিনগলিকে নিরাপদ করতে পুজো উদ্যোক্তা ও দর্শনার্থীদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা জারি করেছে দমকল দপ্তর। বিশেষত উদ্যোক্তাদের জন্য দমকলের স্পষ্ট নির্দেশ– আপৎকালীন বহির্গমন পথ সর্বদা সম্পূর্ণ ফাঁকা রাখতে হবে। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র সহজে পৌঁছনো যায় এমন জায়গায় রাখতে হবে। মণ্ডপের বিদ্যুৎ সংযোগ ও অস্থায়ী ওয়্যারিংয়ের মান নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।
উল্লেখ্য, উৎসবের দিনগুলিতে কোনও দমকলকর্মীর ছুটি মঞ্জুর করা হবে না, কেবল চরম জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া। পাশাপাশি দপ্তরের মানবসম্পদ ও পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে ফ্রন্টলাইন ফায়ার পার্সোনেল (Front line Fire Personnel) পদে আড়াই হাজার নতুন কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
Leave a Comment